আড়ম্বরে দুর্গাপূজার প্রচলন ষোড়শ শতাব্দীর মোঘোল আমলেই শুরু
হয়- যদিও দুর্গাপূজা এর অনেক আগে থেকেই চালু ছিল ।
ইংরেজরা আসার পর , দেওয়ান, মুৎসুদ্দি, গোমোস্তা, জমিদার, তালুকদারদের হাতে প্রচুর টাকা এলো
।
তাই দুর্গাপূজাতে আড়ম্বর করতেই হবে । জাঁকজমক না দেখালে আর
কিসের বড়লোক ?
পরাধীন দেশে – এই টাকাগুলো যে বিভিন্ন শিল্পতে
ব্যবহার করা যেতে পারে, সেটা এই “জেন্টু”দের ( নামকরণ – বিনয় ঘোষ) মাথায় ছিল না । থাকলেও – সেগুলো করার সাহস
বা ইচ্ছা, দুটোই ছিল অনুপস্থিত ।
এই ফাঁকে রাজশাহীর, তাহেরপুরের
রাজা কংসনারায়ণ রায় ( ভাদুড়ী) ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে চালু করলেন দুর্গোৎসব ।
এখন আমরা যে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী সহ যে দুর্গামূর্তি দেখি, সেটা পণ্ডিত রমেশ আচার্যর
(শাস্ত্রী) পরামর্শে করা , সেই দুর্গোৎসবে ।
এখানেই প্রথম চালু হয়, নতুন জামা
কাপড় পরা, নতুন জিনিস কেনা - মতপার্থক্য থাকলেও এটা মনে হয়
মান্যতা পেয়েছে ।
চারদিন ধরে দরিদ্র লোকজনদের পেট ভরে খাওয়ানো হয়েছিল, যদিও স্থায়ী কিছু করার উদ্দ্যোগ রাজা কংসনারায়ণ নেন নি ।
পরোক্ষে – তাঁতি, দর্জি, কুমোর থেকে চাষী এর ফল পেয়েছিল, কারণ লোকেরা রাজার ফরমান পেয়ে সব
কিছুই নতুন ভাবে তৈরি করায় ।
এটাও শোনা যায় যে – এই
সমস্তের খরচ নাকি স্বয়ং রাজাই দিয়েছিলেন ,কিন্তু
কোনো তথ্য এই সম্পর্কে পাওয়া যায় নি ।
সেই সময়, এই দুর্গাপুজোর জন্য নয় লক্ষ টাকা
খরচ হয়েছিল । বেশীর ভাগটাই বাইজী, নাচা গানাতে খরচ হলেও লোকেদের জন্য
খরচ করা হয়েছিল – এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না ।
এই পুজোর পাল্লা দিতে, রাজশাহীর
রাজা জগৎনারায়ণ সেই বছরেই দশ লক্ষ টাকা খরচ করে পুজো করেছিলেন ।
দুজনেই দরিদ্রনারায়ণ সেবার নামে ঐ চারদিন লোক খাইয়েছিলেন – এলাহী ভাবে।
শহর কোলকাতায় ১৭৯২ সালে রাজা সুখময় রায় সকলকে টেক্কা দিতে
চেষ্টা করেছিলেন ।
সুস্থ ধারার জন্য যদি এই সব টাকা খরচ করা হতো, তবে বোধহয় বঙ্গবাসীদের এতটা দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হতো না ।
সেই ধারা এখনও চলছে – লাগামহীন
ভাবে ।
তখনকার ব্রাহ্ম সমাজ থেকে এর নিন্দা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে ভাবে জনসাধারণের মনে দাগ কাটতে পারে নি ।
ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র “তত্ত্ববোধিনী” পত্রিকায় লেখা হয়েছিল :-
“ষন্মনসা ন
মনুতে যে নাহুর্ননোমতং ।
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ।।”
অর্থ :- মনের দ্বারা যাঁহাকে মনন ( চিন্তা) করা যায় না, যিনি প্রত্যেক মননকে জানেন, তাঁহাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানো । লোকে
যে পরিমিত পদার্থের উপাসনা করে তাহা কখনো ব্রহ্ম নহে ।
এতসব সত্বেও কিন্তু জাঁকজমক রেষারেষি কিচ্ছু কমে নি ।
আমার যেটা মনে হয় – আমাদের মন
কখনও শূন্য বা ভ্যাকুয়াম হতে পারে না । ধর্মটাই জেঁকে বসে বেশী এবং আজও বহমান ।
নবকৃষ্ণ দেবও হেষ্টিংসকে খুশী করতে ১৭৫৭ সালের পর
দুর্গাপূজা করেন ।
আরেক বড়লোক – চূড়ামণি দত্ত টেক্কা দিতেই থাকেন ।
কিছু সময় এগিয়ে এলে
দেখি- সেকালে পুজোর সময় পূজাসাহিত্য ছিল – শারদীয়
সংখ্যা ছিল না ।
প্রথম যে শারদীয় সংখ্যার উল্লেখ দেখি – সেটা হলো, সুলভ সমাচার । ১৮৭৯র ৪ ঠা অক্টোবর এর প্রথম প্রকাশ
শারদীয়া হিসেবে যদিও ১৮৭০ সাল থেকেই এই পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছিলো ।
দাম ছিল – এক পয়সা, তাই এক
পয়সার কাগজ হিসেবেই পরিচিত ছিল এই কাগজ ।
এদিকে নতুন কাপড় পরার রেওয়াজে দর্জিরা করে কর্মে খাচ্ছিল ।
রমজান ওস্তাগর তো প্রবাদ প্রতিম ধনী হয়ে গেল – দর্জির কাজ করে ।
ইংরেজরা নিয়ে এলো রেডিমেড জামা কাপড় । ফলে দর্জিরা আর হালে
পানি পায় না ।
ছড়া চালু হলো :-
খাচ্ছিল দর্জি সেলাই করে
ভাত মারল ইংরেজের এঁড়ে
১৮৫৩ সালে কোলকাতায় বাবু রাজেন দত্ত অ্যামেরিকা থেকে প্রথম সেলাই
কল নিয়ে এলে দর্জিদের কপাল একটু একটু করে আবার খুলতে শুরু করে ।
খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কোনো শাস্ত্রক্তো বিধান আছে বলে জানা
নেই ।
এ ব্যাপারে পারিবারিক বিধান বা আচারকেই আজও প্রাধান্য দেওয়া
হয় ।
আচার তাকেই বলে যা, দেশে বা
বংশে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত।
বাবুদের বাড়ীর খাবারের বর্ণণাও আছে বটতলার কবিদের লেখায় ।
তখন কিছুই বাদ যেত না খাবারে, এমনকি নিষিদ্ধ গোমাংসও । হাঁ হাঁ
বা হায় হায় রব না উঠলেও ক্ষুরধার ব্যঙ্গ করা হয়েছে ।
সেই রকম একটা পদ্য দিয়ে শেষ করছি :-
“অমৃত সমান
বীপস্টিক রলিপুলি ।
পোর্ক চপ সসেজেস, তাকে কভু ভুলি ।।
ফৌল কাটলেট আর লেগ মাটন রোষ্ট ।
দো পেঁয়াজা কাপজেলি খেলে হয় বোষ্ট ।।
ভিন কাটলেট হ্যাম টার্কি এন হ্যাম্ ।
পান কিনা পান কভু গবরনরের ম্যাম্ ।।
এমন, সুস্বাদ খাদ্য ত্রিভুবনে নাই ।
দেবের দুর্লভ ইহা কি কহিব ভাই ।।
অকসং টর্টেল সুপ সকলিং পিগ রোষ্টো ।
যা দেখিলে সেই ক্ষণে চুলকায় মুখ ওষ্ঠ।।
এই সব খানা পেটে পড়িয়াছে যার ।
ভাগ্যের কি সীমা আমি দিবো এ তাহার ।।
যে খেয়েছে সে মজেছে কি বা তার তার ।
স্বর্গ থেকে নেচে ওঠে চৌদ্দপুরুষ তার ।।