Powered By Blogger

Wednesday, September 20, 2017

দুর্গাপূজা

আড়ম্বরে দুর্গাপূজার প্রচলন ষোড়শ শতাব্দীর মোঘোল আমলেই শুরু হয়- যদিও দুর্গাপূজা এর অনেক আগে থেকেই চালু ছিল ।

ইংরেজরা আসার পর , দেওয়ান, মুৎসুদ্দি, গোমোস্তা, জমিদার, তালুকদারদের হাতে প্রচুর টাকা এলো ।

তাই দুর্গাপূজাতে আড়ম্বর করতেই হবে । জাঁকজমক না দেখালে আর কিসের বড়লোক ?

পরাধীন দেশে এই টাকাগুলো যে বিভিন্ন শিল্পতে ব্যবহার করা যেতে পারে, সেটা এই জেন্টুদের ( নামকরণ বিনয় ঘোষ) মাথায় ছিল না । থাকলেও – সেগুলো করার সাহস বা ইচ্ছা, দুটোই ছিল অনুপস্থিত ।


এই ফাঁকে রাজশাহীর, তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ রায় ( ভাদুড়ী) ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে চালু করলেন দুর্গোৎসব ।

এখন আমরা যে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী সহ যে দুর্গামূর্তি দেখি, সেটা পণ্ডিত রমেশ আচার্যর (শাস্ত্রী) পরামর্শে করা , সেই দুর্গোৎসবে ।


এখানেই প্রথম চালু হয়, নতুন জামা কাপড় পরা, নতুন জিনিস কেনা - মতপার্থক্য থাকলেও এটা মনে হয় মান্যতা পেয়েছে ।

চারদিন ধরে দরিদ্র লোকজনদের পেট ভরে খাওয়ানো হয়েছিল, যদিও স্থায়ী কিছু করার উদ্দ্যোগ রাজা কংসনারায়ণ নেন নি ।

পরোক্ষে তাঁতি, দর্জি, কুমোর থেকে চাষী এর ফল পেয়েছিল, কারণ লোকেরা রাজার ফরমান পেয়ে সব কিছুই নতুন ভাবে তৈরি করায় ।

এটাও শোনা যায় যে এই সমস্তের খরচ নাকি স্বয়ং রাজাই দিয়েছিলেন ,কিন্তু কোনো তথ্য এই সম্পর্কে পাওয়া যায় নি ।

সেই সময়, এই দুর্গাপুজোর জন্য নয় লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল । বেশীর ভাগটাই বাইজী, নাচা গানাতে খরচ হলেও লোকেদের জন্য খরচ করা হয়েছিল এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না ।

এই পুজোর পাল্লা দিতে, রাজশাহীর রাজা জগৎনারায়ণ সেই বছরেই দশ লক্ষ টাকা খরচ করে পুজো করেছিলেন ।

দুজনেই দরিদ্রনারায়ণ সেবার নামে ঐ চারদিন লোক খাইয়েছিলেন এলাহী ভাবে।
শহর কোলকাতায় ১৭৯২ সালে রাজা সুখময় রায় সকলকে টেক্কা দিতে চেষ্টা করেছিলেন ।
সুস্থ ধারার জন্য যদি এই সব টাকা খরচ করা হতো, তবে বোধহয় বঙ্গবাসীদের এতটা দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হতো না ।

সেই ধারা এখনও চলছে লাগামহীন ভাবে ।

তখনকার ব্রাহ্ম সমাজ থেকে এর নিন্দা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে ভাবে জনসাধারণের মনে দাগ কাটতে পারে নি ।

ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র তত্ত্ববোধিনীপত্রিকায় লেখা হয়েছিল :-

ষন্মনসা ন মনুতে যে নাহুর্ননোমতং ।
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ।।

অর্থ :- মনের দ্বারা যাঁহাকে মনন ( চিন্তা) করা যায় না, যিনি প্রত্যেক মননকে জানেন, তাঁহাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানো । লোকে যে পরিমিত পদার্থের উপাসনা করে তাহা কখনো ব্রহ্ম নহে ।

এতসব সত্বেও কিন্তু জাঁকজমক রেষারেষি কিচ্ছু কমে নি ।

আমার যেটা মনে হয় আমাদের মন কখনও শূন্য বা ভ্যাকুয়াম হতে পারে না । ধর্মটাই জেঁকে বসে বেশী এবং আজও বহমান ।

নবকৃষ্ণ দেবও হেষ্টিংসকে খুশী করতে ১৭৫৭ সালের পর দুর্গাপূজা করেন ।
আরেক বড়লোক চূড়ামণি দত্ত টেক্কা দিতেই থাকেন ।

 কিছু সময় এগিয়ে এলে দেখি- সেকালে পুজোর সময় পূজাসাহিত্য ছিল শারদীয় সংখ্যা ছিল না ।

প্রথম যে শারদীয় সংখ্যার উল্লেখ দেখি সেটা হলো, সুলভ সমাচার । ১৮৭৯র ৪ ঠা অক্টোবর এর প্রথম প্রকাশ শারদীয়া হিসেবে যদিও ১৮৭০ সাল থেকেই এই পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছিলো ।

দাম ছিল এক পয়সা, তাই এক পয়সার কাগজ হিসেবেই পরিচিত ছিল এই কাগজ ।

এদিকে নতুন কাপড় পরার রেওয়াজে দর্জিরা করে কর্মে খাচ্ছিল ।

রমজান ওস্তাগর তো প্রবাদ প্রতিম ধনী হয়ে গেল দর্জির কাজ করে ।

ইংরেজরা নিয়ে এলো রেডিমেড জামা কাপড় । ফলে দর্জিরা আর হালে পানি পায় না ।
ছড়া চালু হলো :-

খাচ্ছিল দর্জি সেলাই করে

ভাত মারল ইংরেজের এঁড়ে

১৮৫৩ সালে কোলকাতায় বাবু রাজেন দত্ত অ্যামেরিকা থেকে প্রথম সেলাই কল নিয়ে এলে দর্জিদের কপাল একটু একটু করে আবার খুলতে শুরু করে ।

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কোনো শাস্ত্রক্তো বিধান আছে বলে জানা নেই ।
এ ব্যাপারে পারিবারিক বিধান বা আচারকেই আজও প্রাধান্য দেওয়া হয় ।
আচার তাকেই বলে যা, দেশে বা বংশে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত।
বাবুদের বাড়ীর খাবারের বর্ণণাও আছে বটতলার কবিদের লেখায় । তখন কিছুই বাদ যেত না খাবারে, এমনকি নিষিদ্ধ গোমাংসও । হাঁ হাঁ বা হায় হায় রব না উঠলেও ক্ষুরধার ব্যঙ্গ করা হয়েছে ।

সেই রকম একটা পদ্য দিয়ে শেষ করছি :-

অমৃত সমান বীপস্টিক রলিপুলি ।
পোর্ক চপ সসেজেস, তাকে কভু ভুলি ।।
ফৌল কাটলেট আর লেগ মাটন রোষ্ট ।
দো পেঁয়াজা কাপজেলি খেলে হয় বোষ্ট ।।
ভিন কাটলেট হ্যাম টার্কি এন হ্যাম্ ।
পান কিনা পান কভু গবরনরের ম্যাম্ ।।
এমন, সুস্বাদ খাদ্য ত্রিভুবনে নাই ।
দেবের দুর্লভ ইহা কি কহিব ভাই ।।
অকসং টর্টেল সুপ সকলিং পিগ রোষ্টো ।
যা দেখিলে সেই ক্ষণে চুলকায় মুখ ওষ্ঠ।।
এই সব খানা পেটে পড়িয়াছে যার ।
ভাগ্যের কি সীমা আমি দিবো এ তাহার ।।
যে খেয়েছে সে মজেছে কি বা তার তার ।

স্বর্গ থেকে নেচে ওঠে চৌদ্দপুরুষ তার ।।

No comments:

Post a Comment