একটা চলচ্চিত্র
যখন বানান শেষ হয়, তখন মুক্তি প্রকাশের আগে আজকাল
ইটিউবে টিজার চলে- তার প্রচারের জন্য ।
কিন্তু, সেই
১৯৫৮ সালে কি ঘটনা ছিল? পোস্টার তেরি হত- নায়ক, নায়িকা, পরিচালকের নাম সহ ।
এটাই স্বাভাবিক, কারণ
দর্শক তো নায়ক, নায়িকা, সঙ্গীত পরিচালক
বা পরিচালকের নাম দেখেই হলে সিনেমা দেখতে যাবে !
ভাবুন তো একবার-
কারও নাম নেই পোস্টারে, অথচ একজন হারমোনিয়াম নিয়ে দাঁড়িয়ে,
আর হিন্দি ছায়াছবি “মুজরিম”য়ের সেটাই পোষ্টার । বিশ্বাস করা মুশকিল ।
তখন শাম্মী কাপুর
বিখ্যাত নন বা তাঁর বিপরীতে রাগিণী স্বল্প পরিচিত । তবু, তাঁদের
নাম তো থাকা উচিত ছিল, তাই না ?
কিন্তু, সেই
একজনই ছিলেন সেই পোস্টারে হারমোনিয়াম নিয়ে ।
লেখা :- সুরের
যাদুগর, ও. পি. নাইয়ার । আর কারও নাম বা ছবি- কেউ কোথাও নেই।
ও. পি. নাইয়ারের
জনমোহিনী শক্তি এমনই ছিল ।
খালি সুরকারের
নামে ছবি চলবে ? আজ্ঞে হ্যাঁ, চলেছিল!
ওমকার প্রসাদ নাইয়ার । নামটা শুনে, আমি অনেককেই বিভ্রান্ত
হতে দেখেছি । উনি কি দাক্ষিণাত্যের লোক ?
নায়ার আর নাইয়ার দুটো আলাদা পদবী । নাইয়ার একেবারে খাঁটি
পঞ্চনদের থেকে এসেছে ।
সে যাই হোক, এই ওমকার প্রসাদের পরিবারে কিন্তু কেউই গান- বাজনার
সাথে যুক্ত ছিলেন না ।
ডাক্তারি বা আইনজীবী- এই ছিল পরিবারের অধিকাংশ লোকের পেশা ।
সকলেই ভেবেছিলেন – এই তৃতীয় পাণ্ডবটিও সেই পথে যাবেন ।
বিধাতা পুরুষ ( যদি থেকে থাকেন), কিন্তু অন্য রকম ভেবেছিলেন
।
পারিবারিক আবহাওয়া থেকে তিনি একেবারেই ভিন্ন ।
সঙ্গীত প্রতিভা নিয়েই জন্মেছিলেন আমাদের এই যাদুগরটি ।
ছয় বছর বয়সেই (১৬ ই জানুয়ারী,১৯২৬-২৮ শে জানুয়ারী, ২০০৭,
লাহৌর) তিনি ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন – পঙ্কজ মল্লিক, গোলাম হায়দার এবং রাইচাঁদ বড়ালের
।
পঙ্কজ মল্লিক (জন্ম: ১০ মে, ১৯০৫ - মৃত্যু: ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮) তো সুগায়ক ছিলেনই এবং তিনিই বোধহয় প্রথম সুরকার,
যিনি ভারতীয় রাগরাগিনীর সাথে বিদেশী বাদ্যযন্ত্র, যেমন- চেলো, পিয়ানো ব্যবহার করেন
।
নীতীন বসুর সঙ্গে রাইচাঁদ
বড়াল ভারতীয় চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠসঙ্গীত চালু করেছিলেন ।
পঙ্কজ মল্লিকও তাঁদের সাথী ছিলেন – এই ব্যাপারে ।
সারেঙ্গির ওস্তাদ হুসেইন বক্সওয়ালে সাহেবের শিষ্য ছিলেন সুরকার
গোলাম হায়দার ।
এদিকে তখন গায়ক নায়ক কুন্দনলাল সায়গলের ভীষণ নামডাক, সাথে গায়িকা নায়িকা কাননবালারও ।
নাইয়ার সায়েব এঁদেরও ভক্ত তখন ।
বারো বছর বয়সে তিনি পাতিয়ালা রেডিও স্টেশনের নিয়মিত পিয়ানো
বাদক এবং গায়কও বটে ।
কারণ, ততদিনে তাঁর পরিবার লাহৌর ছেড়ে পাতিয়ালা চলে এসেছে-
পেশার কারণে ।
মজার ব্যাপার – তাঁর কিন্তু সঙ্গীতে কোনো প্রথাগত শিক্ষা
ছিল না । সব নিজেই শিখেছিলেন।
তখনকার বোম্বাইতে চলে এলেন নাইয়ার সায়েব সিনেমার নায়ক হতে ।
তখন তাঁর বয়েস ২৩ -২৪ হবে ।
স্ক্রিন টেস্টে পাশ করতে পারলেন না ।
সুরকার হিসেবেই কাজ শুরু করার কথা ভাবলেন তিনি ।
প্রশ্ন হলো – কাজটা দেবে কে?
তখনকার আরেকজন নামকরা নায়ক ছিলেন – শ্যাম ।
ইনিও লাহৌরের, তাই কিছু পরিচয় ছিল নাইয়ার সায়েবের ।
ফিল্মিস্তানের মালিক শশধর মুখার্জির কাছে গেলেন ওমকার
প্রসাদ । সুপারিশ শ্যাম সাহেবের । শ্যাম সাহেব, ফিল্মিস্তানের তখন বেশ কয়েকটা ছবিতে
নায়কের কাজ করে ফেলেছেন ।
শশধর মুখার্জির কাছে গেলে , তিনি বললেন- নাইয়ার সায়েবকে:-
শোনাও ভাই তোমার গান !
জবাবে বিনয়ের সঙ্গে নাইয়ার বললেন – একটা কিছু বাজনা দিন,
নিদেন পক্ষে হারমোনিয়াম ।
ওসব পরে হবে, তুমি বাজনা ছাড়াই চেষ্টা করো ।
অগত্যা সেটাই করলেন – নাইয়ার সায়েব ।
আবার ডাহা ফেল !
শ্যামবাবুকে গিয়ে বললেন ঘটনাটা । এবারে নিজে নিয়ে গেলেন শশধর
মুখার্জির কাছে ।
এবারে হারমোনিয়াম তো এল,কিন্তু আবার ফেল!
শশধর মুখার্জির উপদেশ – ফিরে যাও নিজের ডেরায় । কিস্সু হবে
না তোমার সুরকারের লাইনে ।
সে যুগে তখন “প্রাইভেট রেকর্ড” হত । মানে নন ফ্লিম্ মিউজিক
।
শ্যাম বাবুর চেষ্টায়, রেকর্ড করলেন একটা । গাইলেন – সি এইচ
আত্মা ।
গোটা আশী টাকা পেয়ে তিনি বোম্বাই ছাড়লেন ।
========
(চলবে)
+++++++++
তথ্যসূত্র :-Z Classic টিভি চ্যানেলে জাভেদ আখতারের
স্মৃতিচারণ-২০১৫ ও উইকি পেডিয়া এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকা

No comments:
Post a Comment