Powered By Blogger

Monday, May 22, 2017

চুল কাটানো


====

খুব ছোটবেলার একটা আবছা স্মৃতি আছে আমার চুল কাটানোর । বাবা আমার মাথা ধরে আছেন জোর করে আর চক্র বারিক আমার মাথার চুল ঘ্যাস ঘ্যাস করে কেটে যাচ্ছে, যেন লনের ঘাস ছাঁটছে ।

আমার পরিত্রাহি চিৎকার আর বাবা বলছেন :- এই তো হয়ে এলো । একটু দাঁড়া ।
সেই সময়ে ওডিশা- আন্ধ্রার সীমান্তবর্তী আধা শহর পারলাখেমুণ্ডিতে সেলুন ছিল বলে মনে পড়ছে না ।

এই করেই চলছিল আমার চুল কাটানো , তারপর তো মা বাবা পাঠিয়ে দিলেন কোলকাতার বাঘাযতীন কলোনীতে মামাবাড়ী, পড়াশোনার জন্য।
প্রথমেই ভেবলু হয়ে গেছিলাম – কোলকাতার এই অংশে এসে । তখন ওটা ছিল হালতু ইউনিয়ন , জিলা :- ছ গণ্ডা পরগণা ।
বড় রাস্তা দিয়ে চলতো ক্যালকাটা স্টেট ট্র্যানস্পোর্টের দোতলা আর একচোখ কানা একতলা বাস ।

ওপরে লেখা থাকতো – ৫ গড়িয়া বা হাওড়া, আপ বা ডাউন বাসে । রাস্তা পেরিয়েই বাঁদিকে বাঘাযতীন বাজার, তারপরেই লাইন দিয়ে আকষর্ণীয় বাঘাযতীন গার্লস্ হাইস্কুল, ইস্টবেঙল সুইটস্ । পরেই একটা খুপরী । ওপরে সাইনবোর্ড – শ্রীশ্রীবজরঙ্গবলী হেয়ার কাটিং সেলুন ।
নীচে আরও লেখা :- এখানে স্বল্পমূল্যে সব ধরণের চুল কাটা হয়, এমনকি উত্তমকুমারের মত । পরীক্ষা প্রার্থনীয় ।
ইচ্ছে করতো ঠিকই, তবে দুটো কারণে সেই সেলুনে ঢুকতাম না । প্রথমত ঠিক কত নেবে সেটা জানতাম না আর পরীক্ষা ব্যাপারটাই আমার কাছে বরাবর গডজিলার মত বিভীষিকা ।
ভয় ছিল, চুল কাটার আগে আবার পড়া টরা না ধরে ।
অগত্যা বিহার নরসুন্দর বাবুলাল ঠাকুরই ভরসা । বাড়ীতে এসে সের দরে দাদু থেকে শুরু করে মামাদের চুল দাড়ি কেটে চেঁছে সাফ করে দিতো ।
আমারটা ছিল ফাউ । কারণ অতগুলো মক্কেল পেয়ে তার হৃদয় গলিত হতো ।
আমি একদিন সাহস করে বাবুলালদাকে বলেছিলাম – উত্তমকুমারের মত চুল কাটতে পারবে ?

বাবুলালদা হো হো করে হেসে বলেছিল – উত্তমকুমার নাকি ওর খদ্দের। সরল কিশোর মনে বিশ্বাস করে মাথাটা ওর হাতে সঁপে দিয়েছিলাম ।
তারপরে আয়না দিয়ে দেখি – প্রায় ন্যাড়া আর মাথার ওপরে চার পাঁচ গাছি চুল ।
কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেছিলাম – এটা উত্তম ছাঁট ?
পরিশ্রম শেষে খৈনি ডলতে ডলতে বাবুলালদা ভাঙা বাংলায় বলেছিল :- ওই যে যিন ফিল্মমেঁ উত্তম জী লাউয়া কা রোল করেছিলোন্ ।

লাউয়া মানে যে নরসুন্দর সেটা জানতাম না । যাক্ তবু সান্ত্বনা । একটা কিছু তো হয়েছে !

দাদু আমাকে দেখেই গম্ভীর হয়ে গেলেন । দিদিমার মুখে আঁচল । তবু চানটান করে ভাত খেয়ে ইস্কুলে যাবার পথে দেখি প্যাঁক মারার আওয়াজ ।
যাঁরা প্যাঁক মারা কাকে বলে জানেন না – তাদের বলি হাত মুঠো করে কড়ে আঙুল উঁচু করে মুখের কাছে এনে শাঁখের মত আওয়াজ করাকে বলতো – প্যাঁক ।

ডান দিকে প্রথমেই পড়তো – সম্মিলিত বাস্তুহারা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় । মেয়েরা একবার করে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর হেসে গড়িয়ে পড়ছে অন্যদের ওপর ।

একজন তো বলেই বসলো - কাকতাড়ুয়াটা সেজেছে বেশ ! সেই প্রথম বুঝলাম – মানুষ নানা সমস্যার মধ্যেই বাঁচে ।
ইস্কুলে খালি চাঁটা পড়তেই লাগলো মাথায় । নতুন চুল না গজানো পর্যন্ত গানটা মনে মনে গাইতাম – সহে না যাতনা ।

এই একটা লাইনই জানতাম, কারণ পাড়ার অপর্ণাদি সন্ধে বেলায় একটা ভাঙা হারমোনিয়াম নিয়ে ফাটা রেকর্ডে পিন আটকে যাবার মত ঐ একটা লাইনই গাইতো রোজ ।
তারপরে সেই বজরঙ্গবলী সেলুনে সাহস করে ঢুকতেই দেখি একটা বেঞ্চিতে বসে বাবুলালদা খৈনি ডলছে । ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম ।

লায়েক হয়ে – একটা বড় সেলুনে ঢুকেছিলাম । সামনে পেছনে আয়না । গদি আঁটা চেয়ার । চুল কাটার নানা রকম মাথার ছবি দেয়ালে টাঙানো ।

ট্র্যানজিসটারে রেডিও সিলোনের হিন্দি গান বেজে চলেছে । সেই প্রথম দেখলাম – লোকে রাতেও চুল দাড়ি কাটে ।
আরেকবার বিউটি সেলুন লেখা দেখে স্যুয়িং ডোর ঠেলে ঢুকে পড়েছিলাম আরও ভালো কিছু হতে পারে ভেবে ।

তারপর শুধু পুলিশ ডাকা বাকী ছিল ।

বাবুলাল নিতো চার আনা আর সেলুনে নিতো দু টাকা । নামী জায়গায় পাঁচটাকা । এখানে নাকি চুল কাটালে দাড়ি কাটা ফ্রি । ব্যাপারটা আজও বুঝি নি ।

আজকাল প্রদীপ বাড়ীতে আমার চুল দাড়ি কাটতে আসে । দাড়ি ২০ টাকা । চুল – ৩০ টাকা ।

অ্যালবাট এসটাইল আর জেবনে হলো নি ।

No comments:

Post a Comment