অর্পণের আজকাল বাড়ী থেকে বেরুনো হয় না । নানা শরীরঘটিত সমস্যা । তার ওপর একটা নতুন উপসর্গ এসে জুটেছে । দুপুরে খাবার পর পরই ওর ভীষণ “পটি” পায় । আবার কমোড ছাড়া পটিতে বসতেও পারে না, হাঁটুর ব্যাথার জন্য ।
তাই পুরোনো সহকর্মী সোমনাথের নাতনীর জন্মদিনের লাঞ্চে যাবে না ভেবেছিল অর্পণ ।
যারা সোমনাথের তরফে নিমন্ত্রিত, প্রায় সবাই এখন বৃদ্ধ – তাই দুপুরেই খাবার আয়োজনটা ছিল যাতে রাত্রে যাতায়াতের অসুবিধে না হয় ।
সোমনাথ এটাও বলেছিল – আসল ব্যাপারটা তো রাতে, ছেলের বন্ধুবান্ধরা আসবে তখন । দুপুরে হলে জমিয়ে চিল্ড বিয়ারটাও খাওয়া যাবে ।
এই লোভটাও উপেক্ষা করেছিল অর্পণ । সকলের সামনে, তোদের টয়লেটটা কোথায়, এটা বলাও লজ্জার ।
কিন্তু, সোমনাথ ভোলবার নয় । গাড়ী নিয়ে এসে জোর করে তুলে নিয়ে গেল অর্পণকে ।
যেতে যেতে বলল – তুই দেখি আজকাল কেমন যেন হয়ে গেছিস ! কেন রে ?
অর্পণের আর উত্তর দিতে ভালো লাগে না । এটা সেটা বলতে বলতে চলে এলো সোমনাথের বাড়ী ।
অলক, অণির্বাণ, শ্যামলরা হৈ হৈ করে উঠলো অর্পণকে দেখে ।
অলক, তার সেই আগের কায়দায় পাঁচটা সিগারেট একসঙ্গে নিজের দু ঠোঁটে ধরিয়ে প্রত্যেকের মুখে গুঁজে দিল ।
শ্যামল নিয়ে এলো ঠাণ্ডা বিয়ার ভর্তি কাঁচের বড় মাগ । সব মিলিয়ে নরক একেবারে গুলজার ।
অর্পণের একটু ধুনকিও এসেছে দু মাগ সাঁটিয়ে । বেশ কয়েকটা চিকেন পকোড়া খেয়ে পেটটা ভার । লাঞ্চটা খেতে পারবে কিনা সন্দেহ ।
সোমনাথ ধাক্কা দিয়ে বললো :- কি রে ঢুলছিস যে বড়ো ? তোর সেই বালেশ্বরের এক্সপিরিয়েন্সটা বল আবার । সবাই তো জানে না এখানে ।
তালে এখন কিন্তু লাঞ্চ খাবো না । পেট ভারি হয়ে আছে ।
আরে ধ্যুস্ । সবারই তাই । পরে খাওয়া যাবে – নে নে,শুরু কর্ তো !
এটা প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগের ঘটনা । - অর্পণ শুরু করলো ।
তখন একটা ল্যামব্রেটা স্কুটার কিনেছিলাম আড়াই হাজার টাকায় । আগে বুকিং করলে অনেক পরে মিলতো স্কুটার, মটোর সাইকেল এমন কি গাড়ীও । গাড়ীটা আগে পেলেও স্কুটার, মটোর সাইকেল সহজে মিলতো না, কম সে কম দু বছরের আগে ।
এটা আমার বন্ধু বুক করেছিল, কিন্তু বাড়ীতে মা বাবা আপত্তি করায় আমার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে যায় । সেল ডিড করে স্কুটারটা কিনেই নিলাম ওর কাছ থেকে ।
বালেশ্বর শহর থেকে বারো কি মি দূরেই রেমুনায় চৈতন্যদেবের স্মৃতি বিজড়িত ক্ষীর চোরা গোপীনাথের মন্দির । যাওয়া হয় নি কখনও । এক রোববার বেড়িয়ে পড়লাম – স্কুটার নিয়ে ।
বালেশ্বর শহর ছাড়ালে-ন্যাশনাল হাইওয়ে সিক্স পেরিয়ে রেমুনা । পিচঢালা রাস্তা ভালোই তখন । আরামসে চালিয়ে যাচ্ছি । পড়ন্ত শীতের সময় । দুপুরবেলা বলে সেরকম ঠাণ্ডা লাগছে না ।
কেন জানি মেঘে কালো হয়ে এলো আকাশ । বৃষ্টি আর সাথে ঘন ঘন বাজ পড়া ।
রাস্তার ধারে একটা ঝোপড়িতে একটা চায়ের দোকানে কিছু লোক বসে আছে । সেখানে ঢুকলাম, স্কুটারটা রাস্তায় স্টান্ড করিয়ে ।
হঠাৎ একটা তীব্র ঝলকানি । মনে হলো বাজটা আমার গায়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি ।
একটা ঝাঁকুনি খেয়ে দেখি – আমি একটা সুড়কি ঢালা রাস্তায় দাঁড়িয়ে । দুই পাশে গাছে গাছে ভর্তি । কোথাও আমার স্কুটার নেই এমন কি চালা ঘরটাও ।
দূ
রে একটা মন্দিরের চূড়ো দেখা যাচ্ছে পরিস্কার ভাবে । এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি কেউ নেই ।
অর্পণ চুপ করলো ।
কি রে চুপ করলি কেন ?
ধ্যুস্ ! গলা শুকিয়ে গেছে বকবক্ করে ।
আরে নে নে বিয়ার নে । যদিও ঢপ, তবে জমিয়ে দিয়েছিস । চালিয়ে যা । শ্যামল হাসতে হাসতে বলাতে, অর্পণ রেগেই গেলো ।
সোমনাথ, তোর ড্রাইভারকে বলতো – আমাকে আমার ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেবে ।
এই দ্যাখো ! তুই রাগছিস কেন ? আমি তো জানি ঘটনাটা সত্যি । নে নে চুমুক দিয়ে আবার শুরু কর্ ।
অর্পণ কিছুটা শান্ত হয়ে আবার শুরু করলো – দু ঢোঁক খেয়ে ।
হঠাৎ দেখি এক চৈতন্য দেব মার্কা লোক আমার দিকে ধীরে ধীরে আসছে । কাঁধে একটা ঝোলা কাপড়ে গিঁট মেরে তৈরি আর উর্ধাঙ্গে একটা গেরুয়া চাদর হালকা ভাবে ফেলা । নিম্নাঙ্গে একটা গেরুয়া ধূতি একটা অদ্ভূত কায়দায় পরা ।
হেসে বললো আমায় – বৎস, কোথা হইতে আগমন করিয়াছো, এই বিজাতীয় পোশাকে ?
কেমন যেন ভেবলে গেলুম মাইরি ! লোকটা কে আর বলে কি? এখানে তো ওডিয়া ভাষার চল । বাংলা বলছে- তাও যেন কিরকম একটা স্টাইলে ।
গলা শুকিয়ে গেছে । কথা বলতে পারছি না । কি বুঝে, লোকটা ওর ঝোলা থেকে একটা পাথরের ঘটি বের করে আমায় দিয়ে বললো – লহ বৎস, ইহাতে বলবর্ধক পানীয় রহিয়াছে । পান করো । শরীর শীতল হইবে ।
আবার একটা বাজের বিশাল শব্দ । দেখি আমি সেই চালাঘরে বসে আছি ঐ লোকগুলোর মধ্যে । ওরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।
আকাশ একদম পরিস্কার । আমি নাকি কি সব বিড়বিড় করছিলাম নিজের মনে ।
একটু থিতিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম – রেমুনা মন্দিরঅ কে বাটে যিবি কি ? ( রেমুনা মন্দির কোন রাস্তা দিয়ে যাবো?) ।
কজন হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলো রাস্তাটা । দেখে টেকে ফিরে এসে এই ঘটনাটা সোমনাথকে বলেছিলাম ।
সোমনাথের ছেলে – কাকা, খুব যদি ভুল না করি – তবে তুমি টাইম ট্র্যাভেল করেছিলে ।
অর্পণ একটা চুমুক দিলো বিয়ার মাগে । কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো – হতে পারে ।

No comments:
Post a Comment