Powered By Blogger

Wednesday, May 24, 2017

কোলকাতা বিষয়ক



==========

আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গের বাইরের রাজ্য বা এই রাজ্যের জেলা শহর থেকে প্রথম কোলকাতায় আসি – তারা হকচকিয়ে যাই বৈকি ।

যদিও আমি নিজে স্কুল জীবন কোলকাতায় কাটিয়েছি – তবু তখনকার কোলকাতায় এত যানজট বা কোলাহল ছিল না ।
জীবন যাপন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের পক্ষে অনেক সহজ ছিল ।

আর বাঘাযতীন, গড়িয়া এমনকি যাদবপুরও তার গা থেকে ঢিলেঢালা গ্রামীন চাদরটা ছেড়ে ফেলতে পারে নি তখনও ।

উত্তর কোলকাতায় আসা যেত দোতলা টুবি বাসে , গড়িয়াহাট থেকে । এই জায়গা থেকেই শহরের আলতো ছোঁয়া পেতে শুরু করতাম আমরা ।

তখন, ঢাকুরিয়াতে রেলের লেভেল ক্রসিং ছিল । সবে তৈরি হতে শুরু করেছে ফ্লাইওভার যার এখনকার পোষাকী নাম – চৈতন্যদেব সেতু ।
যখনকার কথা বলছি – (১৯৬১ -১৯৬৪), তখনও শ্যামবাজারে নেতাজীর মূর্তিও স্থাপিত হয় নি ।

আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ আসতে হলে তখন টুবি ভরসা । ওই রুট ছিল – বালীগঞ্জ ষ্টেশন থেকে পাইকপাড়া পর্যন্ত ।
আর জি করের পরে আর যেতে সাহস হয় নি, কিশোর বয়সে । জানতাম, ওদিকে দমদম, তবু আসা হয় নি কোনো অজানা কারণে ।
পকেটমারি ছিল বাসে ট্রামে তবে এতটা নয় । খুন জখম যে ছিল না, তাও নয় তবে সেটা বেশীরভাগই ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্যকিছু থেকে হতো ।

রাজনৈতিক খুনের ঘটনা বেড়ে গেল ১৯৭০ সাল থেকে । তখন যে ভাবে খুন জখমের বর্ণণা দেওয়া হতো কাগজে – তাতে হৃৎকম্প, বাড়তো বই কমতো না ।

আমি পড়তাম – একদিনের বাসী কাগজে । তাও সকালে নয়, দুপুরের দিকে । ট্রেণ লেট থাকলে সন্ধেতে । বেশী লেট হলে, আর কাগজ দিতো না হকাররা ।
একবার ১৯৬৮ বা ১৯৬৯ হবে বোধহয় – দেখি, শ্যামবাজারের আমূল পরিবর্তন । নেতাজীর ষ্টাচু বসানোর কাজ চলছে বা বসে গেছে ।
ধীরে ধীরে বাঘাযতীন আর যাদবপুর , হালতু ইউনিয়ন, ছগণ্ডা পরগণার থেকে কোলকাতা হয়ে যাচ্ছে ।

বদলে যাচ্ছে জীবন যাপনের ধারা । পাড়ার আঁটসাঁট ভাবটা বদলে কেমন যেন একটা অচেনা অজানা চেহারায় বদলে যাচ্ছে সব কিছু ।
বাঘাযতীন থেকে বিজয়গড় যেখানে হেঁটে যেতে হতো, সেখানে চলে এসেছে রিক্সা।

উত্তর কিন্তু নট নড়ন চরণ । সেই পাড়া – বৈঠকী মেজাজ , রকের আড্ডা , হা হা করে হাসা, সব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা জমজমাটি ভাব তখনও ।
আড্ডাতেই তৈরি হয়েছিল স্লোগান:-

বোরদে, তু খেলনা ছোড়দে! 

শ্যামবাজারে অনেক কটা দোকান ছিল যেখানে সুগন্ধওয়ালা চা , সেদ্ধ হাঁসের ডিম আর ঝাল মিষ্টি টোষ্ট পাওয়া যেত আসল পলসন বাটার দিয়ে ।

একটা কফি হাউসও ছিল । উত্তরের দিগগজরা আড্ডাও মারতেন সেখানে । 
কলেজ ষ্ট্রিটকে বলা যায় মধ্য কোলকাতা । রেলিংয়ে ঝোলানো বা ফুটপাতে রাখা থাকতো – অজস্র পুরোনো বই ।

চারমিনার সিগারেটে টান দিতে দিতে বই পিপাসু লোকজন তাদের হারানিধি খুঁজতো ।

দরাদরিও চলতো । সবচেয়ে বেশী পুরোনো বইয়ের ষ্টক ছিল – করিম চাচার কাছে ( নামটা এখন ঠিক মনে পড়ছে না ) ।
মোড় থেকে হেদুয়ার দিকে যেতে বোধহয় বাঁ দিকে দোকানটা পড়তো ।

তখনকার ফিল্ম মেকাররা ওই বইয়ের দোকানে হানা দিয়ে বই টই কিনে এসে বসতেন কফি হাউসে ।

গণসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান তো হতই, কাফকা কামু থেকে শরৎ, বিভূতি ( যেন সব ইয়ার দোস্ত) সবাইকে নিয়েই আলোচনার রমরমা ।

প্রথমে ঢুকলেই মনে হতো – ভুভুজেলা বাজছে চারিদিকে , যদিও তখন ভুভুজেলা কি জিনিস জানে না কোলকাতা শহর ।

১৯৯৬ সালে যখন পাকাপাকি ভাবে দমদমে এলাম – চেষ্টা করেছিলাম, সেই পুরোনো যাদবপুর বাঘাযতীন, শ্যামবাজারকে খুঁজতে ।
একটু করে মন খারাপ হয়, তবু মেনে নেই আস্তে আস্তে ।

ধীরে ধীরে যে সেই পুরোনো কোলকাতা গুগুল পিকচারসে বা ইউ টিউবে চলে যাবে সেটা বুঝি নি ।

“ভেসে আসে কোলকাতা, কুয়াশা তুলিতে আঁকা

শহরতলীর ভোর মনে পড়ে ।” ( মহীনের ঘোড়াগুলি)

Monday, May 22, 2017

বাজার ও গঙ্গাজলী যাত্রা



+++++++++++++++++

আচ্ছা, অভ্যাস কাকে বলে ? বারবার একই জিনিস এক সময়ে করার নাম বোধহয় অভ্যাস ।

ধরুন – সকালে উঠেই দাঁত মাজা, প্রাতঃকৃত্য করা , এগুলো অভ্যাসের মধ্যেই পড়ে।
বাজার করা একটা অন্যতম অভ্যাস ।

কিশোর বয়সে বাজার করাটা যেচে নিতাম, টু পাইস ইনকাম করার জন্য । বাঙালি যেমন কবিতা লেখে কৈশোরে, বাজার থেকে টু পাইস উপার্জন করাটাও একটা কৈশোর সিমটম ।

এক কেজি আলু কিনে তাকে দেড় কেজি বলে চালানোর সময় কত বার যে ধরা পড়েছি, ম্যাথেমাটিক্যালি তার ভ্যালু – এনেথ টাইমস ।
এখানে এন সংখ্যাটির মান যা খুশী হতে পারে ।

তাও বাজারে আমাকে পাঠানো হত, কারণ মামাদের সময় ছিল না বাজার করার ।

নিজে উপার্জন ক্ষম হয়ে বাজার করি বটে, তবে ছোট বেলার অভ্যাস বলে কথা !
অঙ্গারঃ শতধৌতেন মলিনত্বং ন মুঞ্চতি । হাজার বার ধুলেও কয়লা কালোই থাকে।

তবে, এখানে একটা বিশেষত্ব আছে । পয়সাটা বাঁচে । মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেই- ইংরেজী আপ্তবাক্যটি বলে:-

এ রুপি সেভড্ ইজ এ রুপি আর্নড ।
হরে দরে সেই ইনকামই হল আর কি !
এটা একটা ভিসিয়াস সাইকেল ।

যে কথা বলছিলাম । স্পোনডিলোসিসে আক্রান্ত হবার পর – আজকাল খুব একটা বাজার যাই না ।

ঠেলাওয়ালার কাছ থেকে সব্জী আর বুড়োকে ফোন করে মাছ আনাই । অবরে শবরে রাজা মুরগীর মাংসটাও দিয়ে যায় ।
কিন্তু, উবু হয়ে বসে আলু, পটল, পেঁয়াজ, শাক – বাছার মধ্যে যে আনন্দ, সেটার মত অন্য কিছু হয় না ।

কাতলা মাছের কানকো খুলে শুঁকে দেখতে হয় । কাদার গন্ধ থাকলে, তার টেষ্ট ভালো হবে না ।

এখন উবু হয়ে বসা বারণ ।

আজকে তাও গেলাম বাজারে । যেতেই, চনি তার হাতে ধরা ছোট বালতি থেকে একটা প্ল্যাসটিকের কাপ আর কেটলি থেকে চা ঢেলে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল – খান।

তবে, আজ বাজার সরগরম । গলদা চিংড়ি আটশো থেকে হাজার টাকা কিলো, আড় বড়ো-৫০০ টাকা । দেখে টেকে আর ইলিশের দিকে তাকাই নি ।

পেত্যয় যাবেন না – কোনো মাছই পড়ে থাকছে না । খাসীর মাংসের দোকানে লম্বা লাইন । দাম জিজ্ঞেস করবো কি !

মুরগীর মাংসর অবস্থাও তথৈবচ ।

আম, লিচু কড়া রোদে শুকনোর কথা, কিন্তু বাজারে বাবুরা তাদের সযত্নে ঘিরে রেখেছে যাতে ফল গুলো না শুকোয় ।

খানিক পরেই দেখি- জহর সরকারের ভোজ বাজী । ঝাঁকায় কিস্সু নেই ।
৫০০ গ্রাম ভোলা মাছ কিনে ঠেলাওয়ালা সেলিমকে বললাম – বাড়ীতে সব্জী দিয়ে যা তো !

পশ্চিম বঙ্গে নাকি লোকের হাতে পয়সা নেই ।

ছোট বেলা থেকে এই মিথ শুনে আসছি ।

যাই হোক – এই বয়সে কিস্সু হজম হচ্ছে না । তাই অজীর্ণে ভোজনং বিষম্ ।

সাবধান থাকা ভালো কারণ গঙ্গাজলী যাত্রার তো দেরী নেই !

চুল কাটানো


====

খুব ছোটবেলার একটা আবছা স্মৃতি আছে আমার চুল কাটানোর । বাবা আমার মাথা ধরে আছেন জোর করে আর চক্র বারিক আমার মাথার চুল ঘ্যাস ঘ্যাস করে কেটে যাচ্ছে, যেন লনের ঘাস ছাঁটছে ।

আমার পরিত্রাহি চিৎকার আর বাবা বলছেন :- এই তো হয়ে এলো । একটু দাঁড়া ।
সেই সময়ে ওডিশা- আন্ধ্রার সীমান্তবর্তী আধা শহর পারলাখেমুণ্ডিতে সেলুন ছিল বলে মনে পড়ছে না ।

এই করেই চলছিল আমার চুল কাটানো , তারপর তো মা বাবা পাঠিয়ে দিলেন কোলকাতার বাঘাযতীন কলোনীতে মামাবাড়ী, পড়াশোনার জন্য।
প্রথমেই ভেবলু হয়ে গেছিলাম – কোলকাতার এই অংশে এসে । তখন ওটা ছিল হালতু ইউনিয়ন , জিলা :- ছ গণ্ডা পরগণা ।
বড় রাস্তা দিয়ে চলতো ক্যালকাটা স্টেট ট্র্যানস্পোর্টের দোতলা আর একচোখ কানা একতলা বাস ।

ওপরে লেখা থাকতো – ৫ গড়িয়া বা হাওড়া, আপ বা ডাউন বাসে । রাস্তা পেরিয়েই বাঁদিকে বাঘাযতীন বাজার, তারপরেই লাইন দিয়ে আকষর্ণীয় বাঘাযতীন গার্লস্ হাইস্কুল, ইস্টবেঙল সুইটস্ । পরেই একটা খুপরী । ওপরে সাইনবোর্ড – শ্রীশ্রীবজরঙ্গবলী হেয়ার কাটিং সেলুন ।
নীচে আরও লেখা :- এখানে স্বল্পমূল্যে সব ধরণের চুল কাটা হয়, এমনকি উত্তমকুমারের মত । পরীক্ষা প্রার্থনীয় ।
ইচ্ছে করতো ঠিকই, তবে দুটো কারণে সেই সেলুনে ঢুকতাম না । প্রথমত ঠিক কত নেবে সেটা জানতাম না আর পরীক্ষা ব্যাপারটাই আমার কাছে বরাবর গডজিলার মত বিভীষিকা ।
ভয় ছিল, চুল কাটার আগে আবার পড়া টরা না ধরে ।
অগত্যা বিহার নরসুন্দর বাবুলাল ঠাকুরই ভরসা । বাড়ীতে এসে সের দরে দাদু থেকে শুরু করে মামাদের চুল দাড়ি কেটে চেঁছে সাফ করে দিতো ।
আমারটা ছিল ফাউ । কারণ অতগুলো মক্কেল পেয়ে তার হৃদয় গলিত হতো ।
আমি একদিন সাহস করে বাবুলালদাকে বলেছিলাম – উত্তমকুমারের মত চুল কাটতে পারবে ?

বাবুলালদা হো হো করে হেসে বলেছিল – উত্তমকুমার নাকি ওর খদ্দের। সরল কিশোর মনে বিশ্বাস করে মাথাটা ওর হাতে সঁপে দিয়েছিলাম ।
তারপরে আয়না দিয়ে দেখি – প্রায় ন্যাড়া আর মাথার ওপরে চার পাঁচ গাছি চুল ।
কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেছিলাম – এটা উত্তম ছাঁট ?
পরিশ্রম শেষে খৈনি ডলতে ডলতে বাবুলালদা ভাঙা বাংলায় বলেছিল :- ওই যে যিন ফিল্মমেঁ উত্তম জী লাউয়া কা রোল করেছিলোন্ ।

লাউয়া মানে যে নরসুন্দর সেটা জানতাম না । যাক্ তবু সান্ত্বনা । একটা কিছু তো হয়েছে !

দাদু আমাকে দেখেই গম্ভীর হয়ে গেলেন । দিদিমার মুখে আঁচল । তবু চানটান করে ভাত খেয়ে ইস্কুলে যাবার পথে দেখি প্যাঁক মারার আওয়াজ ।
যাঁরা প্যাঁক মারা কাকে বলে জানেন না – তাদের বলি হাত মুঠো করে কড়ে আঙুল উঁচু করে মুখের কাছে এনে শাঁখের মত আওয়াজ করাকে বলতো – প্যাঁক ।

ডান দিকে প্রথমেই পড়তো – সম্মিলিত বাস্তুহারা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় । মেয়েরা একবার করে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর হেসে গড়িয়ে পড়ছে অন্যদের ওপর ।

একজন তো বলেই বসলো - কাকতাড়ুয়াটা সেজেছে বেশ ! সেই প্রথম বুঝলাম – মানুষ নানা সমস্যার মধ্যেই বাঁচে ।
ইস্কুলে খালি চাঁটা পড়তেই লাগলো মাথায় । নতুন চুল না গজানো পর্যন্ত গানটা মনে মনে গাইতাম – সহে না যাতনা ।

এই একটা লাইনই জানতাম, কারণ পাড়ার অপর্ণাদি সন্ধে বেলায় একটা ভাঙা হারমোনিয়াম নিয়ে ফাটা রেকর্ডে পিন আটকে যাবার মত ঐ একটা লাইনই গাইতো রোজ ।
তারপরে সেই বজরঙ্গবলী সেলুনে সাহস করে ঢুকতেই দেখি একটা বেঞ্চিতে বসে বাবুলালদা খৈনি ডলছে । ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম ।

লায়েক হয়ে – একটা বড় সেলুনে ঢুকেছিলাম । সামনে পেছনে আয়না । গদি আঁটা চেয়ার । চুল কাটার নানা রকম মাথার ছবি দেয়ালে টাঙানো ।

ট্র্যানজিসটারে রেডিও সিলোনের হিন্দি গান বেজে চলেছে । সেই প্রথম দেখলাম – লোকে রাতেও চুল দাড়ি কাটে ।
আরেকবার বিউটি সেলুন লেখা দেখে স্যুয়িং ডোর ঠেলে ঢুকে পড়েছিলাম আরও ভালো কিছু হতে পারে ভেবে ।

তারপর শুধু পুলিশ ডাকা বাকী ছিল ।

বাবুলাল নিতো চার আনা আর সেলুনে নিতো দু টাকা । নামী জায়গায় পাঁচটাকা । এখানে নাকি চুল কাটালে দাড়ি কাটা ফ্রি । ব্যাপারটা আজও বুঝি নি ।

আজকাল প্রদীপ বাড়ীতে আমার চুল দাড়ি কাটতে আসে । দাড়ি ২০ টাকা । চুল – ৩০ টাকা ।

অ্যালবাট এসটাইল আর জেবনে হলো নি ।

Sunday, May 21, 2017

রামমোহন রায়

আজ ইংরেজী সনের বাইশে মে । এই দিনটার গুরুত্ব আমরা অনেকেই ভুলতে বসেছি, তবে কেউ কেউ ১৭৭২ সালের কথা মনে রেখেছেন হয়তো ।

হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে এই দিনে ১৭৭২ সালে জন্মেছিলেন এক সমাজ সংস্কারক , যাঁকে আমরা এখন আর সেভাবে মনে রাখি নি ।

পাঠ্যবইয়ে নমো নমো করে পড়ানো হয় তাঁর জীবনী । তাই সেভাবে ছাত্র – ছাত্রীদের মনে দাগ কাটে না তাঁর বিশাল কর্মকাণ্ডের ।

সেই সময়ে সমাজে গেঁড়ে বসে আছে হিন্দু ধর্মের নানা কুসংস্কার । ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে প্রাবল্য নানা ধরণের বিকৃত মানসিকতার ।

নিয়ম-কানুন, বিধি-নিষেধ, অন্ধবিশ্বাস চেপে বসে থাকতো ( এবং এখনও থাকে) সেই সব আচার অনুষ্ঠানে । এতে কোনো নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ছিল না, থাকলেও নীরবে নিভৃতে হারিয়ে যেত প্রবল সামাজিক দাপটে ।

বন্দ্যোপাধ্যায় বংশে জন্মে এমন এক কুলাঙ্গার এই সব প্রথাকে ভাঙ্গতে চাইবে , সেটা অধিকাংশরাই মেনে নিতে পারেন নি । শুরু হয়েছিল প্রবল আক্রমণ ।

উত্তরে তিনি লিখেছিলেন :- “আমার সমস্ত তর্ক বিতর্কে আমি কখনো হিন্দুধর্ম্মকে আক্রমণ করি নাই। উক্ত নামে যে বিকৃত ধর্ম্ম এক্ষণে প্রচলিত, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল। আমি ইহাই প্রদর্শন করিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম যে, ব্রাহ্মণদিগের পৌত্তলিকতা, তাঁহাদিগের পূর্ব্বপুরুষদিগের আচরণের ও যে সকল শাস্ত্রকে তাঁহারা শ্রদ্ধা করেন ও যদনুসারে তাঁহারা চলেন বলিয়া স্বীকার পান, তাহার মতবিরুদ্ধ।

আমার মতের প্রতি অত্যন্ত আক্রমণ ও বিরোধ সত্ত্বেও, আমার জ্ঞাতিবর্গের ও অপরাপর লোকের মধ্যে কয়েকজন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আমার মত গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিলেন।”

তিনি আকৃষ্ট হন – “ব্রহ্মসূত্র ” এবং উপনিষদের প্রতি। এই উপনিষদীয় দর্শন নিয়েই তিনি রচনা করেন “বেদান্ত গ্রন্থ”। আর এই বেদান্ত গ্রন্থের দর্শনকে কেন্দ্র করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “ব্রাহ্ম সমাজ” এবং নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা। সংস্কৃত না জানা বাঙ্গালীকে উপনিষদের বাণীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই তিনি নিজে পাঁচটি উপনিষদ যথা ঈশ, কেন, কঠ, মুণ্ডক ও মাণ্ডুক্য উপনিষদ বাংলায় অনুবাদ করেন।

তিনিই সতীদাহ-প্রথা বন্ধ করেন। সাধারণতঃ লোকের বিশ্বাস, এই সংস্কার সম্পূর্ণরূপে ইংরেজরা করেছিল হিন্দু ধর্মের অবমাননার জন্য কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়।

তিনিই এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করেন এবং একে রহিত করবার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সাহায্য পান । যত দিন না, তিনি আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন, ততদিন ইংরেজরা কিছুই করেনি।

বেদান্ত-উপনিষদগুলি বের করবার সময়ই তিনি সতীদাহ অশাস্ত্রীয় এবং নীতিবিগর্হিত প্রমাণ করে বই লিখলেন 'প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ'। প্রতিবাদে পুস্তিকা বের হল 'বিধায়ক নিষেধকের সম্বাদ'।

তার প্রতিবাদে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুস্তিকা বের হয়। এই বছরেই ডিসেম্বর মাসে আইন করে সহমরণ-রীতি নিষিদ্ধ করা হয়। তবুও গোঁড়ারা চেষ্টা করতে লাগল যাতে পার্লামেন্টে বিষয়টি পুণর্বিবেচিত হয়। এই চেষ্টায় বাধা দেবার জন্য তিনি লণ্ডন গিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন- ‘বর্তমান বঙ্গসমাজের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন । আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি। তিনি আমাদের জন্য যে কত করিয়াছেন, কত করিতে পারিয়াছেন, তাহা ভালো করিয়া আলোচনা করিয়া দেখিলে তাঁহার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও বিশ্বাস জন্মিবে। আমাদিগকে যদি কেহ বাঙালি বলিয়া অবহেলা করে আমরা বলিব, তিনি বাঙালি ছিলেন।’

প্রপিতামহ কৃষ্ণকান্ত ফারুখশিয়ারের আমলে বাংলার সুবেদারের আমিনের কার্য করতেন। সেই সূত্রেই এঁদের 'রায়' পদবীর ব্যবহার। আর দিল্লীর বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর তাঁকে 'রাজা' উপাধি দিয়েছিলেন ।

আজও আমরা বাঙালি, কিন্তু তাঁকে মনে রাখিনি । তবু নারী পুরুষ নির্বিশেষে অক্ষম বাঙালিদের প্রণাম রইলো- রাজা রামমোহন রায়ের প্রতি ।

======
তথ্য - নানা ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া

বিলিতি আমড়া ও ফুটো পয়সা


+++++++++++++
ভারতে, ১৯৫৭ সালে দশমিক পদ্ধতি চালু হয়- এটা সবাই জানেন । অন্তত আমার বয়েসি বা বড় বা একটু ছোটো তো জানবেনই ।
কিন্তু, তারপরেও এক পয়সা, এক আনা, দুই আনা, সিকি ( চার আনা), আধুলি ( আট আনা) এই সব মুদ্রার চল- বহুদিন ধরেই ছিল ।
লোকে চৌষট্টি পয়সায় এক টাকা থেকে একশো নয়া পয়সায় এক টাকা ঠিক বুঝতে পারতো না ।
ফলে, এক আনা মানে ছয় নয়া পয়সা- দু আনা অর্থে বারো নয়া ( চলতি), আর চার আনা আবার পঁচিশ (হিসেবে এক নয়া বেশী) আর আট আনা হলো পঞ্চাশ নয়া ।
দ্বিতী‌য় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাকি তামার যোগানে টান পড়ে, তাই ব্রিটিশ রাজ চালু করেছিলো গোল এক পয়সা, মধ্যেখানে ফুটো ।
এটা এখনও অনেকের কাছে আছে, তবে তার ব্যবহার অবশ্য অন্যরকম ।
বাচ্চা ছেলে মেয়েদের কোমোরে একটা ফুটো পয়সা কালো সুতো দিয়ে ঝোলানো থাকে, “অপদেবতার” কুনজর এড়াতে ।
তা, যেটা বলছিলাম ! তখন বিজয়গড় শিক্ষানিকেতনের গেটের ডানদিকে, পরপর কয়েকটা ঝুপড়ি( এখন হলে, নাম হতো – ঝুপস্) দোকান ছিল ।
ঘুঘনি থেকে শুরু করে পাঁউরুটি – কেক-বিস্কুট, চুরণ থেকে কাঁচা আমড়া, সময়ে কাঁচা আম, ধুলোর আস্তরণে ঢাকা লাল আলুর কষা, বিড়ি, সিগারেট- সবই পাওয়া যেতো ।
সে এক, বিচিত্র হরফন মৌলার জগত ।
সকালের সেকশনে, মেয়েরা পড়তো । ফলে, আমাদের মত “ বিশ্ব পাকা চ্যাংড়ার” দল স্কুলের সময়ের আগেই পৌঁছতাম, মেয়ে দেখতে ( বিয়ের জন্য নয়) ।
দুঃসাহসী কিছু মেয়ে তো ছিলই । সেই সময়ে, মেয়েদের বিড়ি বা সিগারেট টানা মানে, সে দুঃশ্চরিত্রা ।
তবু, কিছু মেয়ে ডাঁটে সিগারেট কিনে- দলবদ্ধ ভাবে, টানতে টানতে যেতো সবার সামনে দিয়ে।
আবার তখন, শব্দ নিয়ে পলিটিকালি কারেক্ট থাকার দরকার ছিল না ।
একদিন একটি সুন্দরী মেয়ে ( তখন আমাদের চোখে সব মেয়েই সুন্দরী ।) একদিন বললো – একটা বিলিতি আমড়া খাওয়াবি ?
কেন রে, একটু আগেই তো সিগারেট কিনলি !
যা পাই, হাতখরচা হিসেবে সবই তো আজ খরচ হয়ে গেলো ।
বিড়ি খেলেই তো পারিস, অতই যদি ধোঁয়া টানার শখ !
কিছু মনে করিস না ! বিড়ি খেলেই চাকর চাকর বদগন্ধ বেরুয় ।
মানে ??
তুই তো আবার বিড়ি খাস !
তাতে কি হলো ??
দেখতেও তো চাকরের মত । সারা গা দিয়ে চিমসে বদগন্ধ আর ধ্যাড়াংগা লম্বা ! তুই চাকর ছাড়া আর কি ? নে নে- আমাকে বিলিতি আমড়া খাওয়া । না হলে, শান্তিকে বলবো ।
অগত্যা ফুটো পয়সা দিয়ে- দুটো বিলিতি আমড়া কাটিয়ে, কষে ঝাল নুন মাখানো অবস্থায় দিলাম তাকে ।
হুসহাস করে খেয়ে, মেয়েটা চলে গেলো ।
তার কয়েকদিন পর অশোক ট্রাস্টে ফুটবল খেলতে গেছি । বাঘাযতীন কলোনী দিয়ে একটা শর্ট কাট ছিল অশোক ট্রাস্ট যাবার ।
বেশরম মেয়েটা দেখি- শান্তির সাথে ফুচকা খাচ্ছে , হা হা হি হি করতে করতে ।
সেই রাগটা হঠাৎ মনে পড়াতে আর কি বোর্ড চলছে না এখন ।
তবে, সেই থেকে আমড়ার টক আর খাই না।
ফুটো পয়সা, যে কটা ছিল- দান করে দিয়েছি ।

দুঃখের সেকাল ও একাল


---------------

আমার কয়েকটা দুঃখ জমিয়ে রেখেছি- ছোট ছোট হোমিওপ্যাথিক শিশিতে ।
মনে আছে, সেই বরফের গোলা?
র‌্যাঁদা দিয়ে বরফের ছোট চাঁই ঘসে, বানানো হতো সেই গোলা । তার ওপর ঢালা হতো- লাল নীল সবুজ সিরাপ । তারপর কাঠি গুঁজে সেই অপার্থিব গোলা চলে যেত বিভিন্ন লোকেদের হাতে ।
বাচ্চা বয়েসে, চোখ জুলজুল করে দেখতাম- সেই সব বরফ গোলা ।
একবারই খেয়েছিলাম, তাও আদ্দেকটা । বাকী আমার মাতামহ কেড়ে নিয়েছিলেন হাত থেকে ।
ডাক্তার মানুষ আমার মাতামহ বলেছিলেন- ঐ সব বরফ নাকি ড্রেনের জলে তৈরি ।
বড় হয়ে, খাইনি যে তা নয়- তবে সেই স্বাদ আর কোথায় ? বাচ্চা বয়েসের সেই “কচি” জিভের স্বাদটা যে ততদিনে হারিয়ে ফেলেছি ।
ছোট বেলায়, মামাবাড়ীতে কোনোদিনই গোটা হাঁসের ডিম জোটে নি ।
নাকি- ছোটদের গোটা ডিম খেতে নেই ।
ডুগি- তবলার মত কাটা হতো সেদ্ধ ডিম, সুতো দিয়ে । ডুগির ভাগটা জুটতো অবশ্য দিদিমার কল্যাণে, কিন্তু পুরো ডিম খাওয়ার জন্য মন আকুলি বিকুলি করতো ।
এক বড়লোক সহপাঠী / সহপাঁঠা , এসব শুনে বলেছিল – তোরা, বাঙালরা হাড় কিপ্টের জাত ! ডিম- সেটাও আদ্দেক ভাগ করে খাস?
হায় রে ! সে কি করে বুঝবে উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা !
তখন যে সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা ।
তো যাক্- এই সব কাঁদুনি গেয়ে লাভ নেই ।
মোদ্দা কথা হলো – হাঁসের ডিমের সাইজ এখন ছোটো । সেই অলৌকিক কুসুমের সুবাস অনুপস্থিত । গরমে তো আরও মেলে না ।
দোকানদারদের বক্তব্য- গরমে হাঁসের ডিম রাখা মুশকিল- নাকি তাড়াতাড়ি পচে যায় ।
সাইজে- মাইক্রোস্কোপিক পোলট্রির ডিম, তার আবার কুসুমের রঙ, ফ্যকাসে ।
মাঝে সাঝে খাই, তবে বেশী খাই না ।
আরও একটা দুঃখ - যে প্ল্যাস্টিকের ডিম নিয়ে অ্যাতো হইচই হলো, সে জিনিস, না আখোঁ সে দেখা- না খায়া ।
খুরমা জানেন ? জানাটা স্বাভাবিক অবশ্য । চিনির রসে ডোবানো কেনি আঙুল সাইজের একরকম মিষ্টি বস্তু ।
সেটাও ছোটবেলায় খাই নি সেরকম । কারণ, সেগুলোও নাকি বাজে ময়দার তৈরি ।
এখন তো, দাঁত নেই- তাই ইচ্ছে থাকলেও খেতে পারি না ।
বুড়ির মাথার পাকা চুল ! সাদা সাদা সেই সব অমৃত মেলে নি খেতে খুব একটা ।
ওগুলো – সাদা চিনির তৈরি । “বাউনরা” খায় না ।
চিনির তৈরি বড় বাতাসার নো এন্ট্রি । গুড়ের বাতাসা খেতাম । খাওয়ার পর, কুঁজোর জল খেলে, গরমে সে কি আরাম !
কুঁজো আজকাল মেলে কি, এই ফ্রিজের যুগে ?
আইসক্রিমের কথা আর বললাম না, কারণ ঘা শুকোনোর জন্য যে দুধ ঢালা হতো (?) – সেই দুধে নাকি আইসক্রিম তৈরি হয় বলে – অভিভাবকদের ধারণা ছিল ।
রেস্তোরাঁতে অবরে সবরে খেতাম – সেটাও আর হবে না ।
তারা নাকি বাসী – এঁটো, মাছি ওড়া, পোকা পড়া খাবার দেয় ।
হোমিওপ্যাথিক শিশিগুলো বেড়েই চলেছে ।

কোলকাতার কথকতা

খ্রিস্টিয় ১৬২০ র নভেম্বরের এক অপরাহ্নে, দিবানিদ্রা সমাপনান্তে গোবিন্দপুরের জমিদার- বসাক বাবু গাত্রে শাল জড়াইয়া, গড়গড়া হইতে ধূম্রপান করিতেছিলেন ।
দ্বিপ্রাহরিক ভোজন কিঞ্চিৎ গুরুতর হইয়াছিল।
শিয়ালদহর নিকটস্থ লবণ হ্রদ হইতে রামা জেলে দুইখানি রোহিত মৎস, রন্ধনশালায় দিয়া, নতমস্তকে বসাকবাবুকে কহিল:-
আজকাল আর লবণহ্রদে মাছ ধরা যাবে নি কো জমিদার মশাই ।
কেন রে ?
এই এত্ত বড় বড় কুমীর, মেছো কুমীর জলে ।পা কেটে লিয়ে যেতে পারে ওরা ।
তাইলে তো একটা ব্যবস্থা করতে হয় ।
হ্যাঁ, জমিদার মশাই ।
এক্ষণে, হরি কৈবর্ত সালাম করিয়া বসাক বাবুর সমীপে নতশিরে দণ্ডায়মান হইল ।
কি খবর রে হরি ?
এঁজ্ঞে কত্তা, গঙ্গা নদীর ধারে গেচিলাম ।
কি দেখলি ?
কয়েকটা গোরা, পেল্লায় পালতোলা নৌকা থেকে নেমে – দোবাস দোবাস করে চিল্লাচ্ছে। বুইতে পারলুম নি, তাই জমিদার বাবুকে খবর দিতে এলাম ।
লোকগুলো কি লাল মুখো?
এঁজ্ঞে, হ্যাঁ কত্তা ।
মূর্খ ! ওরা ধোবা ধোবা করে চেঁচাচ্ছে । জামাকাপড় তো সব ময়লা ওদের । যা রতনকে পাঠিয়ে দে !
রতন সরকার?
আরে বাপু হ্যাঁ !
------
এই রতন সরকারই পরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শিখে প্রথম দোভাষীর কাজ শুরু করে ইংরেজদের সাথে।

তারপরে তো ইতিহাস !
--
কল্পনার সূত্র :- দি আর্লি হিস্টরি অ্যান্ড গ্রোথ অব ক্যালকাটা
লেখক: রাজা বিনয়কৃষ্ণ দেব- ১৯০৫ সংস্করণ ।