Powered By Blogger

Friday, May 8, 2015

বেচুবাবু-৩







কারিগরি কারি - কুরীর জমানা । তাই জীবনটাকে মাঝে মাঝে সেল ফোন আর কম্পিউটারের মিশ্রণ বা কম্বিনেশন মনে হয় আমার ।


জীবনটা আবার ডুয়াল সিমের ফোন । সাথে দশ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা উইথ ফ্ল্যাশ ।  মাঝেই মাঝেই ফ্ল্যাস ব্যাকে চলে যাই ।

মাথার হার্ডডিস্কটা , মোটে দু জিবি । ৬৪ র‌্যাম । পুরোনো কালের ফ্লপি ডিস্কও মনে হয় আমার । খুব স্লো ইস্পিড !  সব উইণ্ডো খোলে না একসাথে ।
দুটো সিমে আলাদা আলাদা করে ভরা আছে- হাসি আর সুখ । আর একটাতে, কান্না আর দুঃখ ।


দুঃখের সিমটা আর আ্যক্টিভেট করি না আজকাল । নো ইনকামিং অর আউটগোয়িং । কি হবে, এই সব সিম রেখে ! আছে থাক, সংগ্রামের সাথী !!! অন্য সিমের অভিজ্ঞতা গুলোই ফ্ল্যাসে ঝলসে ওঠে ।


তারই  টুকরো টুকরো ছবি আঁকার চেষ্টা করি- কম্পিউটারের কি বোর্ডে । কোনোটায় আলো নেই, কোনোটায় বা ফ্ল্যাস ।


সদ্য, পাশ করে উঠেছি । ছাত্রাবস্থা থেকেই থাকি কটকের বারবাটি ষ্টেডিয়ামের পেছনে- ওয়াই. এম. সি. এ. র গেষ্ট হাউসে ।  দুটো করে সীট এক একটা ঘরে ।

আমি, দুটো সীটেরই ভাড়া দিয়ে  পুরো একটা ঘর দখল করে থাকি । একটু দূরেই বাথরুম , টয়লেট।  টিউশনি করি চুটিয়ে । মাস গেলে খারাপ টাকা পাই নাতখনকার হিসেবে । তাও চাকরীর চেষ্টা করছি ।  কারণ আগেই বলেছি ।

ভায়োলা সরকার নামে এক ছাত্রী, একদিন কথায় কথায় বলল :- জানেন স্যার !
-      কি ?
-      কোলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আমার ঠাকুদার বাবার আউট হাউস ছিল ।  ইংরেজরা দখল করে নিলে, তিনি মনের দুঃখে কটকে চলে আসেন । সেই থেকে আমরা এখানেই আছি । মাঝে মধ্যে কোলকাতায় গিয়ে দেখে আসি ওই মেমোরিয়াল ।
-      তাই নাকি ! কে বলেছে ?
-      আমার বাবা !
-      এটাও তালে, তোমার জানা উচিত, নেতাজী ওইজন্যেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল । কটকের লোক ছিলেন কিনা !
-      স্যার ! এই তথ্য তো হিষ্টরি বুকে পাই নি !
-      আছে, আছে, তোমার বাবার কাছে যে পুরনো ইতিহাস বই আছে, পুঁথির আকারে , সেটা একবার দেখে নিও । তোমার বাবা আমাকে দেখিয়েছিলেন ।

আমার পাশের ঘরে থাকতেন এক বাঙালি ভদ্রলোক  । বেশ আন্নাদুরাই মার্কা গাব্দাগোব্দা চেহারা । সার্ট- টাই পরে, একটা বাদামী রঙের ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে বেরুতেন । আলাপ হল । বেশ সদালাপি । জানলাম, উনি স্কুইব বলে একটা আ্যমেরিকান ওষুধ কোম্পানীর মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ ।
একদিন ওনার ঘরে গেলাম ।  স্তুপাকার ময়লা গেঞ্জি আর মোজা জড়ো করে রাখা । জিজ্ঞেস করাতে, বললেন কে কাচবে? নতুন কিনে নেই ।

পরে, কোলকাতায় গেলে মা সব কেচে দ্যায় । তখন, ওই গুলোই পরি আবার ।


, জিজ্ঞেস করাতে বললেন ওসব নাম ঘুচে গেছে । আমি এখন বেচু মানে ওষুধ বেচি  ঘুরে ঘুরে । মাথায় ঝাঁকা নেই, তবে হাতে ব্যাগ আছে । এককথায় ওষুধের হকার । ভালো নাম অবশ্য আছে, তবে ওই বেচু নামেই পরিচিত সবার কাছে । বলে, হো হো করে দিলখোলা হাসি হাসলেন । আজকালকার দিন হলে, স্মাইলি দিলেই হতো ।

ওনার সঙ্গে একদিন রেষ্ট হাউসে গেলাম । এখানেই সব থাকেন । কেউ পার্মানেন্ট সীট নিয়ে, কেউ বা মেটারনিটি ওয়ার্ডের মত সারি সারি পাতা বিছানায় । সবার জায়গা হয় না বলে, কেউ কেউ বাইরে থাকেন । যেমন সমীরদা ( ততদিনে আসল নাম জেনে গেছি । পদবী সান্যাল ) ।


একটু রাতের দিকে জমজমাটি আড্ডা বসে । সমীরদা নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন ।


একজন বয়স্ক ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে টেনে নিয়ে পাশে বসিয়ে, বললেন :-
-     আমি বাপের ধর !!!
-     ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না !
-     আমি যে কোম্পানীতে কাজ করি, তার নাম হল- বসন্ত আয়ুর্বেদিক প্রডাক্ট ! সংক্ষেপে বাপ। আর আমার পদবী- ধর । তাই, বাপের ধর ।
হাসবো না কাঁদবো বুঝে ওঠার আগেই একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন :- ইনি মহাপুরুষ । গায়ে বড় বড় লোম আছে ।
আবার অবাক হবার পালা আমার ! গায়ে বড় বড় লোম থাকলেই, মহাপুরুষ ?
-      ও একদিন বাথরুমে স্নান করার জায়গা না পেয়ে, ইঁদারার জল তুলে স্নান করছিল ।  খালি গায়ে লোম দেখে, জিজ্ঞেস করলাম- তোর গায়ে এত লোম কেন ? উত্তর দিল- পুরুষ ! বুঝলেন বাপের ধরদা ! একেই বলে- পুরুষ । আমি বলেছিলুম- গাধা তো তালে মহাপুরুষ ! সেই থেকে ওই নামেই পরিচিত- মদন সাহা ।
দেখে- শুনে ঘোর লেগে গ্যালো । ঠিক করলাম এই বৃত্তিতেই আসবো ! বছর চল্লিশ- পঁয়তাল্লিশ আগে, এই বৃত্তি সম্বন্ধে বাইরের লোকেদের ধারণা ছিল- সব বাপে খ্যাদানো , মায়ে তাড়ানো ছেলেদের কাজকম্মো । মেয়েরা তো আসতোই না , এই কাজে ।

কিছু লোকের কালচারাল শক লাগল । কিন্তু আম্মো নাছোড় । সমীরদার কথা মতো বেশ কয়েকটা কোম্পানীতে আ্যপ্লাই করলাম । অবশেষে,সলিলদা বললেন:- দাদা তপন মুখার্জ্জি কটকেই  আসছেন, তোমার ইন্টার ভিউ হবে আমারই বাড়ীতে ।


সমীরদার স্যুট টাই পরেই গেলাম । একটু ঢলঢলে ।
ঢুকতেই জিজ্ঞেস করলেন :- I wonder ! In rainy season, Cuttack is having Circus Party!
-  Why Sir?
-   Oh, noooooooo ! You look like a clown!
-  Yap! I know, I am a mirror! ( তখন অত গুরুত্ব বুঝতাম না কথার)
হেসে ফেললেন  তপন বাবু।

কোলকাতায় যাওয়া টাওয়া হয় ?

হ্যাঁ স্যার ।


ঠিক আছে, তোমার কাছে টেলিগ্রাম  চলে যাবে ফাইনাল ইন্টারভিউয়ের । তৈরি থেকো!
এসো ! গুড লাক্ ।


ছুট্টে এসে রেষ্ট হাউসে খবর দিলাম । সবাই বেশ আনন্দিত । বাপের ধর বললেন :- ব্যাটা রামকেষ্টর বয়স, আমি যতদিন ক্যাজুয়াল লিভ নিয়েছি, তার থেকেও কম ! ব্যাটা জবরদস্ত বলেছে কিন্তু । তবে, তপনবাবুও বেশ স্পোর্টিং । না হলে, রামকেষ্টর চাকরীর কল হতো না !

+++++++

একটু এগিয়ে আসি । ইন্টার ভিউ আর ট্রেইনিংয়ের কথা পরে বলছি ।
আগেই বলেছি  সুপারভাইজারদের অফিসিয়াল কাজ ছিল বেচুবাবুদের কাজের তদারকি করা ।

বাস্তবে যেটা হতো, ত্যালানি না পেলে চাকরি যখন তখন খেয়ে নিতো ।
চালু কথায়, এদের বসবলা হতো/ হয় ।

আমি যতদূর জানি এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে প্রথম নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া হয়, সেটা হল- ওডিশার কটকে ।

বস পেটাইঅভিযানের শুরু এই কটকেই । একদিন রাতের বেলায় চন্দন এসে বলল- বস মাল খাওয়াতে বলল । আমি বললাম, মাইনে পাই নি । ব্যস্   ! বস আমাকে খস খস করে লিখে এই চিঠি দিয়ে বলল ইউ আর টারমিনেটেড ফ্রম দ্য জব , বিকজ ইউ আর নট পারফর্মিং ইউর ডিউটি প্রপারলি ।

আমি অনেক কাকুতি মিনতি করলে, বলল একটা বোতল দে তারপর অন্য কথা ।

আমি কাঁদতে কাঁদতে চলে এসেছি রেস্ট হাউসে  । বাড়ীতে অসুস্থ মা আর অবিবাহিতা বোন । বাবা নেই, চাকরি গেলে খাবো কি ?

চট জলদি সিদ্ধান্ত । আমরা কয়েকজন মিলে চললাম, সেই হোটেলে ।  রুমের দরজায় ঠক ঠক করে খোলালাম ।

র‌্যাভেনশ্য কলেজের কাছে প্রকাশ্য রাস্তায় রাত বারোটা পর্যন্ত চললো বেদম ক্যালানি আর খিস্তি ওই বসকে ।

এক বর্ধমানের দাদা ( নিও ফার্মা কোম্পানির) বলেছিল- খিস্তি আর ক্যালানির বিকল্প হয় না এই সব লোকেদের ক্ষেত্রে ।

টহলদার পুলিসরা কিছুটা হলেও চিনতো আমাদের কয়েকজনকে । কারণ জিজ্ঞেস করাতে, আমি ওডিয়াতে  সংক্ষেপে খুলে  বললাম ঘটনাটা ।

ওদের সাব ইন্সপেক্টরও ক্ষেপে গিয়ে দু তিনটি রুলের বাড়ি লাগালো সেই বসকে । পরে জেনেছিলাম, সেই সাব ইন্সপেক্টরের দাদাও এই রকম ঘটনার শিকার, কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারে নি তখন । এক সমকালে সংঘটন শীল ঘটনা এবং অদ্ভুত সমাপতন ।

বসটি ক্যালানি খেয়ে  টার্মিনেশন লেটার তুলে নিলে এবং মুচলেকাও দিল, যে ব্যাপারটা সে করেছে তার পূর্ণ বয়ান, পুলিশ ষ্টেশনে বসে ।

পরে সেই কপি পাঠাতে সেই বসের চাকরী চলে গিয়েছিল । যদিও সে পরে অন্য কোম্পানিতে যোগ দিয়ে আবার প্রথম থেকে শুরু করে । চন্দনও বেঁচে যায় ।


নীট ফল বিদেশী কোম্পানির ছেলেরাও বুঝলো দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ ।

এদিকে ইউনিয়নের ভেতর অসন্তোষের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছে । চারিদিকে ছাইয়ের আনাগোনা ।







(চলবে)

No comments:

Post a Comment