Powered By Blogger

Saturday, May 9, 2015

বেচুবাবু -৪



অবশেষে সেই কাঙ্খিত ইন্টার ভিউ লেটার এলো কটক ওয়াই এম সি এ য়ের ঠিকানায় ।

 কটকে সন্ধে বেলা কাজের পর খুব একটা করার কিছু থাকতো না- বেচুবাবুদের ।

সলিল দা ( গুপুদা নামেই পরিচিত ছিলেন) , জ্যোৎস্নাদা এবং আরও কয়েকজন আড্ডা মারতেন সমীরদার কাছে এসে ।
 মাঝে মাঝে – জ্যোৎস্নাদার অমরবোর্ডিয়েও আড্ডা বসতো ।

সেদিন ওঁরা আসতেই খবরটা দিলাম ।

বেশ উৎফুল্ল সবাই ।  জ্যোৎস্নাদা বেশ কয়েকটা টিপস্ দিলেন । প্রথমেই বললেন :-

যে প্রশ্নটা অবধারিত করবে, সেটা হলো – লেট আস নো সামথিং অ্যাবাউট ইয়োর সেল্ফ ।
এটা অন্য ভাবেও আসতে পারে তবে এই প্রশ্নটা কেন করা হয় জানো হে ?

আমি তো বাক্যিহারা ।

উনি বললেন :-

কোন বিষয়টা সব চেয়ে ভালো জানো তুমি বলতো হে রামকেষ্ট !

সবচেয়ে ভালো ?

হ্যাঁ, এমনকি নিউটন আইনষ্টাইন- সবার থেকেও ভালো জানো তুমি !

আমি পপাত ধরণীতলে ।  একি রে ভাই, কোথায় নিউটন, আইনষ্টাইন আর কোথায় আমি ?
মিচকি হেসে সমীরদা বললেন :- বুঝলে হে ! যে বিষয়টা সবচেয়ে ভালো জানো তুমি, সেটা হলো নিজের সম্বন্ধে । ওটা তুমি ছাড়া আর কে ভালো জানবে বল?

এগজাক্টলি ! জ্যোৎস্না দা পাইপ টা দাঁতে কামড়ে বললেন ।

ইউ হ্যাভ টু কমিউনিকেট টু ডক্টরস্ অ্যাবাউট প্রডাক্টস্ ।  দে উইল জাষ্ট সি, হাউ ইউ কমিউনিকেট অ্যাবাউট এ সাবজেক্ট ইউ নো বেষ্ট ! ইফ দ্যাট ক্যান বি ডান- ইউ আর থ্রু এইট্টি পারসেন্ট ।

 তারপর আরও কিছু শেখালেন আমায় । যেমন, পাশ করার পর আমি বেকার বসে নেই, প্রাইভেট টিচিং করি- এই সব ।

তার পরের দিনই রওনা দিলাম কোলকাতার উদ্দেশ্যে ।
+++++++++++++++
গ্র্যাণ্ড হোটেল কিন্তু তখন – এখনকার মত ছিল না ।

 রাস্তা থেকে ঢুকতেই একটা লম্বা করিডর । একটু এগোলেই ডান দিকে রিসেপশান । সুবেশা , সুন্দরীরা দাঁড়িয়ে রয়েছেন- মুখের আলতো হাসিটা সুকুমার রায়ের খুড়োর কলের মত  ঝুলিয়ে রাখা।

সদ্য চৌরঙ্গী উপন্যাসটা পড়া শেষ করেছি তখন । শাজাহান হোটেল নাকি আসলে গ্র্যাণ্ড । নাকি গ্রেট ইর্ষ্টান ?

 জানতাম, স্যাটা বোসের দেখা পাবো না, তবু একটা আশা ছিল মনের কোথাও।

দৃশ্যান্তর

হোটেলের একটা বড় ঘরে তিনজনের সামনে আমি একা । একজন পূর্বপরিচিত – তপন মুখার্জ্জি, আর দুজনের পরিচয় পরে পেয়েছিলাম ।

মিঃ ফনসেকা আর মিঃ দিশা , দুজনেই গোয়ান ।

আমার  হাতে লেখা বায়োডাটা মন দিয়ে পড়ছেন – মিঃ ফনসেকা আর আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মিঃ দিশা ।

ফনসেকা ( হাতটা বাড়িয়ে) :- সো মিঃ ভট্টাচারিয়া,  গ্ল্যাড টু মিট ইউ ।
-       ( একটু ঘাবড়িয়ে, তাও হাত বাড়িয়ে) মি টু স্যার !
-      হোয়াই ?
-       আই আম একস্পেকটিং  মাই জব ফ্রম ইউ স্যার ( জিবে দুষ্ট সরস্বতীর ভর তখন)
-       বাট ইয়োর একস্পেকটেশন মে গো রং !
-       নাথিং সিওর ইন লাইফ, বাট টু এক্সপেক্ট ইজ এ পজিটিভ থিংকিং  স্যার্( জ্যোৎস্নাদার  শেখানো  কমন প্রশ্নটা পড়ে গেল বলে, মুখস্থ করা উত্তরটা ঝেড়ে দিলাম)
-       হাউ মেনি টাইমস, ইউ লাই ইন এ ডে মিঃ ভট্টাচারিয়া ?
-      ( জ্জয় গুরু জ্যোৎস্নাদা, আবার কমন) , ইটস এ সিচুয়েশানাল ডিমাণ্ড স্যার
-       ( বিস্মিত হয়ে) গুড !
-      এনি আইডিয়া অ্যাবাউট দ্য জব ?
-      টু সাম এক্সটেন্ট বাট .......
-      এনি প্রিভিয়াস এক্সপিরিয়েন্স ?
-      নো স্যার !

-      হোয়াট ইজ সালফা ?
-      আই ডোন্ট নো স্যার
-      ডু ইউ নো তেলুগু অ্যাণ্ড ওডিয়া সিরিয়াসলি ?
-      ক্যান আই ষ্টার্ট স্পিকিং ইন দোজ টু ল্যাংগুয়েজেস ?
-       ( হেসে) নট রিয়েলি ! ওক্কে ইউ মে গো নাও  । উই উইল ইনফর্ম ইউ বাই কেবল ।  আর ইউ রেডি টু জয়েন ?
-      অ্যাজ সিওর আ্যাজ আই অ্যাম সিয়িং ইউ স্যার ।
-       ওকে ।

বেরিয়ে এলাম মনে একটা খুঁতখুঁতোনি নিয়ে
তবে, শেষ মেষ চাকরীটা জুটেছিল ওই দুটো স্থানীয় ভাষা জানার জন্য ।


 ট্রেলিগ্রাম পেলাম যথাসময়ে ।   বাবার কাছ থেকে দুশো টাকা নিয়ে রওনা বোম্বের পথে ।

উঠতে হবে বায়াকুল্লার নতুন পাঁচতারা হোটেল হেরিটেজে ।
 সেখানকার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি আপনাদের । এটা আমি বারবার লিখি আমার বোকামির নিদর্শন হিসেবে ।
কারণ একটাই এখানে জ্যোৎস্নাদা ছিলেন না আমাকে শেখানোর জন্য ।
+++++
নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের কাছে বোম্বে শহরটা তখন অধরা ।

একবার মায়ের কাছে আবদার করে, টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম বোম্বেতে  । সে যে কি করুণ হাল হয়েছিল, সেটা হয়ত অনেকেই পড়েছেন আমার বোকা বোকা লেখায় ।

তবে, দ্বিতীয় বারের বোম্বে যাত্রা- প্লেনে । সেই কাহিনীও হয়তো অনেকে পড়েছেন । আমার প্রথম ওষুধ কোম্পানীতে চাকরীর দৌলতে সেই আইবুড়ো প্লেন যাত্রা ।

বায়কুল্লার পাঁচতারা “হোটেল হেরিটেজ” সবে  কয় দিন হলো খুলেছে তখন । অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে “ট্যাস্কি” করে পৌঁছলাম,সেই হোটেলে ।

বিশাল রিসেপশান কাউন্টারে এক লম্বা সুন্দরী মহিলা দাঁড়িয়ে টেলিফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলেন ।

আমি যেতেই, টেলিফোন নামিয়ে রেখে মিষ্টি হাসি হেসে বললেন :- ইয়েস স্যার, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ ?

“স্বপ্ন নু, মতিভ্রম নু” অবস্থা আমার । মনে হলো স্বয়ং আশা পারেখ আমার সঙ্গে কথা বলছেন ।

আমার গলা দিয়ে একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরুলো ।

ধূলি – ধূসরিত চেহারা । পরণে সেজ মামার ঢলঢলে ব্লেজার ।

টাই তখন কণ্ঠে কা লঙ্গোটি হয়ে ঝুলে আমার আত্মহত্যার পথ প্রশস্ত করছে । বোম্বের গরমে ঘামছি দরদর করে ।

ভদ্রমহিলা একটুও না ঘাবড়িয়ে আমাকে একটা সুন্দর কাঁচের গ্লাসে জল দিলেন ।  গোঁৎ গোঁৎ শব্দে সবটুকু জল খেয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম ।

বুঝতে পারছিলাম, তিনি আমার জল খাবার শব্দ আর কণ্ঠার ওঠাপড়া লক্ষ্য করছিলেন।

কি বলবো- সেটা বাংলায় ভেবে নিয়ে ইংরেজীতে অনুবাদ করে বললাম :-

“ ম্যাডাম, আই এসেছি হিয়ার ফর ট্রেনিং ইন ওষুধ কোম্পানি ।”

ধনুকের মত পটল চেরা চোখের ভ্রু বোধহয় একটু কুঁচকেছিল ।

অ !!! বাঙালি ?  জার্মান রেমেডিস কোম্পানীর ট্রেইনিংয়ে এসেছেন ?

আজ্ঞে !!! আপনি বাঙালি ?

আমার চোদ্দপুরুষ বাঙালি । তবে বোম্বেতে আছি প্রায় পনোরো বছর, বাবার কাজের সূত্রে । এই প্রথম আসা হলো বুঝি ?

আজ্ঞে না, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার । তবে এই রকম হোটেলে প্রথম বার ।

বুঝেছি !! আপনার অ্যাপো লেটার আর পোষ্টাল আইডেন্টটি কার্ড দিন । ( তখন এটাই ছিল পরিচয় পত্র)

আজ্ঞে, অ্যাপো লেটার কি ?

আপনি কি বাঙলা বোঝেন না ?

আজ্ঞে তা বুঝি, তবে ওই অ্যাপো না কি বললেন যে !!!

হুম !!!! ওইটা হলো আ্যপয়েন্টমেন্ট লেটার ।

সেটা বলবেন তো !! সেটা আছে, তবে পোষ্টাল আইডেন্টি কার্ড আনা হয় নি, মানে করা হয় নি ।

আপনার নাম কি ?

এজ্ঞে ! রামকেষ্টো ভশ্চাজ !!!

তিনি একটা জাবদা খাতা বের করে মন দিয়ে পেন ওপর নিচু করে বললেন :- ওই নাম নেই, তবে    রামাক্রিষ্ণা ভটাচারিয়া আছে ।

আরে, ওটাই তো আমার নাম

তবে যে বড়ো রামকেষ্টো ভশ্চাজ বললেন !!

এজ্ঞে ওটা  আমার নামের বঙ্গীয় সংস্করণ ( ততক্ষণে সাহস ফিরে পেয়েছি )

ঠিক আছে, আপনার অ্যাপো লেটার দেখি !!

এবারে আর বুঝতে অসুবিধে হল না । চামড়ার স্যুটকেস খুলে- সব জামা কাপড়, জাঙ্গিয়া, গেঞ্জী, চিড়ের প্যাকেট, মুড়ির প্যাকেট চকচকে মাটিতে ফেলে  একদম নীচ থেকে বের করলাম, আমার দোমড়ানো ফাইল ।

খেয়াল করিনি, আমার চারপাশে তখন বেশ কয়েকজন পুরুষ মহিলা আমাকে ঘিরে ধরে বিস্ফারিত চোখে আমার কীর্তি কলাপ দেখছে ।

বিজয়গর্বে ওই লেটার বের করে মহিলার হাতে দিলাম । মনে মনে আশা- বোম্বে যখন, তখন এই মহিলা হিন্দি সিনেমার ফরমূলা মেনে আমার প্রেমে পড়তে বাধ্য ।

যেন, এক চিমটে দিয়ে আরশোলা তুলছেন- এই ভাবে, আমার অ্যাপো লেটার নিয়ে দেখলেন ।

নামটা মিলিয়ে বললেন :- এবার আপনার লাগেজটা গুছিয়ে নিন প্লিজ ।

আমি ওনার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি  সপ্রেম নয়নে ।

আমার চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে বললেন :- ক্যান ইউ লিশন টু মি ?

চমক ভাঙলো আমার ।

তাড়াতাড়ি করে সব কোনো রকমে কুড়িয়ে নিয়ে স্যুটকেসে ঢুকিয়ে দিয়ে বন্ধ করতে গেলাম । বন্ধ আর হয় না ।

শেষে একটা পা দিয়ে ডালাটা চেপে ধরে ( দুঃ শাসনের রক্তপানের মত )  লক আটকে দিতেই, পঁচিশ বছরের চামড়ার স্যুটকেশের লকের লম্বা পার্টটা পটাং করে সশব্দে বেরিয়ে গেল ।

দাঁত বের করার মতন সুটকেশের ডালা একদিকে খোলা আর একটা ময়লা গেঞ্জি উঁকি দিচ্ছে ।

মহিলা কোনো রকমে একটা খাতায় আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নিলেন । তারপর একজনকে ডেকে বললেন :- সাব কা সামান রুম নং ১১৬ মেঁ লেকে যাও ।

আমি বললাম :- ম্যাডাম , একটা দড়ি হবে ?

কি করবেন , গলায় দেবেন ?

আরে না !!! বিজয়সিংহের বংশধর আমি, হেলায় করি বোম্বে জয় । ওসব কিছু নয়, সুটকেশটা বাঁধবো ।

বোকার মত তাকিয়ে থেকে বললেন – আপনি পারেনও বটে ।


বন্ধুবর অমিতাভ সেনগুপ্ত এই ঘটনার সাক্ষী । সে তখন কোলকাতার পণ্ডিতিয়া নিবাসী ঝকঝকে যুবক, একেবারে রজার মুরের মত চেহারা ।
তোর কি মনে আছে রে, সেই বোকামীর গল্প----- অমিতাভ ?

No comments:

Post a Comment