==========
আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গের বাইরের রাজ্য বা এই রাজ্যের জেলা শহর থেকে প্রথম কোলকাতায় আসি – তারা হকচকিয়ে যাই বৈকি ।
যদিও আমি নিজে স্কুল জীবন কোলকাতায় কাটিয়েছি – তবু তখনকার কোলকাতায় এত যানজট বা কোলাহল ছিল না ।
জীবন যাপন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের পক্ষে অনেক সহজ ছিল ।
আর বাঘাযতীন, গড়িয়া এমনকি যাদবপুরও তার গা থেকে ঢিলেঢালা গ্রামীন চাদরটা ছেড়ে ফেলতে পারে নি তখনও ।
উত্তর কোলকাতায় আসা যেত দোতলা টুবি বাসে , গড়িয়াহাট থেকে । এই জায়গা থেকেই শহরের আলতো ছোঁয়া পেতে শুরু করতাম আমরা ।
তখন, ঢাকুরিয়াতে রেলের লেভেল ক্রসিং ছিল । সবে তৈরি হতে শুরু করেছে ফ্লাইওভার যার এখনকার পোষাকী নাম – চৈতন্যদেব সেতু ।
যখনকার কথা বলছি – (১৯৬১ -১৯৬৪), তখনও শ্যামবাজারে নেতাজীর মূর্তিও স্থাপিত হয় নি ।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ আসতে হলে তখন টুবি ভরসা । ওই রুট ছিল – বালীগঞ্জ ষ্টেশন থেকে পাইকপাড়া পর্যন্ত ।
আর জি করের পরে আর যেতে সাহস হয় নি, কিশোর বয়সে । জানতাম, ওদিকে দমদম, তবু আসা হয় নি কোনো অজানা কারণে ।
পকেটমারি ছিল বাসে ট্রামে তবে এতটা নয় । খুন জখম যে ছিল না, তাও নয় তবে সেটা বেশীরভাগই ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্যকিছু থেকে হতো ।
রাজনৈতিক খুনের ঘটনা বেড়ে গেল ১৯৭০ সাল থেকে । তখন যে ভাবে খুন জখমের বর্ণণা দেওয়া হতো কাগজে – তাতে হৃৎকম্প, বাড়তো বই কমতো না ।
আমি পড়তাম – একদিনের বাসী কাগজে । তাও সকালে নয়, দুপুরের দিকে । ট্রেণ লেট থাকলে সন্ধেতে । বেশী লেট হলে, আর কাগজ দিতো না হকাররা ।
একবার ১৯৬৮ বা ১৯৬৯ হবে বোধহয় – দেখি, শ্যামবাজারের আমূল পরিবর্তন । নেতাজীর ষ্টাচু বসানোর কাজ চলছে বা বসে গেছে ।
ধীরে ধীরে বাঘাযতীন আর যাদবপুর , হালতু ইউনিয়ন, ছগণ্ডা পরগণার থেকে কোলকাতা হয়ে যাচ্ছে ।
বদলে যাচ্ছে জীবন যাপনের ধারা । পাড়ার আঁটসাঁট ভাবটা বদলে কেমন যেন একটা অচেনা অজানা চেহারায় বদলে যাচ্ছে সব কিছু ।
বাঘাযতীন থেকে বিজয়গড় যেখানে হেঁটে যেতে হতো, সেখানে চলে এসেছে রিক্সা।
উত্তর কিন্তু নট নড়ন চরণ । সেই পাড়া – বৈঠকী মেজাজ , রকের আড্ডা , হা হা করে হাসা, সব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা জমজমাটি ভাব তখনও ।
আড্ডাতেই তৈরি হয়েছিল স্লোগান:-
বোরদে, তু খেলনা ছোড়দে!
শ্যামবাজারে অনেক কটা দোকান ছিল যেখানে সুগন্ধওয়ালা চা , সেদ্ধ হাঁসের ডিম আর ঝাল মিষ্টি টোষ্ট পাওয়া যেত আসল পলসন বাটার দিয়ে ।
একটা কফি হাউসও ছিল । উত্তরের দিগগজরা আড্ডাও মারতেন সেখানে ।
কলেজ ষ্ট্রিটকে বলা যায় মধ্য কোলকাতা । রেলিংয়ে ঝোলানো বা ফুটপাতে রাখা থাকতো – অজস্র পুরোনো বই ।
চারমিনার সিগারেটে টান দিতে দিতে বই পিপাসু লোকজন তাদের হারানিধি খুঁজতো ।
দরাদরিও চলতো । সবচেয়ে বেশী পুরোনো বইয়ের ষ্টক ছিল – করিম চাচার কাছে ( নামটা এখন ঠিক মনে পড়ছে না ) ।
মোড় থেকে হেদুয়ার দিকে যেতে বোধহয় বাঁ দিকে দোকানটা পড়তো ।
তখনকার ফিল্ম মেকাররা ওই বইয়ের দোকানে হানা দিয়ে বই টই কিনে এসে বসতেন কফি হাউসে ।
গণসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান তো হতই, কাফকা কামু থেকে শরৎ, বিভূতি ( যেন সব ইয়ার দোস্ত) সবাইকে নিয়েই আলোচনার রমরমা ।
প্রথমে ঢুকলেই মনে হতো – ভুভুজেলা বাজছে চারিদিকে , যদিও তখন ভুভুজেলা কি জিনিস জানে না কোলকাতা শহর ।
১৯৯৬ সালে যখন পাকাপাকি ভাবে দমদমে এলাম – চেষ্টা করেছিলাম, সেই পুরোনো যাদবপুর বাঘাযতীন, শ্যামবাজারকে খুঁজতে ।
একটু করে মন খারাপ হয়, তবু মেনে নেই আস্তে আস্তে ।
ধীরে ধীরে যে সেই পুরোনো কোলকাতা গুগুল পিকচারসে বা ইউ টিউবে চলে যাবে সেটা বুঝি নি ।
“ভেসে আসে কোলকাতা, কুয়াশা তুলিতে আঁকা
শহরতলীর ভোর মনে পড়ে ।” ( মহীনের ঘোড়াগুলি)

No comments:
Post a Comment