আজ ইংরেজী সনের বাইশে মে । এই দিনটার গুরুত্ব আমরা অনেকেই ভুলতে বসেছি, তবে কেউ কেউ ১৭৭২ সালের কথা মনে রেখেছেন হয়তো ।
হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে এই দিনে ১৭৭২ সালে জন্মেছিলেন এক সমাজ সংস্কারক , যাঁকে আমরা এখন আর সেভাবে মনে রাখি নি ।
পাঠ্যবইয়ে নমো নমো করে পড়ানো হয় তাঁর জীবনী । তাই সেভাবে ছাত্র – ছাত্রীদের মনে দাগ কাটে না তাঁর বিশাল কর্মকাণ্ডের ।
সেই সময়ে সমাজে গেঁড়ে বসে আছে হিন্দু ধর্মের নানা কুসংস্কার । ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে প্রাবল্য নানা ধরণের বিকৃত মানসিকতার ।
নিয়ম-কানুন, বিধি-নিষেধ, অন্ধবিশ্বাস চেপে বসে থাকতো ( এবং এখনও থাকে) সেই সব আচার অনুষ্ঠানে । এতে কোনো নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ছিল না, থাকলেও নীরবে নিভৃতে হারিয়ে যেত প্রবল সামাজিক দাপটে ।
বন্দ্যোপাধ্যায় বংশে জন্মে এমন এক কুলাঙ্গার এই সব প্রথাকে ভাঙ্গতে চাইবে , সেটা অধিকাংশরাই মেনে নিতে পারেন নি । শুরু হয়েছিল প্রবল আক্রমণ ।
উত্তরে তিনি লিখেছিলেন :- “আমার সমস্ত তর্ক বিতর্কে আমি কখনো হিন্দুধর্ম্মকে আক্রমণ করি নাই। উক্ত নামে যে বিকৃত ধর্ম্ম এক্ষণে প্রচলিত, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল। আমি ইহাই প্রদর্শন করিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম যে, ব্রাহ্মণদিগের পৌত্তলিকতা, তাঁহাদিগের পূর্ব্বপুরুষদিগের আচরণের ও যে সকল শাস্ত্রকে তাঁহারা শ্রদ্ধা করেন ও যদনুসারে তাঁহারা চলেন বলিয়া স্বীকার পান, তাহার মতবিরুদ্ধ।
আমার মতের প্রতি অত্যন্ত আক্রমণ ও বিরোধ সত্ত্বেও, আমার জ্ঞাতিবর্গের ও অপরাপর লোকের মধ্যে কয়েকজন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আমার মত গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিলেন।”
তিনি আকৃষ্ট হন – “ব্রহ্মসূত্র ” এবং উপনিষদের প্রতি। এই উপনিষদীয় দর্শন নিয়েই তিনি রচনা করেন “বেদান্ত গ্রন্থ”। আর এই বেদান্ত গ্রন্থের দর্শনকে কেন্দ্র করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “ব্রাহ্ম সমাজ” এবং নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা। সংস্কৃত না জানা বাঙ্গালীকে উপনিষদের বাণীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই তিনি নিজে পাঁচটি উপনিষদ যথা ঈশ, কেন, কঠ, মুণ্ডক ও মাণ্ডুক্য উপনিষদ বাংলায় অনুবাদ করেন।
তিনিই সতীদাহ-প্রথা বন্ধ করেন। সাধারণতঃ লোকের বিশ্বাস, এই সংস্কার সম্পূর্ণরূপে ইংরেজরা করেছিল হিন্দু ধর্মের অবমাননার জন্য কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়।
তিনিই এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করেন এবং একে রহিত করবার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সাহায্য পান । যত দিন না, তিনি আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন, ততদিন ইংরেজরা কিছুই করেনি।
বেদান্ত-উপনিষদগুলি বের করবার সময়ই তিনি সতীদাহ অশাস্ত্রীয় এবং নীতিবিগর্হিত প্রমাণ করে বই লিখলেন 'প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ'। প্রতিবাদে পুস্তিকা বের হল 'বিধায়ক নিষেধকের সম্বাদ'।
তার প্রতিবাদে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুস্তিকা বের হয়। এই বছরেই ডিসেম্বর মাসে আইন করে সহমরণ-রীতি নিষিদ্ধ করা হয়। তবুও গোঁড়ারা চেষ্টা করতে লাগল যাতে পার্লামেন্টে বিষয়টি পুণর্বিবেচিত হয়। এই চেষ্টায় বাধা দেবার জন্য তিনি লণ্ডন গিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন- ‘বর্তমান বঙ্গসমাজের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন । আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি। তিনি আমাদের জন্য যে কত করিয়াছেন, কত করিতে পারিয়াছেন, তাহা ভালো করিয়া আলোচনা করিয়া দেখিলে তাঁহার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও বিশ্বাস জন্মিবে। আমাদিগকে যদি কেহ বাঙালি বলিয়া অবহেলা করে আমরা বলিব, তিনি বাঙালি ছিলেন।’
প্রপিতামহ কৃষ্ণকান্ত ফারুখশিয়ারের আমলে বাংলার সুবেদারের আমিনের কার্য করতেন। সেই সূত্রেই এঁদের 'রায়' পদবীর ব্যবহার। আর দিল্লীর বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর তাঁকে 'রাজা' উপাধি দিয়েছিলেন ।
আজও আমরা বাঙালি, কিন্তু তাঁকে মনে রাখিনি । তবু নারী পুরুষ নির্বিশেষে অক্ষম বাঙালিদের প্রণাম রইলো- রাজা রামমোহন রায়ের প্রতি ।
======
তথ্য - নানা ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া

No comments:
Post a Comment