আজকাল চোখ বন্ধ হলেই মনে হয়, অন্ধকার
এক লেভেল ক্রসিং এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি।সামনে দিয়ে ঝমঝম করে ছুটে যাচ্ছে মেল ট্রেন।
ইঞ্জিনটা কখনও ডাবলু পি ষ্টীম ক্যানাডিয়ান, কখনও বা
ডিজেল বা হালের ঝকঝকে ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ।
কামরা গুলো শনশন করে বেরিয়ে যায়, কখনও আলো
আর আঁধার; পিচকিরি দিয়ে ছিটিয়ে।
অনেকবার চেষ্টা করেছি, কটা কামরা আছে দেখতে, কিন্তু
গতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সারা জীবনভর হয় নি। তাই আর গোনাও হয় না।অন্ধকার জাঁকিয়ে
বসে, ট্রেন চলে যাবার পর। তখন হু হু করে মন। ধূ ধূ করা কাকে বলে, হাড়ে হাড়ে বুঝি।
আজকাল ১ মিলিগ্রাম আ্যালপ্রাজোলাম খাই আমি। তা প্রায় ৯ বছর
হয়ে গেল। ঘুমের ওষুধের মৃদু ঝাঁকুনিতে, শরীর টা মনে হয় ট্রেনের কামরাতেই
আছে।
ডাবলু পি ষ্টীম ক্যানাডিয়ান ইঞ্জিনে টানা মেল ট্রেনটা হঠাৎ
দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনেই একটা কামরা! প্রতিটা জানলায় জ্বলছে আলো।
আমি তখন কটক ওয়াই এম সি এ তে থাকি । বাবা টাকা পাঠান, কিন্তু তাঁর অবসরের সময় চলে আসছে ।
বালেশ্বরের বাড়ীতে দুই ভাই এবং বোন । এই তিনজনেরও পড়াশোনার খরচের এক বিরাট
ধাক্কা সামলাতে হয় বাবাকে ।
নিজেকে বড় অসহায় বোধ করছি । একটা অর্থকরী ব্যাপার না হলে তো
বড় মুশকিল। টিউশনি পেলাম তিন চারটে । বাড়ীতে বারণ করে দিলাম, টাকা পাঠাতে । বাবার কাছে টাকা পাঠাতে না পারি, অন্তত
নিজের খরচটুকু চালিয়ে নিতে পারবো ।
মাঝে মধ্যে র্যভেনশ্য
কলেজ চত্বরে যাই । আমারই সহপাঠী হেমন্ত
বলে একটি ছেলে তখন বাজারে সদ্য আসা অটো চালাতে শুরু করেছে । চাকরীর বাজার এতই
খারাপ ।
তবুও আড্ডা হয় কলেজ চত্বরে । একদিন দেখি আমাদের অন্য এক
সহপাঠী ভাস্কর পট্টনায়ক এক চকচকে ঢাউস পেটমোটা বাদামী ব্যাগ সহ , টাই পরে আড্ডায় হাজির ।
এসেই - আড্ডায়
হাজির সকলের জন্য ফুল কাপ চা, পরোটা তরকারি আর একটা করে
ক্যাপষ্টান সিগারেটের অর্ডার দিল ।
এসব দেখে আমরা প্রত্যেকে একজন করে মূকাভিনয়ের চরিত্রের মত চিত্রার্পিত । বেশ খানিক পরে, হেমন্ত জিজ্ঞেস করল – তালে তুই চাকরী পেলি ? (হেলে, তুঅর চাকিরিখণ্ডে মিলি গলা ? )
ভাস্কর টাইয়ের নট টা আলগোছে ডান হাত দিয়ে একটু নাড়া চাড়া
করে বলল- হ্যাঁ ( হঁ)
আড্ডার মেয়েরাও অন্য টেবিল থেকে ভাস্করের দিকে অপলক
দৃষ্টিতে চেয়ে । স্বয়ং শাম্মি কাপুর বা
দেবানন্দ্ যেন সামনে বসে আছেন । ভাস্কর এমনিতেই দেখতে ভারি সুন্দর ছিল, কিন্তু এতদিন বোধহয় সেটা মেয়েদের চোখে পড়ে নি ।
চোখে না পড়ারও কথা । মেয়েরা সেভাবে ছেলেদের সঙ্গে মিশতো না
ওডিশায় । আড্ডা তো অনেক দূরের কথা । তবুও
যে কজন আসতো, তারা দুঃসাহসী বলেই পরিচিত ছিল ।
ভাস্করকে জিজ্ঞাসা করা হলো- তুই কি চাকরি পেলি ? ( ততে কোওন চাকিরই মিলিলা কি ?)
ঘাড়টা শাম্মি কাপুরের মত হেলিয়ে উত্তর দিলো :- মেডিক্যাল
রিপ্রেজেনটেটিভ ।
আমাদের সমবেত আর্তনাদ ( মেয়েরা ছাড়া ) – আমোকু মিলিব নাহি ? ( আমরা পাবো না?)
ভাস্কর এবারে উত্তমকুমারের মত ভুবন মোহিনী হাসি দিল :- সে
অনেক ঝঞ্ঝাট ।
কি রকম কি রকম ?
প্রথমে যেতেই তারা আমাকে একটা ঘরে ঢোকালো । সেই ঘরে চারিদিক
দিয়ে জল পড়ছে বৃষ্টির মত । আমি ভিজেই যাচ্ছি
। অনেক ক্ষণ পর বের করে নিয়ে আর একটা ঘরে ঢোকালো । প্রচণ্ড গরমে পুড়ে
যাচ্ছি মনে হলো । কতক্ষণ জানিনা প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছি, এই সময়
আমায় বের করে আর একটা ঘরে ঢোকানো হল ।
প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মনে হলে জমে যাবো । এবারে আমাকে বের করে একজন বললেন :- মিঃ
পট্টনায়ক, ইউ আর থ্রু সাকসেসফুলি ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম- কেন এবং কি ভাবে স্যার ?
আরে, রোদে –বৃষ্টি-
ঠাণ্ডায় তোমাকে কাজ করতে হবে । সেটা পারো
কিনা, তার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম । তুমি সফল ।
তোর কোম্পানির নাম কি ? আমার কাতর
জিজ্ঞাসা
বারোজ ওয়েলকাম
মানে ?
ফার্স্ট বরো দেন ওয়েলকাম
কথা গুলো বলে ভাস্কর বিল মিটিয়ে চলে গেল ।
হেমন্ত হতাশ হয়ে বলল :- ধ্যাত্ ! অটোই চালাবো । কয়জন আর
এমএসসি পাশ করে, অটো চালায় বল দিকি ?
আঙুর ফল টক ( মনে মনে ভেবে ) সবাই বললাম ---- হঁহঁ হঁ !!!
(চলবে)


No comments:
Post a Comment