Powered By Blogger

Thursday, May 7, 2015

বেচুবাবু -১



শুরুর একটা শুরু থাকে । দেখা যাক, এই মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ   ইংরেজী শব্দবন্ধটি কোত্থেকে এসেছে, যদিও এই নামের  অনেক  রকমফের আছে কোম্পানি অনুযায়ী, তবু মোদ্দা ব্যাপারটা একই ।

বারো বছর হয়ে গেল, এই বৃত্তি থেকে আমি অবসর গ্রহণ করেছি- তাই জানি না বর্তমান অবস্থাটি কি রকম, তবে মনে হয় বাড়ীর ভিত যেমন বদলায় না, সেই রকম মূল ধারণটা ( বেসিক কনসেপ্ট) একই আছে, শুধু ওপর ওপর বদলানো (রিনোভেশন) হয়েছে মাত্র ।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, হিটলার জার্মানীর প্রায় বেশীর ভাগ ডাক্তারকেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠিয়েছিল, আহত সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য ।

মূলত দুটি জার্মান কোম্পানীর ওপর হিটলারের নির্দেশ ছিল নতুন নতুন ওষুধ তৈরি করার, পরিভাষায় যাকে মলিকিউলবলে ।

সে দুটি কোম্পানি এখনও দাপটে ব্যবসা চালাচ্ছে এই পৃথিবী ও ভারতে । তাদের নাম যথাক্রমে :- হেক্সট এবং বায়ার ।

বোরিঙ্গার ইঙ্গেলহ্যাম, শেরিং এজি , হামবুর্গ, নরডমার্ক প্রভৃতি কোম্পানীও ছিল, কিন্তু মূল দায়িত্ব ছিল হেক্সট এবং বায়ারের ।

এই দুটো মূল কোম্পানি হিটলারের নির্দেশে মারণ গ্যাস তৈরি করেছিল ইহুদিদের মারার জন্য ।

বোরিঙ্গার ইঙ্গেলহ্যাম, শেরিং, হামবুর্গ, নরডমার্ক এই সব কোম্পানি ভারতে একত্রিত হয়ে  তাদের পণ্য ভারতে বাজার জাত করতে আসে জার্মান রেমেডিস নামে এবং আমি আমার বেচু বাবুরজীবন শুরু করি এই কোম্পানি দিয়েই ।

ওষুধ কোম্পানীতে নতুন মলিকিউল তৈরি হওয়ার  সাথে সাথে মোটোর সাইকেলে কিছু লোককে পাঠিয়ে দেওয়া হতো ওষুধের গুণাগুণ ব্যাখ্যা করার জন্য । সাথে থাকতো ওষুধের নমুনা (  পরিভাষায় যাকে বলা হয় :- ফিজিসিয়ান স্যাম্পেল), ওষুধ গুলো নেওয়ার জন্য চামড়ার ব্যাগ । পরে ডাক্তার বাবুদের ভালো করে পড়ার জন্য রেখে আসা হতো মুদ্রিত কাগজপত্র ( পরিভাষায় :- লিটারেচার এবং লিভ বিহাইণ্ড কার্ড) ।

 যুদ্ধ ক্ষেত্রে মনোরঞ্জনের জন্য সৈনিকদের মতনই ডাক্তারদের মদ এবং অন্যান্য জিনিস দেওয়া হলেও, এই কোম্পানীগুলো নিজেদের ওষুধ যাতে  বেশী ব্যবহার করে, তার জন্য এই বহনকারীরা আলাদা করে  মদ এবং মহিলাদেরও নিয়ে যেত । এই গুলোতে স্বয়ং হিটলারের আপত্তি ছিল না, কারণ সে বিশ্বাস করত ইউজেনিক্সতত্বে  ।

হিটলারের বিশ্বাস ছিল –  সুস্থ জার্মান নরনারীর মিলনের ফলে বিশুদ্ধ জার্মান জাতি তৈরি হবে এবং তারা কোনো কিছুতেই ভয় পাবে না ।

মান্যতা পেল :- অবাধ যৌনমিলন উপঢৌকনের মোড়কে । হিটলারের পতনের পর,
বিশেষত
 অ্যামেরিকান ওষুধ কোম্পানী গুলো লুফে নেয় ওষুধকে ডাক্তাদের কাছে  পৌঁছে দেবার এই বহনকারীদের মাধ্যমকে । একই ভাবে বিভিন্ন পণ্য ( পরিভাষায় :- ফাষ্ট মুভিং কনজিউমার গুডস্ বা সংক্ষেপে এফ. এম. সি.জি, যদিও অনেক পরে এই নামকরণ হয়) কোম্পানি গুলোও এই পদ্ধতি নেয়  ।


তৈরি হলো - মেডিক্যাল ও সেলস্ রিপ্রেজেনটেটিভ বৃত্তি । পরে, এটা ভারতেও আসে ।
===============




, সরাসরি চলে আসি এই মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভদের কাজ কর্মে ।

+++++++++



 কাজের বর্ণণা


=========================

বেচু বাবুদের কয়েকটা কমন টার্ম আছে । শুধু ওষুধের বেচু নয়, এটা বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় প্রতিনিধিরাও ব্যবহার করেন ।

আগে, সে গুলো নিয়ে বলা যাক :-

হেডকোয়ার্টার :- যে জায়গাকে বেস করে একজন বেচু কাজ করবে ।

এরিয়া/টেরিটরি :- হেডকোয়ার্টার থেকে কোন কোন পূর্ব নির্দিষ্ট জায়গায় যাবে, সেই বেচু ।

এক্স ষ্টেশন :- হেডকোয়ার্টার থেকে কোনো জায়গায় গিয়ে কাজ করে আবার ফিরে আসা ।

আউট ষ্টেশন :-হেডকোয়ার্টার থেকে কোনো জায়গায় গিয়ে সেখানে কয়েকটা দিন কাটিয়ে কাজ করা ।

অ্যালাউন্স :- ছুটির দিন এবং রবিবার বাদে, সব জায়গায় কাজ করার জন্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা থাকে ।

ট্র্যাভেলিং অ্যালাউন্স :- কোনো জায়গায় যাওয়ার জন্য যাতায়াত ভাড়া দেওয়া হয় ।
আগে, ট্রেনে গেলে ফার্ষ্ট ক্লাসের ভাড়া দেওয়া হত । এখন , ক্ষেত্র বিশেষে এসি, থ্রিটায়ার অথবা কিলোমিটার পিছু  একটা নির্দ্দিষ্ট টাকা ধার্য করা থাকে । অবশ্য অনেক কোম্পানি ফার্ষ্ট ক্লাস দিতো না ।

এছাড়াও পোষ্টাল চার্জ ( এখন ইনটারনেট চার্জও দেওয়া হয় , শুনেছি ), খাম, পেন, এরকম অনেক জিনিস কেনার জন্য টাকা দেওয়া হতো বা হয়, কেনার রসিদ জমা দিলে।
প্রত্যেক পনেরো বা এক মাস অন্তর টিএ বিল জমা দিতে হতো/ হয় একটা ফর্ম ভরে । সেই টাকা চলে আসে সাধারণত মাইনের সাথে আলাদা ভাবে ব্যাঙ্ক ড্রাফ্ট , মানি ট্রান্সফার এবং এখন সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ।

একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক ডাক্তার/ কেমিষ্ট বা এফএমসিজি ( ফাষ্ট মুভিং কনজিউমার গুডস্) বেচুদের দেখতেই হবে প্রতিদিন ।

দেখে এসে একটা ফর্মে সেই নাম গুলো ভরে রিপোর্ট লিখতে হবে, হয় ফর্মে বা এখন ইন্টারনেটের প্রোফোর্মাতে ।

অনেক কোম্পানিতে খালি ফর্মে ভরে লিখিত ভাবেই পাঠান বেচুরা, একটা সহমত পোষণ করে ইউনিয়ন ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ।

ওষুধ বেচুদের প্রতি বছর একটা করে নতুন লিষ্ট বানাতে হয় ডাক্তার বাবু এবং সেই এরিয়ার কেমিষ্টদের এবং অন্যদের ক্ষেত্রে :- দোকান বা কাষ্টমারের  ।
কোম্পানি কি ধরণের ওষুধ বাজার জাত করে, তার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়, ডাক্তাদের লিষ্ট ( মোটের ওপর ২৫০ থেকে ৩০০ একটা টেরিটরিতে )
শ্রেণী বিভাগ এই রকম :-

জেনারেল ফিজিসিয়ান ( সব ধরণের চিকিৎসা করেন)

অপথালমোলজিষ্ট ( চক্ষু বিশেষজ্ঞ)

সার্জেন ( শল্যবিদ)

গাইনি  অ্যাণ্ড অবষ্ট্রেকটিক্স ( মহিলা রোগ এবং প্রসব তত্ব)

সাইক্রিয়াটিষ্ট ( মানসকি রোগ বিদ)

পেডিয়াট্রিক্স ( শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ)

কার্ডিওলজিষ্ট ( হৃদবিশেষজ্ঞ)

 করে করে আরও অনেক রকম ।

এটাও খেয়াল রাখতে হয়- এই সব ডাক্তারবাবুদের মধ্যে কাদের প্র্যাকটিসে রমরমা বেশী ।

তাঁরা চিহ্নিত হন ক্যাটাগরি এ হিসেবে

 একটু কম :- ক্যাটাগরি বি

আরও কম :- ক্যাটাগরি সি

প্রাধান্য থাকে ক্যাটাগরি এ  - এবং ক্যাটাগরি বি এর ওপর বেশী ।

নাম্বার অফ হিটস মানে কতবার ভিজিট করতে হবে সেটাও নির্দিষ্ট থাকে যদি সম্ভব হয় ।

ক্যাটাগরি এ তিনবার

ক্যাটাগরি বি দু বার

ক্যাটাগরি সি- একবার বা দুমাসে একবার ।

এখানেও দেখা হয় এই ভাবে :-

ট্রেণ্ড সেটার :-

মানে যাঁর প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ অন্য ডাক্তাররা অনুসরন করেন । এঁদের গিফটের ওপর লোভ নেই ।

ক্যাটাগরি বি ট্রেণ্ড সেটার :- যাঁর প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ অন্য ডাক্তাররা অনুসরন করেন, কিন্তু গিফটের ওপর লোভ বেশী ।

সি টাইপ ডক্টরস :- এরা ট্রেণ্ড সেটারদেরই নকল করেন এবং গিফটের ওপর লোভ প্রচণ্ড ।

ব্যাতিক্রমও আছে, তবে কে না জানে ব্যতিক্রমই বিধির নিয়ামক
 ++++++++++++


ভারতে প্রথম দিকে বেশী বিদেশী কোম্পানি ছিল না । হাতে গোণা মাত্র কয়েকটা !

ফাইজার

লেডার্লে

বায়ার

হেক্সট

রোশ

গ্ল্যাক্সো

সিবা

স্কুইব

আইসিআই

এই রকম আরও কয়েকটা ।

দেশী ওষুধ কোম্পানির রমরমাই বেশী ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য :-

ইষ্ট ইণ্ডিয়া ফার্মাসিউটাকালস‌্

দেস‌্

বেঙল কেমিক্যালস্

গ্লুকোনেট

এবং আরও কিছু ।


একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতবিদেশী  কোম্পানী গুলো ছাড়া সবারই উৎপাদন স্থান ছিল এই কোলকাতাতেই । রিপ্রেজেনটেটিভদের সিংহভাগ বাঙালি ।

প্রথম দিকে এই সব কোম্পানিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক হলেই চলতো, যদিও ভালো বলিয়ে কইয়ে হলে ম্যাট্রিক পাসও  কোনো বাধা ছিল না।

ডাক্তারবাবুদের মধ্যেও একটা দেশপ্রেম থাকতো বলে ভারতীয় ওষুধ কোম্পানির ওষুধই বেশী লিখতেন, যাতে ওদের সেল বেশী হয় ।
বেশ একটা মাখামাখি ভাব ছিল ডাক্তার বাবুদের সাথে । মহিলা ডাক্তাদের সাথে প্রেম করে বিয়ের ঘটনাও প্রচুর হয়েছে এককালে ।

তখনও মহিলা রিপ্রেজেনটেটিভদের চল হয় নি ।
 দেখে টেকে এবারে মাঠে নামে বিদেশি কোম্পানিগুলি ।
আরম্ভ হলো ডাক্তার বাবুদের উপঢৌকন দেওয়া । প্রথম দিকে সেই উপঢৌকন, পেন, প্রেসক্রিপশান প্যাডলাইজল সাবান এই সবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো ।

দেশী কোম্পানিগুলো এ ব্যাপারে ততটা খেয়াল করে নি আর তাদের প্রতিনিধিরাও  গুরুত্ব দেন নি ততটা ।


সেল- নামে লক্ষীন্দরের লোহার  ঘরে কালনাগিনী ঢুকলো এই ভাবেই ।

++++++
ধীরে ধীরে ডাক্তারি পড়াটাও শক্ত হয়েও যাচ্ছে । এখন তো টাকা দিয়ে প্লেন এমবিবিএস পড়ার জন্য সীট পাওয়া যায় ।
সেই ঘুষের একটা গাল ভরা নামও আছে ক্যাপিটেশন ফি ।
আর যারা জয়েন্ট দিয়ে পাশ করছেন, তাদের এমডি করতেও এখন খরচ এক থেকে দেড় কোটি টাকা ।

+++++++++
 যাগ্গে- এসব কথায় পরে আসবো । আগে একটু অন্য কথা বলে নেই ।

রিপ্রেজেনটেটিভদের তখন টেরিটরি ছিল বিশাল । হোল্ড অল আর একটা ট্রাঙ্ক নিয়ে অনেকেই দূর প্রবাসে যেতেন এক দেড় মাসের জন্য ।

ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্ট মন্দিরের মত অবস্থা ।

বিবাহিতদের পরিবার থেকে দূরে থাকার যাতনা ভুলতে অনেকেই ধরতেন মদ আর জৈবিক তাড়নার জন্য ছিল এলাকার যৌনপল্লী ।


সাধারণ লোকে ভাবতো, এমন কি ডাক্তার বাবু থেকে শুরু করে পাইকারি বা খুচরো ওষুধ বিক্রেতা- এই সব ছেলেরা ( তখনও মহিলারা এই বৃত্তিতে আসেন নি ) বাপে খ্যাদানো, মায়ে তাড়ানো- লাথখোর ।
মদ খায় ( যেন অন্য কেউ খায় না !! ), নারী মাংস লোলুপ , জুয়ার প্রতি আসক্ত এরকম আরও অনেক কিছু  দোষও ছিল এটা অস্বীকার করা যাবে না।

 ষাটের দশকের শুরুতে কোম্পানি গুলো বুঝলো এভাবে ভাল ভাবে মার্কেট  ধরা অসম্ভব ।
শুরু হলো একটা রাজ্যের জেলা সদরে হেডকোয়ার্টার করা ।
 তখন আবার পান থেকে চুণ খসলেই চাকরী চলে যেত ।

নাম বলছি না, একটা বিদেশী কোম্পানী ছিল- যারা রিপ্রেজেনটেটিভদের পোর্টেবল টাইপরাইটার দিত, সাথে ইংরেজি ডিক্সনানারী ।

হাতে চিঠি লেখা চলবে না, সব টাইপ করে পাঠাতে হবে । ইংরেজী ভুল হলে উপরওয়ালা ভুল জায়গায় লাল কালির দাগ দিয়ে পাঠাতো ।
চাকরি যেত না, তবে কপালে জুটতো তীব্র তিরস্কার ।

 খাওয়া থাকা তো বটেই  একটা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা এলো সকলের মধ্যে ।



আমার বাবা এই চাকরী পাওয়ার কথা শুনে বলেছিলেন - তুই এর চেয়ে , মুচীর কাজ করলে পারতিস । তারা অনেক সন্মান জনক কাজ করে ।

ব্যাপারটা  পুরোপুরি মিথ্যে  ছিল না, কারণ সেই অবস্থা কিছু তো ছিলই ।  কোম্পানির জুলুম সেলস টার্গেট পূরণ করার জন্য, আর একদিকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এই ছিল তখনকার বেচু বাবুদের অবস্থা ।

বিভিন্ন শহরে রেস্ট হাউসতৈরি হলো ( এখনও আছে ) , কারণ হোটেল খুব খরচা সাপেক্ষ । কোম্পানি যে অ্যালাউন্স দেয়, সেটতে ঠিক পোষাতো না ।

টিএ বিল থেকে পয়সা তোলার একটা উপায়ও ছিল । তাতেও কুলিয়ে ওঠা যেত না । ফার্ষ্ট ক্লাসে না গিয়ে প্লেন কামরায় ( তখন স্লীপার ক্লাস আসতে শুরু করেছে সবে) গিয়ে ফার্ষ্ট ক্লাসের ভাড়া টিএ বিলে চার্জ করা, এসব হতো বৈকী ।

রেস্ট হাউসের ফাণ্ডাটা সেই থাকা খাওয়ার সুলভ বন্দোবস্ত করার চেষ্টায় আবির্ভূত হলো । সেই শহরে ইউনিয়নের একটা আপিস ঘরও হবে- রেস্ট হাউস ।

আমার বা আমার পূর্ববর্তী আমলে তথাকথিত বিদেশী কোম্পানির রমরমা ছিল । দেশীয় কোম্পানিও ছিল, কিন্তু হাতে গোণা ।

বিদেশী কোম্পানির ছেলেদের একটা আপার্থয়েডপলিসি থাকতো । দেশী কোম্পানির লোকেদের দিকে ছিল একটা অনুকম্পা ।

কারণ  সেই বিদেশী কোম্পানির ছেলেরা তুলনায় বেশী মাইনেতে চাকুরীরত । প্রথম দিকে তো এই সব ছেলেরা রেস্ট হাউস এড়িয়েই চলতো, কারন এদেশীয় ছেলেদের সাথে থাকলে জাতযাবে  ।

অবস্থার পরিবর্তন শুরু হলো- সত্তরের দশক থেকে । পশ্চিম বাংলায় তখন টালমাটাল অবস্থা । চাকরী প্রায় নেই । আবার থাকলেও, পুলিশ ভেরিফিকেশনের ঝামেলা ।


অধিকাংশই তখন বাম আন্দোলনে যুক্ত বলে, পুলিশ তাদের ভালো চোখে দেখতো না। সেই হিসেবে কোম্পানি গুলোতে চাকরি পাওয়া অনেক সোজা । একটু বলিয়ে কইয়ে হলেই চাকরীটা পাওয়া যেত ।

একটা কারণ আমার মাথায় আজও ঢোকে না, কোম্পানি কিন্তু জেনে শুনেই এই সব ছেলেদের চাকরী দিত ।

কেন দিতো ?
বোধহয় ধারণা ছিল, ডাক্তারদের/ মনোহারী দোকানদারদের চমকে এরা ওষুধ লেখাতে পারবে /পণ্য কেনাতে পারবে। ঘটনা যেটা, সেটা হলো চমকাতো কিনা জানি না, তবে এই সব ছেলেরা তাদের টার্গেট কিন্তু সহজেই পূরণ করতে পারতো ।

তাই এদের চাহিদা কোম্পানিগুলোতে তুঙ্গে ছিল । ঠিক এদের ওপরেই ছিল সুপারভাইজার। এখন যাদের ফার্স্ট লাইন ম্যানেজার বলা হয় ।

অফিসিয়ালি এদের কাজ ছিল বেচুবাবুদের কাজের তদারকি করা ।  বাস্তবে যেটা হতো, ত্যালানি না পেলে চাকরি যখন তখন খেয়ে নিতো । ব্যতিক্রমও ছিল , তবে সেটা হাতে গোণা ।

চালু কথায়, এদের বসবলা হতো/হয় ।

============

 আগেই বলেছি-এই বেচু বাবুদের ছিল, দুটো শ্রেণী বিভাজন । একদল- ওষুধ বেচতো  আর এক দল কনজিউমার প্রোডাক্ট বা  এফ এম সি জি  ।

দুটো আলাদা রেষ্ট হাউস এই বেচু বাবুদের । একে অপরকে  টেক্কা দেওয়ার প্রবণতা মারাত্মক ভাবে বিদ্যমান।
এরা ভাবে পেশাগত ভাবে আমরা বড়, আর ওরা ভাবে ঠিক উল্টোটা । তবে, একটা জিনিস এদের মধ্যে ছিল, সেটা হলো নিজেদের কোনো ওষুধ দরকার হলে ওরা ওষুধ কোম্পানীর  রিপ্রেজেনটেটিভদের কাছে আসতো আর এরা নিজেদের প্রয়োজন মত কোনো জিনিস কিনতে হলে ওদের শরণাপন্ন হতো ।


ওষুধ তো ফ্রি মিলতোই, আর তেমন হলে কনজিউমার প্রোডাক্টের স্যাম্পেল জুটে যেত মুফতে বা ৫০ % ডিসকাউন্টে ।


এই আদান প্রদানের মধ্যেই গড়ে উঠলো এক হওয়ার প্রবণতা । ভারত বর্ষের সব জায়গাতেই এটা ঘটছিল একসাথে ।

পরে যাবো, বিভিন্ন ঘটনায় । কোনোটা হাসির, কোনোটা বা দুঃখের বা অধিকারের লড়াই এবং বঞ্চনা আর কাজে ফাঁকির ( যে কাজে আমি অত্যন্ত দড় ছিলাম)।

এই কাজে ফাঁকির একটা পোষাকী নাম আছে গুবলু ।

+++++


বেচু বাবুদের মূল কাজটা হলো- প্রথমে ডাক্তারদের মধ্যে, কোম্পানির ওষুধ কত ভালোসেটা প্রচার করা । তারপর খুচরো বিক্রেতার দোকানে গিয়ে খোঁজ নেওয়া কোম্পানির ওষুধ  চলছে কিনা , চললে কোন কোন ডাক্তার বাবু লিখছেন তার সম্বন্ধে খবরাখবর নেওয়া ।

এর পরে সেই দোকান থেকে অর্ডার নিয়ে ( দিলে ) স্থানীয়  বিতরকের  ( ষ্টকিষ্ট)কাছে পৌঁছে দেওয়া পরিবর্তে সেই বিতরকের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে কোম্পানির ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিজের বেঁধে দেওয়া  সেলস টার্গেট পূরণ করা ।

টার্গেট পূরণ হলে এক্সট্রা ইনসেন্টিভ বা বোনাস মিলত একটা মোটা অঙ্ক । তাই, টাকা কামানোর তাগিদে এই কাজগুলো নিজের স্বার্থেই করতে হতো ।


একই কাজ ছিল- সেলস রিপ্রজেনটেটিভদের । তবে এরা ডাক্তার ভিজিট না করে, বড় মনোহারী দোকান ভিজিট করত।

হ্যাঁ ! ইউনিয়নও ছিল ।

সারা ভারত ব্যাপী প্রথমে একটাই ইউনিয়ন ছিল সিটু সমর্থিত , পরে নানা মতভেদে আরও একটা ইউনিয়ন হয় রাজনীতির কোনো রঙ না রেখে ।

সবই লেখার চেষ্টা করবো, তবে তার আগে  একটা কৈফিয়ত দেওয়া জরুরী বলে মনে করি ।
এটা ইচ্ছে করেই আগে লিখি নি ।

কেউ কেউ জানেন- অনেক নামকরা সাহিত্যিকহিন্দি ও বাংলা গানের গায়ক, চলচ্চিত্র/ সিরিয়াল পরিচালক/ অভিনেতা ( হিন্দি ও বাংলা), নাট্যাভিনেতা এঁরা জীবন জীবিকার জন্য প্রথম কাজ বেছে নিয়েছিলেন বেচু বাবুর ।
খুবই বেদনাহত হয়ে দেখেছি- এনাদের লেখার ক্ষমতা থাকলেও কোনোদিনই লেখেন নি এই পেশা সম্বন্ধে ।

 হয়তো, তাঁদের মনে এটা কাজ করেছিল বর্তমান চাকচিক্য ময় জীবনের পেছনে যে বেচু বাবুর একটা ছাপ আছে , সেটা কালো দিক ।

সিনেমা বা নাটকে  আসা শুধু বেচু বাবুর চরিত্র দেখিয়েই ক্ষান্ত থেকেছেন, কিন্তু এদের পেশা, সুখ- দুঃখ, আনন্দ- বিষাদসংগ্রাম কোনো কিছুই দেখান নি বা লেখা তো দূরের কথা বলেনও নি ।
আমার সেই দায় নেই, তাই মনে করি  লেখা উচিত । এই বাসনা সুপ্ত ছিল, কিন্তু চাগাড় দিয়ে উঠল বন্ধুবর ডঃ সনজিৎ বাগচী এবং কন্যাকল্পা রিমির অনুরোধ ।




রাজনীতি বা ইউনিয়ন আমার আলোচ্য হবে পরে- আপাতত  আমি লিখতে চলেছি আমার নানা অভিজ্ঞতার কথা। দীর্ঘ ৩৩ বছর এই বৃত্তিতে ছিলাম । একবারের জন্যও মনে হয় নি, এটা আমার যোগ্য কাজ নয় বা দায়ে পড়ে করছি ।

ব্যক্তিগত ভাবে খুব উপভোগ করতাম আমার এই বৃত্তিকে । অবাক করার মত অনেক ব্যাপারও ছিল।
 চাপে পড়ে প্রথম প্রথম অনেকবার ভেবেছি এই বৃত্তি ছেড়ে দেবো । কারণ- ধীরে ধীরে দেখতে পাচ্ছিলাম- অনেকেই ব্যাংক, সরকারি চাকরি বা অন্যান্য চাকরীতে চলে যাচ্ছে ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেবে দেখলাম -  জীবনটাই তো সংগ্রাম, তাই লড়েই দেখি না- কি হয় !

বিশ্বাস করুন আমি ঠকিনি । এতলোক, বর্ণবৈচিত্র্য, ঔদার্য, শঠতা, বঞ্চনা, ছোটলোকামি. মনের প্রসারতা ওয়ালা বহু ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা টের পেয়েছি ক্ষণে ক্ষণে ।

ঘুরিয়ে পাকিয়ে সেই ওষুধ/ পণ্য কোম্পানির দালাল । আর নিজেরা নাম দিয়েছিলাম- বেচু বাবু ।

এসব হলেও আমি এখনও গর্বিত যে আমি বেচু বাবু ছিলাম । চেষ্টাই করি না, লিখতে!
ইদানীং টাইপ করা বড় মুশকিল আমার পক্ষে কারণ বলতে গেলে স্পনডিলোসিসের কারণে বাঁ হাত এবং আঙুল গুলো প্রায় অকেজো, তবে ফিজিও থেরাপী চলছে আর কিছুটা উন্নতি হচ্ছে আস্তে আস্তে ।

কোম্পানী গুলোর নাম বলবো না । এই গুলো বাঙালি মালিকানাধীন ছিল । তেল, সাবান, এবং ওষুধ বিক্রিই ছিল এই কোম্পানী গুলোর কাজ ।

যে সব দাদারা এদের প্রতিনিধিত্ব করতেন-------- তাঁদের অবসরের কোনো বয়স সেই সময় ছিল না ।

মালিকরা এদের বিশ্বাস করতেন সরাসরি যোগাযোগ থাকার ফলে আর এঁরাও সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতেন ।

আমি নিজে দুজনকে দেখেছি ৭২ বছর পর্যন্ত কাজ করতে । একজন তো নিখাদ বাঙালি পোষাক----- ধূতি. পাঞ্জাবী আর পাম্প স্যু পরেই কাজে বেরুতেন ।

ঠিক টাকা পয়সার জন্য নয়----- বাড়ীতে এনাদের মন টিঁকতো না । ঘুরে ঘুরে এমন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল------- যে বাড়ীতে খাটে শুয়ে থাকার সময়েও রাতে মাঝে মাঝে খাটের তলায় হাত দিয়ে ঘুমের ঘোরেই কিছু খুঁজতেন ।

হয়তো বৌদি জিজ্ঞেস করলেন কি খুঁজছো ?

জেগে গিয়ে বলতেন---- ভাবছি, ট্রেনের বার্থে শুয়ে আছি আর দেখছি সুটকেশটা চুরী গেল কিনা !!!

আমরা খুব সমীহ করতাম এঁদের আর ওনারাও আমাদের মত কম বয়েসীদের ছেলের মতই দেখতেন ।

দরকারে  আমরা বিভিন্ন রকম ওষুধের সাম্পেল দিতাম ওনাদের ।
তখন সবে ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ বাজারে এসেছে । যথারীতি একটি ফাজিল ছেলে , তিন ষ্ট্রিপ দিয়ে বলল  :- দাদা এটা নিন , কাজে দেবে বৌদির।

আমরা যারা ওখানে ছিলাম ---- ছেলেটাকে ধরে আচ্ছা করে বুঝিয়ে দেওয়া হলো, বড়দের সাথে ইয়ার্কি চলে, কিন্তু এই অশোভন ভাবে নয় ।

দাদা হেসে বলেছিলেন :- আহা বকছো কেন ? দাও , বৌদিকেই দেবো তবে ও আমার ছেলের বৌকে দেবে ।

++++++++++++++++++++++

সারাভাই কেমিক্যালসে জয়েন করার পর, আমার প্রথম বসছিলেন- প্রয়াত জ্যোৎস্নাময় দাসগুপ্ত । আর কি আশ্চর্য, জার্মান রেমেডিসেও আমার প্রথম বস ছিলেন আর এক দাশগুপ্তপ্রয়াত নিখিল দাশগুপ্ত ।
জোৎস্নাদা যেমনই ডায়না মিক ছিলেন, তেমনই মিনমিনে  ছিলেন  নিখিলদা ।

এটা অস্বীকার  করবো না দুজনের কাছ থেকে দুরকম ভাবে কাজ শিখেছিলাম ।



আমাকে কটকে চাকরী করে দেওয়ার মূলে ছিলেন তিনজন- সলিল মুখার্জ্জী, সমীর সান্যাল এবং অবশ্যই জ্যোৎস্নাদা । এই তিনজনই তখন, কটকে সারাভাই নিয়ে কাজ করতেন ।

আমার প্রথম কোম্পানি- জার্মান রেমেডিসের ইর্ষ্টান হেড ছিলেন, সলিল মুখার্জ্জীর দাদা- তপন মুখার্জ্জী ।
তিনি ই আমাকে এন্ট্রি দেন এই জগতে ।
ঠিক একবছর পরেই  সারাভাইতে চলে আসি জ্যোৎস্নাদাদের বদান্যে ।
আর আমার এই কোম্পানী বদলানোর হটকারিতায়প্রচুর গালি গালাজ খেয়েছিলেন তপন  বাবু


=================
সেলস টার্গেট পূরণ করার জন্য নানা কায়দা অবলম্বন করতে হতো তখন । ভাগ্য ভালোতখন কম্পিউটার ছিল না ।

তাই পার পেয়ে যেতাম আমরা, আর ষ্টকিষ্টও প্রথমে রে রে করে উঠলেও  পরে মেনে নিতো সব ।

আমাদের একটা টেট্রাসাইক্লিন ব্র্যাণ্ড ছিল- রেসটেক্লিন ।

খারাপ চলতো না, তবে মার্কেটে অন্যান্য ব্র্যাণ্ডের তুলনায় কম ।


জ্যোৎস্নাদার সঙ্গে কটকের এক ষ্টকিষ্টের কাছে গেছি অর্ডার আদায় করতে । কোম্পানী ইনসেনটিভ ডিক্লেয়ার করেছে , রেসটেক্লিনের ওপর ।
একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বিক্রি করলেই নগদ দু হাজার টাকা প্রাপ্তি হবে । সেকালে একটা নতুন স্কুটারের দাম ।
========

জ্যোৎস্নাদা আমাকে আগেই বলে রেখেছিলেন- যাতে আমি কোনো কথা না বলি ।

ষ্টকিষ্টের ঘরে ঢুকে প্রাথমিক কুশল বিনিময় হলো । জ্যোৎস্নাদা পাইপ ধরিয়ে একটু উদাস ভাবে বললেন :- রেসটেক্লিনের ফ্লো কেমন ?
মানে কি রকম ষ্টক বেরুচ্ছে আর অন্যান্যদের ব্র্যাণ্ড গুলোরই বা ফ্লো কেমন?

এই ষ্টকিষ্ট কটকের নামকরা তাগড়া ষ্টকিষ্ট । বিভিন্ন নামে লাইসেন্স নিয়ে নানা নামকরা কোম্পানীর  বিতরক হয়ে বসে আছে ।

ষ্টকিষ্ট রাজু বাবু বললেন:- আগে জানুন কোন ব্র্যাণ্ড কেমন চলছে!

জ্যোৎস্নাদা জিজ্ঞাসা শুরু করলেন :-

হষ্টাসাইক্লিন ?



উত্তর :- আসছে যাচ্ছে, আসছে যাচ্ছে, আসছে যাচ্ছে । ( এখানে বুঝে নিতে হবে হষ্টাসাইক্লিন আসার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছে)


সুবামাইসিন ?


আসছে----যাচ্ছে, আসছে----যাচ্ছে, আসছে----যাচ্ছে । ( একটু ধীরে আর কি!)
টেরামাইসিন ?

আসছে-----যাচ্ছে, আসছে-----যাচ্ছে, আসছে-----যাচ্ছে । ( আরও একটু ধীর গতি)

রেস্টেক্লিন ?

আসছে----যাচ্ছেনা !!!!!!!!

জোৎস্নাদা হো হো করে হেসে উঠে বললেন পারেন মাইরি রাজু বাবু, কেন এই নতুন ছেলেটাকে ঘাবড়ে দিচ্ছেন ?

রাজুবাবুও হেসে বললেন :- জোৎস্না বাবু, আপনি যখন এসেছেন, তখন জানি রেস্টেক্লিনের একটা ভালো অর্ডার নেবেন, তা কত বাক্স ( চলতি ভাষায় পেটি) দরকার?

২০০ পেটি

মরে যাবো জ্যোৎস্নাবাবু

আরে ছি ছি মরবেন কেন ? বলুন আপনি কত পেটি নিতে পারবেন !

১০০ পেটি

তা হলে, একটা মাঝামাঝি জায়গায় আসা যাক---১৫০ পেটি ( আমার টার্গেট ছিল ১০০, কিন্তু এক্সট্রা বিক্রি হলে আরও কিছু টাকা প্রাপ্তি আর কি)



দিয়ে দিন---- আপনি তো ছাড়ার লোক নন, তবে ইনভয়েস মাসের শেষে করবেন আর ডেসপ্যাচ যত দেরী করে পারবেন, করবেন !

সে আর বলতে ?

========


বেরিয়ে এসে জ্যোৎস্নাদাকে একটা পেন্নাম ঠুকেছিলাম । পরে    স্কুটারও কিনেছিলাম, সেই টাকা দিয়ে ।

ল্যামব্রেটা স্কুটারের নাম্বারটাও মনে আছে – ORU 2574






মনে পড়ে রুবি রায় গানটা তখনও বেরোয় নি বাজারে, কিন্তু কিশোর ছেলেরা তো ছিলোই ।

উদ্বাস্তু কোলোনিতে  মামা বাড়ী থেকে বড় হওয়া একটি কিশোর তখনকার রুবি রায়দের দেখতো, হাঁ করে ।

পরনে হাফ পেন্টুলুন, পায়ের সদ্য গজানো লোমে তার লজ্জা করে । তবু, স্কুলের নিয়মে পরতেই হয় ।

রাস্তায় কিশোরী মেয়েদের দেখে  মুখ নীচু করেও খেয়াল করে তাদের গা ঠেলাঠেলি করে হাসাহাসিটা ।

 দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র ১৫ ১৬ বছর । কেউ খাবে আর কেউ খাবে না- স্লোগান ভেসে আসে আকাশে বাতাসে ।

 কিশোর ছেলেটি হয়ে গেল ক্যুরিয়ার বয় । মামাবাড়ীতেও বামপন্থী আবহাওয়া ।

বড়মামা জ্ঞানেন্দ্র নাথ মৈত্র তখন ইনকাম ট্যাক্স কর্মচারিদের নেতা ।

নরানাং মাতুলক্রমঃ সূত্র ধরেই কিশোরটি হয়ে গেল বামপন্থী, কিছু না বুঝেই ।

তার কিশোর মন এটাও খেয়াল করল কিশোরী আর যুবতীরা পছন্দ করে এই সব লোকেদের । স্বপ্নের নায়ক তখন এই বামপন্থীরা ।

 একই সময়ে ঘটে চলেছিল এক নিঃশব্দ বিপ্লব- ছেলেটার জানার কথাও নয় ।

পার্টি ভাগ হবো হবো করছে তখন ! আনাচে কানাচে কানাঘুষো ।

দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকা- দাঁড় করানো চাটাইয়ের ওপর সাঁটাতেই ব্যস্ত তখন কিশোরটি আর ও পাঁচজন কিশোরের সহায়তায় ।

একদিকে রুবি রায়, অপর দিকে প্রায় আবছা ছাপা দৈনিক স্বাধীনতা তাঁতের মাকুর মত টানাপোড়েন চালাচ্ছে তার মনে ।


ওদিকে ১৯৬২ র জানুয়ারীতে নাগপুরে চলছে বেচুবাবুদের সভা ।  ফ্যাক্টরি আর অফিস কর্মচারিদের শ্রমিক হিসেবে মানলেও, বেচু বাবুদের শ্রমিক হিসেবে মানতে নারাজ কোম্পানী কর্তৃপক্ষরা ।

বেচু বাবুরা পরিভাষায় তখন ফিল্ড ওয়ার্কার । এরা তো হোয়াইট কালার এম্পপ্লয়ি । এরা শ্রমিক হবে কেন- এই ছিল যুক্তি ।

কিশোরটি জানেও না- আর মাত্র ছয় বছর পরে সে নিজে ফিল্ড ওয়ার্কার হবে ।  এটাও জানে না -  দক্ষিণী হায়দ্রাবাদে ১৯৬৩ র এপ্রিলে তৈরি হয়েছে ফেডারেশন অফ মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ অ্যাসোশিয়েশন অফ ইণ্ডিয়া।

শুধু কিশোরটা নয়, সে তো তখন কিছুই জানে না ।  বেচুবাবুরাও কি জানতো ?

হাতে গোণা কয়েকটা রাজ্য, তাও পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, আন্ধ্রা, বিহার, ওডিশার কিছু বেচুবাবু সবে জেনেছে তবে সাহস পাচ্ছে না জোট বদ্ধ হতে ।

একটু আঁচ পেলেই নেমে আসছে ছাঁটাইয়ের খাঁড়া তাদের ওপর ।

পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম ভালো করে জোটটা হলো  । বেচু বাবুদের বেশীর ভাগই  তখন উদ্বাস্তু যুবক ।

 বাম আন্দোলনের ভরসাও তারা । তখনও জানে না-  কি হতে চলেছে ভবিষ্যৎয়ে ।

কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্রে তখন বাস্তুহারাদের কাহিনী । গণসঙ্গীত চলছে উদ্দাম ভাবে সলিল চৌধুরী , জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাসদের নেতৃত্বে ।

আমরা এই দুনিয়ায়, জীবনেরও গান শোনাই
মুক্তিরও গান শোনাই





উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে বেচু বাবুরা তখন ঘুরছে প্রত্যেকের কাছে । অবিরত বুঝিয়ে চলেছে কেন দরকার জোট বাঁধার, তৈরি হওয়ার ।

উদ্বাস্তু অভিভাবকরা তখনও দোলাচলে । ছেলে যাও বা কাজ পেয়েছে- দুটো টাকা তো আসছে অভাবের সংসারে । সেটাও কি চলে যাবে ?

আবার ছেলে সেই কোন সকালে বেরিয়ে যাচ্ছে হাতে ব্যাগ নিয়ে, ফিরছে রাত করে ধুঁকতে ধুঁকতে । একটা করে দিন যায় আর একসের করে রক্তক্ষরণ !

অন্য বাঁধা চাকরির তখন আকাল ।

কেই বা দেবেজানা শোনা শাসকদলের নেতা/ দাদারা না থাকলে ?

তার ওপর কপালে ছাপ উদ্বাস্তু ।

 হঠা শালা এদের ।

সব মিলিয়ে একটা অদ্ভূত রসায়ন যার কোনো ফরমূলা নেই ।


এর মধ্যে পার্টি গেল ভেঙ্গে । আন্দোলন কে করবে ?   কংগ্রেসে ধরল ফাটল । তৈরি হলো বাংলা কংগ্রেস ।


 তার সাথে হাত মিলিয়ে পার্টি থেকে বেরিয়ে আসা নতুন পার্টি তৈরি করল পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকার ।

দুদফায় চলেছিল এই সরকার ।

প্রথম সরকারটি ১৯৬৭ সালের ১ মার্চ থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় সরকারটি ১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭০ সালের ১৯ মার্চ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
প্রভাব পড়ল ফেডারেশন অফ মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ অ্যাসোশিয়েশন অফ ইণ্ডিয়াতেও ।

শুরু হলো নকশাল আন্দোলন ।



কিশোরটি তখন যুবক ।  তবে এখন ওডিশায় থাকে । স্বপ্ন পার্টির হোলটাইমার হওয়ার।

নকশাল আন্দোলন তার ওপরেও প্রভাব আনলো ।  পরে, ছেলেটা বিচার করে দেখেছিল- এটা ছিল তার ভিতু মনে  শিঁড়দাড়া শক্ত করার সাহস ।

সরাসরি না জড়ালেও, সেই সাহস তার ছিলও নাসাহায্য করতো অন্য ভাবে । কোলকাতা থেকে পালিয়ে আসা কমরেডদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতো গোপনে ।

কোড নেম না থাক্ ।


এদিকে তার বাবা অবসর নেবেন ১৯৭০ য়ে ৫৮ বছর বয়সে ।  সরকারি চাকরিতে তখন তাই ছিল অবসরের বয়েস ।

বেপরোয়া হয়ে খুঁজে যাচ্ছে যে কোনো একটা চাকরি ।  জুটে গেল অবশেষে । তখনকার বোম্বেতে  গেল ট্রেইনিংয়ে ।

পাঁচ তারা হোটেলের বৈভব দেখল স্বচক্ষে  ট্রেইনিংয়ের ফাঁকে ।

এটাও চোখে পড়ল বোম্বের বস্তি এলাকার সংগ্রাম বেঁচে থাকার ।

 মহম্মদ রফি , কিশোরকুমার, শাম্মি কাপুর, আশা পারেখ মধুবালা, বৈজয়ন্তী মালা, দেবানন্দের রমরমা আর অন্যদিকে দুপুরে ডাব্বাওয়ালেদের সাইকেল মিছিল ।

তখন সদ্য ট্রাম উঠে গিয়েছে শহর থেকে । তার ধাতব লাইন গুলো পিচের আড়ালে চলে গেলেও কখনও কখনও ভেংচি কাটছে সাদা চকচকে দাঁত বের করে ।


পার্টির হোলটাইমার ? নকশাল আন্দোলন ? ফুঃ !

যুবকটি দিশাহারা !

(চলবে)

No comments:

Post a Comment