Powered By Blogger

Friday, September 22, 2017

টেবল ম্যানার্স

খাওয়া দাওয়া নিয়ে আমার দুর্বলতা সর্বজনীন । এই বয়সে এসেও, সেই দুর্বলতাটা ভয়ঙ্কর ভাবে বিদ্যমান । খেতে বসলে আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না আমার ।

আমার ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে জল খাওয়া বা কচকচ করে মাংস চিবোনোর শব্দ শুনে আমার দিকে অনেকেই ( এর মধ্যে আমার “উনিও” আছেন ) ভুরু কুঁচকে তাকান ।

একবার তো পার্ক স্ট্রীটের “স্কাইরুমে” ( এখন ঘচাং ফু হয়ে গেছে ) গিয়ে বলেই দিয়েছিলাম- ও ঠাহুর !!! ঝুলে ( স্যুপ) কদু ( লাউ) দিসো ক্যা?

আশ্চর্য জনক ভাবে উত্তর এসেছিল :- মিঁঞা, ধইর‌্যা ফেলসেন দেহি ।

তারপর থেকেই আমার “কনফি” তুঙ্গে । এই সব নাক উঁচুপনাকে – আমি তাচ্ছিল্যর চোখেই দেখি এখন ।

ফেসবুকের বন্ধুদের বাইরেও কয়েকটা বিয়ে, এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে– খাওয়াটা জব্বর হয়েছিল ।

আজ একটু খাওয়া দাওয়া নিয়ে অন্য কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলি ।

প্রথমেই বলবো – আজ থেকে প্রায় বছর পঞ্চাশ আগেকার কথা ।

যাদের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ– তাঁরা আবার বারিন্দির এবং স্বয়ং গৃহকর্তা আবার ডাক্তারও বটে ।

মাটীতে কলাপাতায় পরিবেশন আর মাটীর ভাঁড়ে জল ।

পদগুলোও বেশ উঁচুমানের । শেষ হয়ে এসেছে খাওয়া, তখন গৃহকর্তার মনে পড়ল শাকটা দেওয়া হয় নি, প্রথম পাতে ।

উনি যথারীতি উচ্চগ্রামে হাঁক ( বারিন্দিররা আবার পেছনে ভর দিয়ে কথা বলেন- বরিন্দের প্রাচীন প্রবাদ) দিলেন :- ওরে শাকটা নিয়ে আয় !!!!

নামকরা খাইয়েরা আপত্তি তুলে বললেন :- ওটা আর দিতে হবে না । এখন তো গলা পর্যন্ত মিষ্টান্নে ভর্তি ।

প্রথামত শাক পেটের নীচে থাকার কথা ।

ডাক্তার আবার হাঁক দিলেন বরিন্দ টোনে :-

ওরে, শাক গুলো একটা বালতীতে গুলে নিয়ে আয়, সঙ্গে গরুকে ইনজেকশান দেওয়ার মোটা কাঁচের সিরিঞ্জ । শাকটা সকলের পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দি । অতিথি সৎকারে ত্রুটি যেন না হয় ।

আপত্য কারীরা সহ সব নিমন্ত্রিতরা দুড়দার করে উঠে দৌড়ে পালিয়েছিলেন সেবার ।

বিল্ববৃক্ষ

শুধু পূজার সঙ্গে সম্বন্ধ আছে বলে নয়- গাছের থেকে একটা ডাল কাটতেও কুণ্ঠা ছিল, প্রাচীন কালের লোকেদের । এটা জানানর জন্যই লিখলাম ।

+++++++

ওঁ বিল্ববৃক্ষ মহাভাগ সদা ত্বং শংকরপ্রিয়।

গৃহিত্বা তব শাখাঞ্চ দুর্গাপূজাং করোম্যঽম্।।

ওঁ শাখাচ্ছেদোদ্ভবং দুঃখং ন চ কার্যং ত্বয়া প্রভো।

দেবৈর্গৃহীত্বা তে শাখাং পূজ্যা দুর্গেতি বিশ্রুতিঃ।।

অসার্থ্য:-

হে বিল্ববৃক্ষ, হে মহাভাগ (দয়াদি সদ্‌গুণসম্পন্ন) ! তুমি সর্বদা শংকরের প্রিয় ।

আমি তোমার শাখা লইয়া দুর্গাপূজা করিব । হে প্রভো ! তুমি শাখাচ্ছেদজনিত দুঃখ করিও না ।

দেবগণ তোমার শাখা লইয়া দুর্গাপূজা করেন, এইরূপ প্রসিদ্ধি আছে ।

=======

ঋণ :- ডঃ নিরঞ্জন মিশ্র ,এম.এ, কাব্যমীমাংসা তীর্থ, প্রণীত- কালিকা পুরাণোক্ত দুর্গোৎসব পদ্ধতি ।

Wednesday, September 20, 2017

পুজোর খাওয়া

স্পাঘেটি, চাউ, রোল- এসব শুনলে কি মনে হয়? মাথার মধ্যে , ঘেটি ধরে, চই চই করে রোলিং করে স্পা হচ্ছে। যা- তা ব্যাপার!

পূুজোর কেনাকাটি করতে গিয়ে, বাঙালী যেটা লিষ্টে প্রথম রাখে- সেটা হলো, বাজার করতে গিয়ে কি খাওয়া হবে!

তারপর , প্ল্যানিং চলে পূজোর চারদিন আরও সব কি খাওয়া হবে। খেতে খেতেই এই বাঙালী জাতটা
গেল!!!!!

এমন পেট সর্বস্ব জাত, দুনিয়াতে, গ্রীক ছাড়া আর কেউ নেই।

প্রবাদ আছে, গ্রীসে গেলে নাকি বেল্টের ফুটো বাড়াবার দরকার নেই।

পূজোর সময়, বাঙালীর সব বিচিত্র খাওয়া- দাওয়ার কম্বিনেশন। ইডলি- দোসা, বিরিয়ানী, কাবাব, লুচি-মাংস, মিক্সড চাউমিঁএ- আরও সব কত নাম জানা- অজানা খাবার! বাপরে বাপ!

ফেসবুকে আবার আজকাল দেখছি, বাজার দর দিচ্ছেন, বিভিন্ন জন!

কোলকাতার সল্ট লেকের একটি পাড়ায় যে পুজো হয় , ওদের চাঁদার বরাদ্দ ২০০০ টাকা, তবে সপ্তমী থেকে দশমী -এই ৪ দিনে দু বেলার খাবার ব্যবস্থা পুজো প্যান্ডেলে !

পূব বাংলায়, পুজোর রান্না করতে করতে, রান্নার ঠাকুর নাকি, এই গানটি গাইতো:—

“কি বঙ্গ দ্যাখাইলি হরি কলিতে

মানে না ধর্মাধর্ম করে না কোনও কর্ম

সুগম্য অগম্য পথে চলিতে”—

এই ঠাকুর মনে হয়, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিল। এখন তো তাই হচ্ছে!

বাড়ির তৈরি গাওয়া ঘি, কাঠের উনুনের রান্নার স্বাদ, মাটির হাঁড়ির ঝরঝরে ভাত, হাঁড়ির ভাতের মাঝে

সরষে-লঙ্কা বাটা কাঁচাতেল দিয়ে ভাপে দেওয়া ইলিশের গন্ধ, কখনও পুজোর সকালের লুচি, যেগুলো এপার বাংলার ছোট মাপের লুচি না, আকারে বেশ বড়। প্রায় মাপসই এখনকার একটা ষ্টীলের রেকাবীর মত।
উল্লুস!

অষ্টমীতে পাঁঠা বলি হত। সেই মাংসে পেঁয়াজ রসুন দেওয়া হত না।তাই বলা হত নিরামিষ মাংস। ধনে বাটা, জিরে বাটা, লঙ্কাবাটা দিয়ে তৈরী সেই নিরামিষ মাংস চেটেপুটে খেত বাঙালী।

“ঘরের মেঝেতে নকশি কাঁথাটি মেলে ধরে পল্লীবধূ তাঁর কলমি ফুলের মতো সুন্দর আঙুলগুলি দিয়ে সরু সূত্র জালে যে পদ্মফুলটাকে জীবন্ত করে তুলেছেন, কৃষাণ বধূ ঘরের আঙ্গনে.............. ঘরের চৌকাঠে জানালায় সুতার মিস্তরিরা কঠিন কাঠ কেটে যে নক্সা এঁকে দিয়ে গেছে — বাড়ির গৃহিণী পাথরের উপরে সূক্ষ্ম বাটালি ও নরুনের আঘাতে তাকে রূপ দিয়ে তারই ছাঁচে নানা রকমের পিঠা তৈরি করে আপন আত্মীয় পরিজনদের আনন্দ পরিবেশন করেছেন”— জসীমউদ্দিন।

বং- আং, চিং, ফেং, ইং !




না, না- কোনো সোমসকিত নয়, পূজোরও মন্তর নয় ! ওই যে !! আজকাল সব সংক্ষেপে সারে না ? সেটাই !

বং মানেটা বলতে হবে না আশা করি ! এই বং রা আজকাল আন্তর্জাতিক হয়েছে । মানে, বংদের জিভে এখন মাল্টি কুইজিনের সহাবস্থান ।

ইডলি- ধোসা- সাম্বার বঢ়া থেকে শুরু করে- হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ, চিলি চিকেন, চিকেন আলা কিয়েভ, এরকম আরও কত ।

মিষ্টিতে –লাড্ডু, কাজু বরফি, কেক, পেষ্ট্রী ।
তাই বং আজ আং- মানে আর্ন্তজাতিক । তবে, গুর্মেরা ( খাদ্য- রসিক) বলেন এই পিথিবিতে নাকি কুল্লে তিনরকম রান্না ।

চিং – চাইনিজ
ফেং- ফ্রেঞ্চ
ইং- ইণ্ডিয়ান

আমার গুরুদেব ( আমি একলব্য শিষ্য), মুজতবা সাহেব বলতেন :- ইংরেজরা খাওয়ার ব্যাপারে হটেনটট ! পুরো রান্না ঘরটাই খাবার টেবিলে তুলে নিয়ে আসে । সব আধা সেদ্ধ ।

আরো বলেছেন :- এক ইংরেজ গেছে ফ্রান্সের এক রেষ্টুরেন্টে ! ভাষা না জানার জন্য,মেনুর মধ্যিখানে হাত দেখালো- এলো সুপ ।
আরও, ১০ টা পদ নীচে হাত দেখিয়ে ওয়েটারকে ইশারায় বলল: এইটা !
এলো আর এক রকম স্যুপ।

গুরুদেব বলছেন :- বেচারা হটেনটট ইংরেজ জানবে কি করে, ফ্রেঞ্চ মেনুর প্রথমেই ৬০ রকম স্যুপ থাকে ।

তা, বেচারা ইংরেজ শেষের থেকে ৩ ধাপ ওপরে হাত দেখাল । এলো খড়কে !

বং- জাত খাইয়ে বলে এরকম আহাম্মুকি করবে না !
তবে, হ্যাঁ ! গ্রীকরা নাকি, বং দের সঙ্গে এই ব্যাপারে টক্কর দিতে পারে । প্রবাদ আছে, গ্রীসে গেলে নাকি বেল্টের সাইজ বাড়িয়ে নিয়ে যেতে হয় ।
আর ইয়াংকিদের তো সব ব্যাপারেই “ World’s Greatest” । এক বন্ধুবর এই রকম আ্যডের খপ্পরে পড়ে , কফি খেয়েছিল । “ World’s Greatest” কফি! এক চুমুক দিয়েই- ওয়াক্ থুঃ। হাওড়া- শেয়ালদার ষ্টেশনের থেকেও বাজে কফি !!!!!!! ( এটা আমার পরোক্ষ অভিজ্ঞতা, যাঁরা থাকেন ওখানে, তাঁরাই বরং ভালো বলতে পারবেন !!!! )

আমার এক তালেবর বন্ধু আছেন । খাওয়ার ব্যাপারে তিনি খলিফা লোক ! চাইনীজ যে রান্না এই কোলকাতায় পাওয়া যায়, সেটার সাথে নাকি পাঞ্জাবী রেসিপি যুক্ত হয়েছে বলে তার বিশেষজ্ঞের মতামত ।

আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু – রূপঙ্কর সরকার, একবার আমার এই সব লেখায় মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছিলেন :-

এখন নাকি বিদেশে পাতি চিং এর বদলে ইংচিং-এর কদর বেশি। ইংচিং হল, চাইনিজ কুক্‌ড ইন ইন্ডিয়ান ফ্যাশন। আসল চিনে রান্না চিনেরা ছাড়া কেউ খেতে পারবেনা, আমরা ছোটবেলায় মাঝে মধ্যে খেয়েছি, ভাল লেগেছে, এমন সার্টিফিকেট মোটেই দেবনা।

তার পর নানা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গিয়ে কোলকাতার চিনেরা এক নতুন ফিউশন আবিষ্কার করল বাঙালিদের জন্য। সেটারই এখন সারা বিশ্বে জয়জয়কার। তবে যদিও ওরা বলে 'ইন্ডিয়ান ফ্যাশন', ভারতের আর কোনও শহরে কোলকাতার মত চিনে রান্না পাবেননা। বোম্বেরটাও ভাল তবে আমাদের মত নয় (কর্পোরেশনের জলের গুণ)। আর ফ্রেঞ্চরা সাহেবদের খেতে শিখিয়েছে, এটা তো সত্যি।

ইংরিজি ভাষা যে অ্যাংলো স্যক্সন ও অ্যাংলো নর্মান ভাষা থেকে এসেছে, সেখানে 'অক্স' শব্দটা স্যক্সন, আর 'বীফ'টা নর্মান। আবার 'ডিয়ার'টা স্যক্সন কিন্তু 'ভেনিসন' টা নর্মান। ইউরোপে রান্না বান্না ফ্রেঞ্চরা অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে। এবার আবার ইংচিং-এ ফিরি। ছেলেবেলায় এক ধরণের জাপানী নুড্‌লস খেতাম, এখন আর পাওয়া যায়না। সেগুলোর টেস্ট আমার চিনেদের থেকে অনেক ভাল লাগত।
আসল চাইনীজ খেতে গেলে যেতে হবে, চায়না টাউনে । সেখানেও ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে আপনাকে। তাহলে গিয়ে, আপনি পাবেন লক্ষী বাবুর আসলি সোনা – চাঁদি!
ক্ষী ক্ষাণ্ড !
আবার চাইনীজ খাওয়ারও শাস্ত্রীয় বিধান আছে ! পোত্থমে- এমনি এমনি তিন/ চার চামচ খেতে হবে সব আইটেম । তারপর গিয়ে, ওই সব সস- টস দিয়ে খাওয়া ইষ্টার্ট !
এবারে, থাই খাবারের কথাও বলতে হবে । এরা সুগন্ধিযুক্ত, মশলাদার খাবার বানান । গানে যেমন, হারমনি থাকে, সেইরকম ভাবেই প্রত্যেকটা রান্নায় উঁচু, নীচু স্কেলে তেতো, ঝাল, টক, লবণ সব দিয়ে এক অপূর্ব সিম্ফনি । যেন সিল্কের শাড়ীর পাড়ে ফ্লোরাল মোটিফ ।
এবারে দ্যাখা যাক ফেং বা ফ্রেঞ্চ খাবার । এটা বলা হয়:- "The Italians civilized all of Europe and it is they, without a doubt, who taught us how to eat. . . . For more than two centuries the French have enjoyed good cooking, but rest assured, dishes have never been as delicate, as expertly prepared, or better tasting, than they are today."
ইটালিয়ানরা নাকি সমস্ত ইউরোপকে সভ্য বানিয়েছে । তাই ফ্রেঞ্চ রান্না এত সোয়াদের ! মোদ্দা কথা হল এটি ।
সে যাক! পনির আর ওয়াইন হল এই সমস্ত ফ্রেঞ্চ খাবারের সুর ।ফরাসি আঞ্চলিক রন্ধনপ্রণালী চরম বৈচিত্র্যপূর্ণ । এ যেন আমাদের বংদের তাঁতের শাড়ীর হরেক কিসিম।
তবে, এখন কোলকেতায় জাঙ্ক ফুডের রমরমা ! যেমন চলছে, জাঙ্ক জুয়েলারী । এদের কদর কতদিন থাকবে বলা মুশকিল ।

বেঁচে থাক, আমাদের মোচার ঘন্ট থেকে শুরু করে, চিতল মাছের মুইঠ্যা ! যারা খায় নি, তাদের নরকে বা দোজখেও জায়গা হবে না বলে দিলাম ।

জয় – বং থুক্কু বাংলা !

দুর্গাপূজা

আড়ম্বরে দুর্গাপূজার প্রচলন ষোড়শ শতাব্দীর মোঘোল আমলেই শুরু হয়- যদিও দুর্গাপূজা এর অনেক আগে থেকেই চালু ছিল ।

ইংরেজরা আসার পর , দেওয়ান, মুৎসুদ্দি, গোমোস্তা, জমিদার, তালুকদারদের হাতে প্রচুর টাকা এলো ।

তাই দুর্গাপূজাতে আড়ম্বর করতেই হবে । জাঁকজমক না দেখালে আর কিসের বড়লোক ?

পরাধীন দেশে এই টাকাগুলো যে বিভিন্ন শিল্পতে ব্যবহার করা যেতে পারে, সেটা এই জেন্টুদের ( নামকরণ বিনয় ঘোষ) মাথায় ছিল না । থাকলেও – সেগুলো করার সাহস বা ইচ্ছা, দুটোই ছিল অনুপস্থিত ।


এই ফাঁকে রাজশাহীর, তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ রায় ( ভাদুড়ী) ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে চালু করলেন দুর্গোৎসব ।

এখন আমরা যে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী সহ যে দুর্গামূর্তি দেখি, সেটা পণ্ডিত রমেশ আচার্যর (শাস্ত্রী) পরামর্শে করা , সেই দুর্গোৎসবে ।


এখানেই প্রথম চালু হয়, নতুন জামা কাপড় পরা, নতুন জিনিস কেনা - মতপার্থক্য থাকলেও এটা মনে হয় মান্যতা পেয়েছে ।

চারদিন ধরে দরিদ্র লোকজনদের পেট ভরে খাওয়ানো হয়েছিল, যদিও স্থায়ী কিছু করার উদ্দ্যোগ রাজা কংসনারায়ণ নেন নি ।

পরোক্ষে তাঁতি, দর্জি, কুমোর থেকে চাষী এর ফল পেয়েছিল, কারণ লোকেরা রাজার ফরমান পেয়ে সব কিছুই নতুন ভাবে তৈরি করায় ।

এটাও শোনা যায় যে এই সমস্তের খরচ নাকি স্বয়ং রাজাই দিয়েছিলেন ,কিন্তু কোনো তথ্য এই সম্পর্কে পাওয়া যায় নি ।

সেই সময়, এই দুর্গাপুজোর জন্য নয় লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল । বেশীর ভাগটাই বাইজী, নাচা গানাতে খরচ হলেও লোকেদের জন্য খরচ করা হয়েছিল এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না ।

এই পুজোর পাল্লা দিতে, রাজশাহীর রাজা জগৎনারায়ণ সেই বছরেই দশ লক্ষ টাকা খরচ করে পুজো করেছিলেন ।

দুজনেই দরিদ্রনারায়ণ সেবার নামে ঐ চারদিন লোক খাইয়েছিলেন এলাহী ভাবে।
শহর কোলকাতায় ১৭৯২ সালে রাজা সুখময় রায় সকলকে টেক্কা দিতে চেষ্টা করেছিলেন ।
সুস্থ ধারার জন্য যদি এই সব টাকা খরচ করা হতো, তবে বোধহয় বঙ্গবাসীদের এতটা দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হতো না ।

সেই ধারা এখনও চলছে লাগামহীন ভাবে ।

তখনকার ব্রাহ্ম সমাজ থেকে এর নিন্দা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে ভাবে জনসাধারণের মনে দাগ কাটতে পারে নি ।

ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র তত্ত্ববোধিনীপত্রিকায় লেখা হয়েছিল :-

ষন্মনসা ন মনুতে যে নাহুর্ননোমতং ।
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ।।

অর্থ :- মনের দ্বারা যাঁহাকে মনন ( চিন্তা) করা যায় না, যিনি প্রত্যেক মননকে জানেন, তাঁহাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানো । লোকে যে পরিমিত পদার্থের উপাসনা করে তাহা কখনো ব্রহ্ম নহে ।

এতসব সত্বেও কিন্তু জাঁকজমক রেষারেষি কিচ্ছু কমে নি ।

আমার যেটা মনে হয় আমাদের মন কখনও শূন্য বা ভ্যাকুয়াম হতে পারে না । ধর্মটাই জেঁকে বসে বেশী এবং আজও বহমান ।

নবকৃষ্ণ দেবও হেষ্টিংসকে খুশী করতে ১৭৫৭ সালের পর দুর্গাপূজা করেন ।
আরেক বড়লোক চূড়ামণি দত্ত টেক্কা দিতেই থাকেন ।

 কিছু সময় এগিয়ে এলে দেখি- সেকালে পুজোর সময় পূজাসাহিত্য ছিল শারদীয় সংখ্যা ছিল না ।

প্রথম যে শারদীয় সংখ্যার উল্লেখ দেখি সেটা হলো, সুলভ সমাচার । ১৮৭৯র ৪ ঠা অক্টোবর এর প্রথম প্রকাশ শারদীয়া হিসেবে যদিও ১৮৭০ সাল থেকেই এই পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছিলো ।

দাম ছিল এক পয়সা, তাই এক পয়সার কাগজ হিসেবেই পরিচিত ছিল এই কাগজ ।

এদিকে নতুন কাপড় পরার রেওয়াজে দর্জিরা করে কর্মে খাচ্ছিল ।

রমজান ওস্তাগর তো প্রবাদ প্রতিম ধনী হয়ে গেল দর্জির কাজ করে ।

ইংরেজরা নিয়ে এলো রেডিমেড জামা কাপড় । ফলে দর্জিরা আর হালে পানি পায় না ।
ছড়া চালু হলো :-

খাচ্ছিল দর্জি সেলাই করে

ভাত মারল ইংরেজের এঁড়ে

১৮৫৩ সালে কোলকাতায় বাবু রাজেন দত্ত অ্যামেরিকা থেকে প্রথম সেলাই কল নিয়ে এলে দর্জিদের কপাল একটু একটু করে আবার খুলতে শুরু করে ।

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কোনো শাস্ত্রক্তো বিধান আছে বলে জানা নেই ।
এ ব্যাপারে পারিবারিক বিধান বা আচারকেই আজও প্রাধান্য দেওয়া হয় ।
আচার তাকেই বলে যা, দেশে বা বংশে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত।
বাবুদের বাড়ীর খাবারের বর্ণণাও আছে বটতলার কবিদের লেখায় । তখন কিছুই বাদ যেত না খাবারে, এমনকি নিষিদ্ধ গোমাংসও । হাঁ হাঁ বা হায় হায় রব না উঠলেও ক্ষুরধার ব্যঙ্গ করা হয়েছে ।

সেই রকম একটা পদ্য দিয়ে শেষ করছি :-

অমৃত সমান বীপস্টিক রলিপুলি ।
পোর্ক চপ সসেজেস, তাকে কভু ভুলি ।।
ফৌল কাটলেট আর লেগ মাটন রোষ্ট ।
দো পেঁয়াজা কাপজেলি খেলে হয় বোষ্ট ।।
ভিন কাটলেট হ্যাম টার্কি এন হ্যাম্ ।
পান কিনা পান কভু গবরনরের ম্যাম্ ।।
এমন, সুস্বাদ খাদ্য ত্রিভুবনে নাই ।
দেবের দুর্লভ ইহা কি কহিব ভাই ।।
অকসং টর্টেল সুপ সকলিং পিগ রোষ্টো ।
যা দেখিলে সেই ক্ষণে চুলকায় মুখ ওষ্ঠ।।
এই সব খানা পেটে পড়িয়াছে যার ।
ভাগ্যের কি সীমা আমি দিবো এ তাহার ।।
যে খেয়েছে সে মজেছে কি বা তার তার ।

স্বর্গ থেকে নেচে ওঠে চৌদ্দপুরুষ তার ।।

Thursday, September 14, 2017

দরদাম




জানি না কতখানি সত্যি, তবে প্রবাদ আছে-বাঙালির নিত্য অসুখ – গ্যাস, অম্বল আর বদহজম ।

তার ওপর বাজারে বা অন্য কোনো জায়গায় জিনিস কিনতে গিয়ে দরদাম না করলে অসুখ গুলো  নাকি আরও বেড়ে যায় ।

সঙ্গে যোগ হয়- মাথা ঘোরা, পা ঝিনঝিন আর হা হুতাশ ।

যদি বা কেনা হল – তবুও আফশোস থেকে যায়, কেন আরও একটু দাম কমালাম না !

তা যাক্ !  দুটো বহুশ্রুত চুটকি শোনাই আপনাদের- বাঙালির দরদামের ব্যাপারে । অবশ্যই অনেক কাল আগের কথা ।
 এক ভদ্রলোক, তাঁর পরিবারের বারো জনকে নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন- কলকাতা থেকে ব্যাণ্ডেল ।

টিকেট কাউন্টারে যখন টিকেট বাবু বললেন
:-দিন চব্বিশ টাকা! ভদ্রলোক বললেন – কি অনাসৃষ্টি কাণ্ড, একডজন টিকিট নিলাম একটু কমসম হবে না?
ঘটাং ঘটাং করে টিকিট গুলোতে তারিখ পাঞ্চ করতে করতে বললেন – আপনার বিয়ে কি রেলের কোন কত্তার সাথে হয়েছে ?
কথা না বলে ভদ্রলোক চব্বিশ টাকা দিয়ে টিকেট গুলো নিলেন ।
ভদ্রলোক ফিরছেন ব্যাণ্ডেল থেকে নিমন্ত্রণ রক্ষা করে ।
এবারে টিকেটের দাম বললেন কাউন্টারের বাবু – ত্রিশ টাকা !
ভদ্রলোক অবাক ! আসার সময় তো চব্বিশ টাকা দিলাম, আর ফেরার সময় ত্রিশ !

জবাব এল – আরে মশাই, সেটা ছিল দিনের বেলা ! এখন রাত । লাইট জ্বলবে, তার জন্য উপরি টাকা দেবেন না ?
দরাদরি করে, সেটা কমান গেল-আঠাশ টাকায় ।

ভদ্রলোক গিন্নিকে বললেন – দেখলে তো হাওড়ার লোকটা আমায় ঠকিয়েছিল !
বাজারেও এই বিপত্তি ।
 বাজারে নারকোল আছে । কিনতে হবে মরসুমের বাজারে ।
দাম জিজ্ঞেস করাতে, দোকানদার বলল:- জোড়া চল্লিশ টাকা !

একটু কম হবে না ?
-       হবে বাবু, তবে আমার এখানে নয় ।
-       কোথায় ?
-       একটু এগিয়ে যান, জোড়া ৩৫ টাকা । আর একটু এগুলে জোড়া ৩০ টাকা । করে করে, এগিয়ে গেলে দেখবেন, বিনে পয়সায় প্রচুর নারকোল পাবেন !

 দই মিষ্টিও  কেনা দরকার ।
ভাই মিষ্টি দই কত করে ? ক্রেতার ব্যাকুল জিজ্ঞাসা ।
-      দুশো কুড়ি টাকা কিলো ।
-      এ:, কিলিয়ে দিলেন ভাই ! দুশো বিশ করে হবে না ? একটু সস্তা হতো তালে !
-      নামী দোকানে একদাম ! নেবার হলে নিন, না হলে আসুন !

এখন তো অনলাইনে কেনার ধূম । তা সেখানেও নাকি -বং জাতি দরদাম করে ।

আমার জানা নেই – আপনাদের জানা আছে কি?