আজকাল মনটা ঠিক জুতের থাকে না নিতুর । এককালে তার ভাল নাম ছিল – নিত্যানন্দ দাস।
সেই নামে কেউ ডাকত না গ্রামে ! মুনিষ খেটে সংসার চলত তার । অন্তত দুবেলা দু মুঠো ভাত জুটে যেত ।
ছেলে পুলে না থাকাতে গৌরীর একটু খেদ ছিল না যে তা নয়, তবে নিতু তার বৌকে বলেছিল – ভগবান যা করেন, ভালর জন্যই করে । ছেলে পুলে হলে অনেক ফ্যাসাদ হত ! এই তো রোজগার !
সব গুবলেট করে দিল ওই ব্যাটা- গুলে জেলে ! নানা রকম মাছ বেচে শহরে । সাইকেলের কেরিয়ারে মাছের ঝুড়ি নিয়ে বেরোয় ভোরবেলা ।
নিতু একদিন মাঠে যেতে- দেখা গুলের সঙ্গে ।
বলেছিল – বাঃ । দেখি তোর মাছগুলো !
কিনবি তো?
নিশ্চয় ।
গুলে, ঝুড়ির ওপরের প্ল্যাসটিক খুলে দেখাল নিতুকে ।
ইলিশ দেখিয়ে বলল নিতু – কত রে গুলে?
ইঃ , লবাবপুত্তুর ! হাজার টাকা কেজির মাছ খাবে ব্যাটা ! খ্যামতা আছে? বেকার সময় নষ্ট ! যা, গ্রামের পাশে নদীতে গিয়ে ধর ইলিশ । ব্যাটার ইদিক নাই –উদিক আছে ! হুঃ !
নিতুর খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল । ইলিশের সর্ষে বাটা ঝোল সে অনেকদিন আগে খেয়েছিল, গ্রামের মহাজনের বাড়ীতে ! লোকটি বেশ ভাল ছিল । নাতির অন্নপ্রাশনে গ্রাম শুদ্ধু লোককে যেচে খাইয়েছিল সর্ষে ইলিশ আর ভেটকি মাছের পাতুরি ।
ফুরুৎ করে একদিন ভবসাগর পার মহাজন !
গৌরীকে বলে কুচো মাছের সর্ষে বাটা ঝাল খেত নিতু ! গৌরীর রান্নার হাত ছিল - একেবারে সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণার মত ।
সেদিন অপমানের পর নদীতে তার ছোট জালটা ফেলল । কিছু একটা জুটবেই !
কপাল খারাপ ! অনেকদিন অভ্যাস নেই ! জাল ঘুরিয়ে ফেলতে গিয়ে পা হড়কে গেল ! নিতু আর কিছু দেখতে পেল না !
তারপর থেকেই – গ্রামের এই বটগাছে বসে পা দোলায় !
অবাক হয়ে দেখে – মানুষের যখন দিন তখন নিতুদের রাত ! আর রাত হলেই ভোর হয় নিতুদের !
পা দুলিয়ে অনেকবার গুলের মাছের ঝুপড়ি ফেলে দিয়েছে ! ব্যাটা গুলে- প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলেও, পরে বুঝে খুব ভয় পেয়েছিল । আর তো অন্য রাস্তা নেই গ্রাম থেকে বেরোবার ! তাই নিতুর সাথে একটা রফা করেছিল গুলে !
গাছের দিকে তাকিয়ে বলেছিল – তুই যদি নিতু হোস, তবে একটা গাছের ডাল নাড়া !
নিতু ডাল নাড়াতেই , গুলে বলেছিল –তোকে মাসে দুটো করে ইলিশ দেবো ! গৌরীকে বলব- তোকে সর্ষে ইলিশের সাথে ভাত দেবে । আর রোজ চুনো মাছ দেবো ! ভাতের সাথে চুনো মাছের চচ্চড়ি খাবি ! গৌরী থালাটা রেখে যাবে এখানে । তুই খাবি ! ঠিক আছে? আর জ্বালাবি না আমাকে !
গাছের ডালটা নাড়িয়ে দিল নিতু !
এবারে আর একটা সমস্যা গজিয়ে গেল ! পাশের বেলগাছের ব্রহ্ম দৈত্য হারু ঠাকুর বলল – যে দিন ইলিশ হবে, সেদিন আমাকে ভাগ দিবি ! না হলে, তোকে একটা কেস দিয়ে ভূতেদের জেলে পাঠাব ! আমাকে সবাই ডরায় এখানে ।
অগত্যা মধুসূদন ! নিতু রাজী হল ।
এই করে রাত চলছে !
হঠাৎ ভূতেদের হেড অফিস থেকে কয়েকটা ভূত এল !
তাদের ফরমান – যত কারিয়া পিরেত, মামদো আর অন্যান্যরা আছে তাদের ভূত গণণা হবে !
ব্রহ্মদত্যি আপত্তি করলেন না ! কি আর করা ! ওরা সব নাম টাম লিখে নিয়ে গেল !
এখন শুধু অপেক্ষা, কবে লিস্ট বেরুবে !
যদি লিস্টে নাম না থাকে, তবে নিতুদের অন্য জায়গার শ্যাওড়া গাছে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হবে !
কোথায় পাবে গৌরীর হাতের রান্না !
মনটা কি ভাল থাকতে পারে নিতুর?

No comments:
Post a Comment