Powered By Blogger

Thursday, May 5, 2016

দশটা দশ


আগে ঘড়ির বিজ্ঞাপনে, এই সময়টাই দেখানো হতো । রাত না দিন – বোঝার উপায় নেই, তবে জনশ্রুতি আম্রিগার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে নাকি রাত দশটা দশে গুলি করে খুন করা হয়েছিল, তাই এই সময়টা দেওয়া হতো ।

সত্যিটা হলো -লিংকন সাহেবকে গুলি করা হয়েছিল, রাত দশটা পনেরোতে আর তিনি মারা যান পরের দিন সকাল সাতটা বাইশে ।
পরে, আরও অনেক অন্য কাহিনী যোগ হয় – জন এফ কেনেডি, মার্টিন লুথার কিং ( জুনিয়ার) দের নিয়ে, কিন্তু কোনো সময়েই সেটা দশটা দশ ছিল না ।
কিন্তু, একবার জনশ্রুতি চালু হলে সেটা কি আর থেমে থাকে ? প্রচার হলো – এই সময়তে জাপানের হিরোশিমা বা নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল ।

আবার সেই ভুল । ফ্যাট ম্যান বোম্ব, হিরোসিমাতে ফেলা হয়েছিল, স্থানীয় সময় সকাল এগারটা দুইয়ে আর তার পরের দিন নাগাসাকিতে, লিটল বয় ফেলা হয়- স্থানীয় সময় সকাল আটটা পনেরোতে ।

মজাটা হলো- খেয়াল করলে দেখা যাবে, আম্রিগা এই ব্যাপারে কোনো না কোনো ভাবে জড়িয়ে আছে ।

আসলে, ঘড়ির কাঁটা গুলো যাতে ঠিকঠাক দেখা যায় বা কোম্পানির লোগো যাতে স্পষ্ট হয় – এটাই এর কারণ বলে ঘড়ি উৎপাদন কারী রা বলে থাকেন ।

কেউ কেউ আবার আটটা কুড়িও দেখান তাঁদের বিজ্ঞাপনে । তবে, এই সব নিয়ে প্রচুর মতভেদ আছে, সেটা নিয়ে লিখে আর হ্যাজাবো না ।

প্রথম “আমপাড়া” ঘড়ি যেটা দেখি – সেটা হলো একটা বুকপকেট ঘড়ি । বাবা, ৺ রামনারায়ণ ভট্টাচার্যের কাছে ।

বুকের চোরা পকেটে সেটা লুকিয়ে রাখা থাকতো । কোন কোম্পানির সেটা মনে নেই, তবে মাথার ওপর একটা “তাজ” য়ের মত ছিল । সেকেন্ডের কাঁটা ছিল অনুপস্থিত । পাশে ছিল – দম দেবার একটা গোলাকার দণ্ডের মত, এরও মাথায় একটা ছোট তাজ মত ছিল আর একটু বেরিয়ে থাকতো ঘড়ি থেকে ।

বেনারস যাবার সময় বাবা একবার সময় দেখতে গেলে সেটা একজন ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় বিহারের এক স্টেশনে থেমে থাকা ট্রেনের খোলা গারদ হীন জানলা দিয়ে । বাবা ছিনতাইকারীর হাত চেপে ধরেছিলেন বজ্রমুষ্ঠিতে, কিন্তু আরেকজন এসে বাবার হাতে লাঠির মার মারাতে সেটা নিয়ে চলে যায় – ছিনতাইকারী । ট্রেনও ছেড়ে দেয় ।

সারা ট্রেন ধরে বাবা হায় হায় করলেও, ঘড়ি ছিল বেপাত্তা ।

বেনারসে নেমেই বাবা চলে যান কাকাকে নিয়ে গোধুলিয়া মোড়ে । তখন হাতঘড়ি চলে এসেছে বাজারে, তবে ব্যাণ্ডটা চামড়ার ।

সবাই বোঝালো – এটা গরুর চামড়া । একটু থমকালেও পরে বাবা বলেছিলেন – জুতোগুলোও তো গরুর চামড়ার, তাহলে ব্যাণ্ড আর কি দোষ করলো ?

আরও পরে যখন স্টিলের ব্যাণ্ড আসে, তখন প্রথম সুযোগেই বাবা স্টিলের ব্যাণ্ড পরিয়ে নিয়েছিলেন – সেই “জেনেক্স” ঘড়িতে । সেটা অবশ্যই সুইস্ ঘড়ি ছিল ।

বাবা একটা টেবল ক্লকও কিনেছিলেন – নাম ছিল, “সাইমা” । সেকেন্ডের কাঁটাও ছিল তবে দুটো প্রধান কাঁটা ছিল – ফসফরাস মাখানো, যাতে রাতের অন্ধকারেও সময় দেখা যায় ।
ঘড়ি পরার বয়স হলো – তখন দেখি, বাজারে হরেক কিসিম ঘড়ি । অ্যাঙলো সুইস থেকে হেনরী স্যান্ডোজ । রোলেক্স তখন ধরা ছোঁওয়ার বাইরে ।
বাজারে এলো – এইচ. এম.টি । কত রকমের মডেল । পাইলট থেকে শুরু করে আপ্পু । পার্ক স্ট্রিটে ঢুকতেই ডান দিকে একটা দোকান ছিল - সেই দোকানে লাইন দিয়ে কিনেছিলাম পাইলট ঘড়ি ।

বিয়েতে শ্বশুর মশাই দিয়েছিলেন – অটোম্যাটিক এইচ. এম.টি ঘড়ি । দম দেওয়ার বালাই ছিল না, খালি পরে থাকলেই হতো- তাতে নাকি স্বয়ংক্রিয় ভাবে দম দেওয়া হয়ে যেত । সেটা আছে এখনও অচল অবস্থায় ।

পরে এরা কোয়ার্টজ ঘড়িও আনে তবে কিনতে হয় নি । আমার কোম্পানি সবার সাথে আমাকেও একটা উপহার দিয়েছিল আর সেটা এখনও আমি হাতে পরি ।

শ্বশুর বাড়ী কোচবিহারে দেখি – এক ওয়াল ক্লক । ঘন্টায় ঘন্টায় বাজতো আর সপ্তাহে একদিন দম দিতে হতো । পেন্ডুলাম দুলতো ।

ঘড়িটা প্রায় একশোরও বেশী বয়েসি , তবে চালু ।কিন্তু আর ঘন্টাটা বাজে না ।
পঁচিশ – ত্রিশ বছর আগে, ইংরেজী স্টেটসম্যান পত্রিকায় একবার পড়েছিলাম-

এক ভদ্রলোক রোলেক্স ঘড়ি পেয়েছিলেন পৈত্রিক সূত্রে । কতবার যে হাত থেকে পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই । একবার নাকি জলের চৌবাচ্চায় ডুবে ছিল তিনদিন ধরে । পরে মনে পড়াতে জল থেকে তুলে দম দিতেই ঘড়িটা স্বাভাবিক ।

কোনোভাবে জানতে পেরে – রোলেক্স কোম্পানির প্রতিনিধি এসে ঘড়িটা ভালো দাম দিয়ে কিনে নিতে চান আর সাথে নতুন মডেলের একটা রোলেক্স ঘড়ি ।

তারা এও বলে – এই ঘড়ি আর পাওয়া যায় না, তাই তারা ওনার বাবার নাম সহ কোম্পানির সংগ্রহশালায় রেখে দেবে ।

ভদ্রলোক দিয়েই দেন ঘড়িটা- এই ভেবে যে বাবার নামটা অন্তত থাকবে এবং নগদ প্রাপ্তি ছাড়াও একটা নতুন ঘড়ি পাবেন- এই লোভে ।

একদিন পরে – ঘড়িটা অনধাবনতা বশত চৌবাচ্চার জলে পড়ে যায় । সঙ্গে সঙ্গে তুললেও – ঘড়ি আর চলে নি ।

--------------

পু:- বাবা মারা যান ১৯৮৬ সালের ১২ ই ডিসেম্বর ভোর সাড়ে পাঁচটায় । সাইমা টেবল ঘড়িটা ঠিক সেই সময়েই বন্ধ হয় ।

অনেক চেস্টা করেছি সারাতে, ঠিক হয় নি । একটা কাগজের বাক্সে রাখা আছে সেটা ।

প্রাদেশিক নহে

তখন অখণ্ড বিহার! ভারতের এই রাজ্যটি ভেঙ্গে ঝাড়খণ্ড আর বিহার হয়েছে।
“ মানজার বাবু” হিসেবে আরা গেছি।

সঙ্গে কৌশিক ভট্টাচার্য্য, আমার সহকর্মী প্রতিনিধি। ডাক্তারদের দেখা করে কোম্পানীর ওষুধের গুণাবলী প্রচার করাই উদ্দেশ্য। কৌশিক বিহারেরই ছেলে। হাজির জবাব তার অন্যতম গুণ। আমাকে আগেই বলেছিল, ওর নিজস্ব বাংলাতে- স্যার! যে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, বহোত টাঙ্গ খিঁচনে ওয়ালা পাবলিক! তবে আমাদের ওষুধ প্রচুর লেখে।

আমি বললাম, তাহলে আর আমার যাওয়া কেন? জানো তো! যে ওষুধ লেখে, তাকে ডিসটার্ব করতে নেই, আর যে লেখে না, তাকেও ডিসটার্ব করতে নেই।

কৌশিক, আড় চোখে তাকালো আমার দিকে।

কি বলতে চাইছেন? তাহলে বাড়ীতেই বসে থাকব আর ফলস্ রিপোর্ট দেব? ( আমাদের লাইনে, এটাকে “গুবলু” বলে)

মুখ “ফোক্সে” কথাটা বলে, আমি প্রমাদ গুণলাম।

আরে না- মানে ও সব ডাক্তারের কাছে “মানজার বাবুদের” নিতে নেই!

কৌশিক- ঠিক আছে, এসেই যখন পড়েছেন, চলিয়ে মুলাকাত তো করে।
তা চললাম। ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ২/৩ জন “রিপেজেনটিটি”। সঙ্গে আরও কিছু “মানজার বাবু”। এক সর্দ্দার “মানজার বাবু”র সঙ্গে তার “রিপেজেনটিটি”র কোনো ব্যাপারে কথা-কাটাকাটি চলছে। “রিপেজেনটিটি”বাবু খাস কলকাত্তাইয়া। এক্কেরে “স্যামবাজারের সষী বাবু”
হঠাৎ সর্দ্দার “মানজার বাবু” বললেন- You see, these tough sales jobs are not meant for Bengalese. They are born clerks. You are not fit for this job.
রিপ্রেজেনটিটি- Have you gone to Calcutta?
সর্দ্দার “মানজার বাবু” -Why not? My head quarter is in Calcutta, you know.
রিপ্রেজেনটিটি-Then, Mr. Singh you must have noticed, we Bengalese are accustomed to see SARDARjees as truck, bus and taxi drivers. How come, you became a manager in this Pharma Company?
সর্দ্দার “মানজার বাবু” চুপ!
পালা এলে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকলাম। ডাক্তারের সাথে কৌশিক পরিচয় করিয়ে দিল। ডাক্তার চেয়ার ছেড়ে উঠে হাত মেলালেন। চা খাচ্ছিলেন- বললেন, চা পিবো?
মাথা, হ্যাঁ অর্থে নাড়ালাম
ডাক্তার- এ কৌশিক, য়্যাদা বকর বকর মত কর!
কৌশিক- আরে, ডাগদর সাব, হাম তো ইয়ে বলবে করে, কি হাম কুচ না বোলি। “মানজার বাবু” বোলনে আয়ে কি উ ভি কুছ না বোলি, সমঝলন?
ডাক্তার- হঁঅঅঅঅঅঅ! চায় কা সাথ বাল খাইব, “মানজার বাবু”? ( পাঠক/পাঠিকারা ক্ষমা করবেন)
আমি মনে মনে রেগে গিয়ে না অর্থে মাথা নাড়লাম।
ডাক্তার- এ কৌশিক! তু খাবু?
কৌশিক, হ্যাঁ অর্থে নাড়াল।
পরে দেখলাম, চায়ের সাথে আমার চেহারার সাইজের ভুট্টা পোড়া! নুন, তেল দিয়ে মাখানো। আর ব্যাক গিয়ার মারতে পারলাম না। কি করে জানব, বাল মানে স্থানীয় ভাষায় ভুট্টা!!!!!!
এ কথা, সে কথার পর
ডাগদর সাব- (হাসি মুখে) এ কৌশিক! যিত্তা বাঙ্গালী হ্যায় না, বিহার মেঁ, উনকো বংলা মেঁ ভেজ দেম, আউর যিত্তা বিহারী বংলা মেঁ হ্যায় না, উনকো বিহার মেঁ ভেজ দো! কেইসন রহি, ই বাত? কোই দিককত?
কৌশিক- কোই দিককত না বা। খালি “মানজার বাবু” যব হাবরা মেঁ উতরব, তব কুলি না মিলি।

Monday, May 2, 2016

জয় বাবা মাণিক নাথ

৯৫ বছর আগে আজকের দিনে জন্মানো, এই ব্যক্তিত্বের ধারে কাছে যাওয়ার আমার কোনো গুণই ছিল না ।
বহুল প্রচারিত একটি ছবি দেখেছেন অনেকেই । লেখার টেবিলে পাশে শোভা পাচ্ছে একটা ওষুধ কোম্পানির ডেস্কটপ ক্যালেন্ডার । মগ্ন হয়ে কিছু লিখছেন ।
আমারই এক সহকর্মী ( অন্য একটি কোম্পানির) তাঁকে সেটা উপহার দিয়েছিলেন । পরিচিতি ছিল সেই সহকর্মীর সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সিনেমারই সুবাদে ।
সেই সূত্রেই একদিন গিয়েছিলাম ওনার বাড়ীতে । সেই প্রথম এবং শেষ । মালদা থেকে কোলকাতায় এসেছিলাম আমার কোম্পানির কাজে । সেই ফাঁকে তাঁর বাড়ীতে ঢুঁ মারা ।
ঘড়ি ধরে পনের মিনিট সময় দিয়েছিলেন উনি । চা এবং টা দুটোই জুটেছিল । পনের মিনিট রূপান্তরিত হয়েছিল প্রায় এক ঘণ্টায় ।
হাঁ করে শুনছিলাম তাঁর কথন শৈলী । সত্যিকারের ব্যারিটোন ভয়েস কাকে বলে, বুঝেছিলাম, সামনাসামনি । বেশী ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতেন না উনি সাধারণ কথোপকথনে। যেটুকু সেদিন শুনেছিলাম, মনে হয়েছিল এইভাবেই বোধহয় ইংরেজী বলতে হয় ।
জানা ছিল, তবে আপিস কে দপ্তর বলার প্রয়োগ প্রথম শুনেছিলাম ওনার মুখে ।
মজা করেই বলেছিলেন :- কমলবাবু ( কমলকুমার মজুমদার ) বলেছেন :- ঢ্যাঙ্গা মাণিক আবার ইন্টেলেকচুয়াল হল কবে ?
মিচকে হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে ফিরে এসেছিলাম, এক ঝাঁক পূর্ণ হৃদয় মাথায় করে নিয়ে ।
ঠিক কতদিন এখন আর মনে নেই,তার মাস কয়েক পরেই তিনি ভর্তি হয়েছিলেন নার্সিং হোমে ।
তার পরেই “অভিযান”২৩ শে এপ্রিল, ১৯৯২ সালে ।
দীর্ঘ ২৪ বছর পরও বাংলা চলচিত্রের হাল দেখে ( কয়েকটা ব্যতিক্রম ছাড়া) এখনও প্রয়াত সলিল চৌধুরীর কবিতার দুটো লাইন আমার মাথায় ঘোরা ফেরা করে :-
“ সিনেমার কেন কালীঘাট নেই
তা হলে, অনেক পাঁঠা বলি দেওয়া যেত”
-
-
-
জয় বাবা মাণিক নাথ

গড়িমসি



বাংলা এই শব্দটার মধ্যে একটা আভিজাত্য আছে । বেশ একটা জমিদারি ভাব।

হচ্ছে হবে- করছি করব, টাইপের একটা হেব্বি ব্যাপার ।

গড়িমসি – অনেক ব্যাপারে করা যায় , তবে বিছানায় পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে এই ব্যাপারটা একেবারে জমে ক্ষীর ।

অনেকে এটা আলস্য বা দীর্ঘসূত্রতা বলবেন , তবে এই শব্দগুলোর মধ্যে একটা কেজো বা কেমন যেন ব্যাকরণ টাইপ ভাব । ফুরফুরে অম্বুরী তামাকের একটা সুবাস – গড়িমসি শব্দটার সঙ্গে সেঁটে আছে । এর কাছাকাছি আর একটা শব্দ আছে – গদাইলস্করি ।

তবে কিনা এটা সেই গাধাবোটের মত । ধীরে ধীরে চলছে আসল নৌকোর সঙ্গে আর খালাসী বা লস্কর কপালে হাত দিয়ে বসে, ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে ।

শেষ পর্যন্ত – গদাইলস্করি মানে কুঁড়েমি দাঁড়ায়, তবে এটার মধ্যেও একটা গালি গালি ভাব ।

গড়িমসির সঙ্গে গদাইলস্করিটা ঠিক যায় না । আমরা, কথায় কথায় সায়েবদের কথা বলি । তারা নাকি এসব জানে না । একেবারে পাক্কা পেশাদার । সময়ের কাজ সময়ে হয় ।

কে বলেছে, শুনি - ঞ্যাঁ ? তা হলে – প্রোকাসটিনেশন কথাটা কে তৈরি করলো, ওদের অভিধানে- পাণিণী ? যত্তসব !
তবে হ্যাঁ, ব্যাটারা আবার পাশবালিশের মাহাত্ম বোঝে না । চৌরঙ্গী উপন্যাসে স্যাটা বোসকে, লিলেন ম্যানেজার বলেছিল – দেই ব্যাটাদের পাশবালিশের অভ্যেস ধরিয়ে । বুঝবে, কতধানে কত চাল ।

এদানীর এর একটা প্রতিশব্দ এসেছে – ল্যাদ্ খাওয়া । কেমন যেন একটা উদ্বাস্তু শব্দ ।

যে কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরে যান ! দেখবেন গড়িমসি কাকে বলে । এই টেবিল থেকে পাশের টেবিলে একটা জরুরী ফাইল যেতে এক মাস থেকে এক বছর লাগে ।

তবে গিন্নীর যেমন গুঁতো থাকে – বাজারে যাবার জন্য, সেরকম ঠিক মত গুঁতো পড়লে আবার সেটা পাঁচ মিনিটে সারা ।

রাতের বেলা ঘুমের সময় প্রাকৃতিক ডাক এলে – চড়াৎ করে উঠে যেমন টয়লেটে যেতে হয়, ঠিক সেই ভাবে কাজ টা মাখনের মত হয় ।

আবার যদি একটা পাঁচশো বা হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দ্যান, তবে গড়িমসি ভাবটা আর থাকে না ।
তবে এগুলো ব্যতিক্রম । ওই কেজো ব্যাপার ।

আমাদের জীবন টেবিলে, প্রত্যেকের ড্রয়ারে দুটো করে ড্রয়ার থাকে ।

একটা এখন নয়, আরেকটা কখনও নয় । একটা কিছু কাজ এলে – সেটা চট্ করে এখন নয় – ড্রয়ারে চলে যাবে ।
তারপর যখন জরুরী কাজটা মনে পড়বে, তখন সেকি দাঁত কিড়মিড়্ । তরকারি লবণ পোড়া হলেও কেন লবণ হয় নি বলে – গিন্নীকে চোপা ।
আর যদি কাজটা জরুরী না হয় তবে- কখনও নয় ড্রয়ারে অসূর্যম্পশ্যার মত পড়ে থাকবে ।
আমি একজনকে চিনি, যে এই সব গড়িমসিতে সিদ্ধ হস্ত ।

ভোরবেলা হাওড়া থেকে ট্রেন ছাড়বে – সে শুয়েই আছে । জিজ্ঞেস করলে বলেছিল – ট্রেনের ড্রাইভারকে বলা আছে, দেরী করে ছাড়বে ট্রেন ।
আমার এক ওপরওয়ালা – কি সব ছক টক কেটে বুঝিয়েছিল, কি করে সময় বাঁচাতে হয় । চব্বিশ ঘন্টা টাকে তো আর টেনে বাড়ানো যাবে না !

তাই টেলিফোনে যতটা সম্ভব কম কথা বলো, আগের কাজ আগে করো ফলানা – ঢেকানা ।
তিনি নাকি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধবাবুকে ডু ইট নাও স্লোগানটা শিখেয়েছিলেন বলে দাবী করতেন ।
আমি কোনো রকমে এক চোখ বন্ধ করে আর এক চোখ হাপ খুলে বলেছিলুম – আপনি ময়াই বাঙালি কুলের কলঙ্ক । ওসব কেতাবে লেখা থাকে – বাস্তব জীবনে হয় না ।
-------
জীবন মানেই – গড়িমসি ।

===============
পুঃ - পুলিশদের গড়িমসির ব্যাপারটার কথা বললাম না । মিত্র তালিকায় কয়েকজন আছেন আর আমার ঘাড়ে একটাই মাথা ।
:'(

Sunday, May 1, 2016

উহ্যনাম পণ্ডিত


মে মাসের আজ দুই তারিখ, ভোরের দিকেও শরীরটা ঘেমে যায় গরমে  । বৃষ্টি খালি আসবো আসবো করেও আসছে না ।
ভোর ৫ টা নাগাদ চলে গেলাম হরির দোকানে ।

গলির ঢোকার মুখটাতে, কালভার্ট নতুন করে তৈরি হয়েছে- হরির দোকান ঘেঁসে । একটা ক্রংকিটের স্ল্যাব জোগাড় করে, তার নীচে ইট দিয়ে, দোকানের সামনে বসার জায়গা তৈরি করেছে হরি ।

ষ্টোভে সাঁ সাঁ করে জল ফুটছে । এখনও সে রকম চাতাল রা আসে নি ।

নাগের বাজারের দিক থেকে রিক্সা করে এসে, একজন নামলেন, দোকানের সামনে ।
সায়েবী পোষাক পরণে, তবে পুরোনো ধাঁচের । কলারটা উঁচু আর সেই কলারে বাঁধা আছে মোটা টাই । চোখে সেই আদ্যিকালের গোল গোল চশমা । বেশ রাজপুত্তুর টাইপ চেহারা ।

বসার জায়গা দেবেন প্লিজ ! অনুরোধ করলেন - রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে । স্বরটা মনে হলো ব্যারিটোন ভয়েস ।

সরে গিয়ে বসার জায়গা করে দিলাম । ভদ্রলোকের চেহারাটা বড়ই পরিচিত তবে ঠিক কোথায় দেখেছি- মনে করতে পারছি না !

ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম- স্যার ! ( সম্ভাষণটা আপনা আপনি চলে এলো মুখে) আপনাকে তো এই পাড়ায় দেখিনি ! নতুন এলেন বুঝি ?

নাহে ! আমি ঘুরে ঘুরেই বেড়াই আজকাল । থাকি একটা অজানা জায়গায়, তবে মাঝে মাঝে আসি কোলকাতায় ।

বুঝলাম না স্যার !

সাগর যেথা লুটিয়ে পড়ে নতুন মেঘের দেশে
আকাশ-ধোয়া নীল যেখানে সাগর জলে মেশে।
মেঘের শিশু ঘুমায় সেথা আকাশ-দোলায় শুয়ে-
ভোরের রবি জাগায় তারে সোনার কাঠি ছুঁয়ে।
এই হলো আমার দেশ ।

কবিতাটা বেশ চেনা চেনা লাগছে, তা স্যার, আপনার নামটা ?

উহ্যনাম পণ্ডিত !

নামটা উহ্য আবার পণ্ডিত ? আমার মুখটা হাঁ হয়েই রইল ।

হেসে আবার পদ্য আউড়ালেন :-

এক যে রাজা”–”থাম্ না দাদা,
রাজা নয় সে, রাজ পেয়াদা৷
তার যে মাতুল”–”মাতুল কি সে?—
সবাই জানে সে তার পিশে
তার ছিল এক ছাগল ছানা”—
ছাগলের কি গজায় ডানা?”
একদিন তার ছাতের পরে”—
ছাত কোথা হে টিনের ঘরে?”
বাগানের এক উড়ে মালী”—
মালী নয়তো! মেহের আলী৷
মনের সাধে গাইছে বেহাগ”—
বেহাগ তো নয়! বসন্ত রাগ৷

আমাকে ছাগল বললেন ? রাগই হলো আমার ।

উদাত্ত হেসে বললেন :- তোমাকে ছাগল বলবো কেন হে ? যে যা, সেটা কখনও বলতে নেই শাস্তরে মানা আছে ।

মুখটা গোমড়া হলো আমার ।

একি ! ওমনি গোমড়া থেরিয়াম হয়ে গেল ? হরি ! চা দাও এই বাবুকে । হরির চা খাও, তবেই মাথা খুলবে, বোয়েচ ?

গোমড়া থেড়িয়াম ? এটা আমার খুব চেনা ! সুকুমার রায়ের লেখা !

হ্যাঁ হ্যাঁ ! ওই ঢ্যাঙ্গা মাণিকের বাবা সুকুমার রায় ।

ঢ্যাঙ্গা মাণিক ?

আরে, তোমাদের সত্যজিৎ রায় ! ওই যে কমলবাবু ছিলেন না, সাউথ পয়েন্টের শিক্ষক, তিনি ওই নামেই ডাকতেন মাণিককে । আজ তো ওর জন্মদিন ।


 সেটা জানা, তবে-কমল বাবু মানে, কমলকুমার মজুদার ?

হ্যাঁ রে বাবা ! সাউথ পয়েন্টে ছোট ক্লাসে ক্রাফ্ট পড়াতেন ।

আপনি এত জানলেন কি করে ?

জানার কথা নয়, তবে জেনেছি । মাণিকের তিন বছরের বয়সেই তো আমি গড়পার পার !

হ্যাঁ, সুকুমার রায় সত্যজিৎ বাবুর তিন বছর বয়সেই মারা গেছিলেন, সেটা শুনেছি !

আপনি সুকুমার রায়ের বন্ধু ছিলেন বুঝি ?

বন্ধু কি হে ? একেবারে হরিহর আত্মা । সুকুমারই তো উহ্য হয়ে গেছিল ।

কেন স্যার ?

হুঁকোমুখো হ্যাংলা
বাড়ী তার বাংলা, মুখে তার হাসি নাই, দেখেছ ?
নাই তার মানে কি ?
কেউ তাহা জানে কি ? কেউ কভু তার কাছে থেকেছ ?

ওঃ ! কিছুই বুঝতে পারছি না ।

বুঝবেও না ! তোমার ,মাথায় খালি ক্রংকিট ।

মাণিকের জন্যই আজ এলাম । সেই ছোট্ট বেলায় দেখেছি – তারপর তো বড় নাম করেছিল ।
বলেন কি, শুধু নাম ? একেবারে অস্কার এনে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ।
 জানি হে জানি ! ওসব আর বোলো না । বাবার কাছে, বাপের বাড়ীর গপ্পো । বলি- প্রফেসর শঙ্কু কে জানো ?

উনি তো একজন বিজ্ঞানী
ধ্যাৎ, কিস্সু জানে না ! বলি নিধিরাম পাটকেলকে চেনো ? বা  প্রফেসর হেঁশোরাম হুঁশিয়ার?

হ্যাঁ হ্যাঁ একটু একটু নাম শুনেছি বটে ।

তুমি একটা গবেট ।

আজ্ঞে, আমার মা – বাবা বলতেন বটে ।
ঠিকই বলতেন । যাগ্গে – শোনো ! নিধিরাম পাটকেলের মহা এক আবিষ্কার ছিল গন্ধবিকট তেল। এই তেল মাখিয়ে দিলে গোঁফ বড় হয়ে যায়। এক ভদ্রলোক ভুল করে নিজের ছেলেকে এই তেল মাখিয়ে দেওয়ায় বিরাট গোঁফ বেরিয়ে গিয়ে এক বিতিকেচ্ছিরিয়াস ব্যাপার! প্রফেসর শঙ্কু সেই সব দেখেই শিখেছিল ।

মাণিকের ছোট বেলায় আমি তাকে গন্ধবিকট তেল লাগিয়েছিলাম । তারপরে ওর গোঁফ গজায় নি বটে, তবে প্রফেসর শঙ্কুর সঙ্গে তার দেখা হয় গিরিডিতে ।
সেখানেই তাঁর গবেষণাগার। আর বাড়িতে তাঁর সঙ্গী সেই নিউটন নামের বিড়ালটা আর চাকর প্রহ্লাদ। এ ছাড়া দুজন সঙ্গী বিভিন্ন সময় ছিলেন শঙ্কুর সঙ্গেঅবিনাশ বাবু ও নকুড় বাবু। শঙ্কুর খ্যাতি বিশ্বজোড়া।

তাঁর লেখা বের হয় বিশ্বের নামকরা সব বিজ্ঞান পত্রিকায়। তাঁকে সম্মান দেয় আন্তর্জাতিক সায়েন্স কংগ্রেস। তাঁর বিদেশি বন্ধুরাও সব নামকরা বিজ্ঞানী। সমস্যার সমাধান করতে শঙ্কু জলের তলে, মঙ্গল গ্রহে, পাহাড়ের চূড়ায় ঘুরে বেড়ান। শঙ্কুর আবিষ্কারগুলোও সব জবরদস্তঅ্যানাইহিলিন বন্দুক, মিরাকিউরল, নার্ভিগার, অম্নিস্কোপ, স্নাফগান, ম্যাঙ্গোরেঞ্জ, ক্যামেরাপিড, লিঙ্গুয়াগ্রাফ! তাঁর আবিষ্কার করা রোবুকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড়।

তবে, তারক চাটুজ্জে  ওই ডায়েরীগুলো এনে দিয়েছিল মাণিককে । উল্কার গর্তের মধ্যে লাল খাতাটা তো তারক চাটুজ্জেই খুঁজে পেয়েছিল। টানাটানি যাচ্ছিল বলে মাত্র কুড়িটা টাকার বিনিময়ে খাতাটা হাত ফেরতা করেছিল। খাতাটা অদ্ভুত! পাতা ছেঁড়ে না, লেখার কালি ঘন্টায় ঘন্টায় রং বদলায়। আগুনে পোড়ে না! যে খাতাটা অবিনশ্বর মনে হয়েছিল, শেষে কিনা বুভুক্ষু ডেঁয়ো পিঁপড়েরা খেয়ে ফ্যালে!!!!!! তা খোঁজ খবর করে,পরে আরও একুশটা খাতা/ডায়েরী হাতে আসে, তিলুরই লেখা। না হলে কি যে হতো!!!!
আগ্গে – তিলু কে ?
তুমি তো মহামূর্খ
তা বটে স্যার
গিরিডির ধন্বন্তরী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক, ত্রিপুরেশ্বর বাবুর একমাত্র এই ছেলেটা; গিরিডির ইস্কুল থেকে মাত্র বারো বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাস করে। তারপর চোদ্দোতে, আই.এস-সি আর ষোলোয় ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতে ডাবল অনার্স নিয়ে বি.এস-সি। এক কথায় ব্রিলিয়ান্ট!!!!!!!জীবনে সেকেন্ড হয় নি কোনো পরীক্ষায়। আবার বিশ বছর বয়সে কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজে অধ্যাপক!

তোমাকে আর এসব বলে কি হবে ? নেহাত আজ মাণিকের জন্মদিন – তাই এসব কথা মনে পড়লো । চলি হে !





একটা রিক্সা ডেকে পদ্য আউড়াতে আউড়াতে চলে গেলেন :-

এইত সে দুপ'রে
'সে ওই উপরে, খাচ্ছিল কাঁচকলা চট্‌‌কে-
ওর মাঝে হল কি ?
মামা তার মোলো কি ? অথবা কি ঠ্যাং গেল মট্‌‌কে ?
হুঁকোমুখো হেঁকে কয়,
আরে দূর, তা তো নয়, দেখ্‌ছ না কি রকম চিন্তা ?
মাছি মারা ফন্দি এ,
যত ভাবি মন দিয়ে, ভেবে ভেবে কেটে যায় দিনটা।

++++++++++++++++

ভেবেই পেলাম না- ভদ্রলোক কে?

Sunday, April 24, 2016

হউ


হউ - শব্দটা একটি ওডিয়া লব্জ । এর কাছাকাছি অর্থ বাংলাতে করলে দাঁড়ায় – আচ্ছা বা বেশ ।
পুরী বাঙালিদের কাছে বেড়ানোর জায়গা । রথদেখা – কলাবেচা দুটোই হয় । জগন্নাথকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় – চক্কাডোলা । মানে হলো গিয়ে – চাকার মত গোল চোখ ।
আমি ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পুরীতে বেচুবাবুর কাজ করেছি – দুটো ওষুধ কোম্পানির হয়ে ।
প্রথমটা – জার্মান রেমেডিস, পরে সারাভাই কেমিক্যালস । অবশ্য দুটো কোম্পানির ক্ষেত্রেই কটকঅ শহরঅ, বড় মনোহরঅ ছিল আমার হেডকোয়ার্টার ।
পুরী, বড় জেলা হওয়াতে ন্যূনতম সাতদিন কাজ করতে হতো সমস্ত জেলার কিছু বাছা অংশে । সেলও ভালো ছিল ওই জেলায় ।
থাকার জন্য – ছিল ইউনিয়েনের রেষ্টহাউস । রাঁধিয়ে ছিল – নীরঅ । চমৎকার রান্না করতো । যে বাড়ীতে রেস্ট হাউস ছিল- তার নাম ছিল – অক্ষয় ধাম ।
সব মিলিয়ে দুটো বড় বড় ঘর রেষ্টহাউসে । খাটা পায়খানা । পরিবারকে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো না, তবে পরের ঘরটা প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকতো বলে আমরা রেভিনিউ তোলার জন্য – ছেড়ে দিতাম একটা ঘর ।
রেষ্ট হাউসে মদ খাওয়া বারণ । আমরা কেউই নিয়ম ভাঙতাম না । খেতে ইচ্ছে হলে চেনা শোনা হোটেলে একটা ঘরে ম্যানেজ করে টাংকু টানা চলতো ।
বেরিয়ে আসার সময় ম্যানেজার আর বয়দের একটা ভালো রকম বখশিস দিতাম আমরা, খাবারের দাম সহ ।
তবে টাংকু হিসেবে আমাদের বিয়ারটাই বেশী পছন্দ ছিল – কারণ তখন কোয়ালিটি কন্ট্রোলে পাশ না হওয়া বিয়ারের বোতলগুলো সেই কোম্পানির প্রতিনিধিরাই এনে দিতেন, কখনও পয়সা দিয়ে বা না দিয়ে ।
না না, গুণগত মান খারাপ ছিল না, তবে কোনো কোনো বোতলে ঠিকঠাক ফিলিং হতো না বলে, সেগুলো কোম্পানি ষ্টাফদের হয় মিনে মাগনায় বা অল্প কিছু টাকা নিয়ে বিলিয়ে দিতো কোম্পানি ।
পরিভাষায়, এদের নাম ছিল – সেকেন্ডস্ । দাম প্রতি বোতল- দেড় টাকা ।
ঠিক সেই সময়েই প্রথম ফিল্টার সিগারেট লঞ্চ হয় উইলস কোম্পানিতে । নাম ছিল – ফিলটার উইলস্ । দাম ছিল – প্রতি প্যাকেট আশী পয়সা । একটা প্যাকেটে থাকতো দশটা সিগারেট স্টিক । সেই সময়ে – বেশ দামী সিগারেট ।
তখন ক্যাপস্টান সিগারেটে দেশী তামাক ব্যবহারের কারণে – গুণমান পড়ে গিয়েছিল, ফলে ঠিক আভিজাত্যটাও ছিল না সেই ব্র্যান্ডের । দামও কমে এসেছিল ।
পুরী মন্দিরের পেছনেই ছিল লক্ষ্মীবজার । এটা এখন আর নেই । যেমন নেই একটা বিশাল বটগাছ – পুরী মন্দিরে ঢোকার দরজায় ।
লক্ষ্মীবজারেই ছিল আইটিসির পুরী জেলার ডিষ্ট্রিবিউটার । এনার আসল পরিচয় ছিল – মন্দিরের নাম করা পণ্ডা, বাঙালি উচ্চারণে পাণ্ডা ।

এই কোম্পানি বাজার ধরার জন্য প্রত্যেক খরিদ্দারকেই এক প্যাকেট কিনলে আরেকটা প্যাকেট ফ্রি দিতেন সেই সময় – যদিও শতকরা নিরানব্বই কেসেই এই ফ্রিটা জুটতো না প্রান্তিক খরিদ্দারের ।
আরও একটা ব্যাপার ছিল – একটা প্যাকেটে যদি ৯ টা সিগারেট দৈবাৎ পাওয়া যেত, তবে দোকানে থাকা কোম্পানির ফর্ম ভর্তি করে বিক্রেতার সই ছপ্পর নিলেই , দিনকয়েকের মধ্যেই মিলতো মুফতে পাঁচ প্যাকেট সিগারেট ।
এই সবই জেনেছিলাম, কারণ ওই ডিস্ট্রিবিটারের আপন ভাই ছিলেন আমার কোম্পানির ডিষ্ট্রিবিটার । তাই সিগারেটটাও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রায় বিনে পয়সায় । বিয়ারও তাই ।
এঁদের দৌলতে প্রায়ই জগন্নাথ দেবের নিরামিষ ভোগ জুটতো লাঞ্চ হিসেবে । ষোলো রকম তরকারি আর সুগন্ধী আতপ চালের ভাত ।
ফুরফুরে সুগন্ধে ভরে উঠতো চারিদিক ।
এখন যেটা স্বর্গদ্বার সেটা আসলে শ্মশান । তারই পাশ দিয়ে আমাদের আসতে হতো রেষ্টহাউসে জনবিরল রাস্তা ধরে । উঁচু নিচু রাস্তার বাঁপাশে ছিল একটা আশ্রম আর ডান দিকে ছিল রেলের গেষ্ট হাউস ।
তাই, বেশী রাত করতাম না রেস্টহাউসে ফেরার সময়ে । সন্ধে সাতটার মধ্যেই শুনশান হয়ে যেত রাস্তাটা ।
রেষ্টহাউসের বাঁধা রিক্সাওয়ালা ছিল – বাঙালি রতন । সারা পুরীতে ঐ একটাই বাঙালি রিক্সাচালক ।
ভয় দেখাতো – নানা গল্প শুনিয়ে, ফলে বিশ্বাস না করলেও একটা শিরশিরে অনুভূতি তো থাকতোই । সবসময় সন্ধে সাতটার মধ্যে ফেরা হতো না, কারণ স্টেশনের কাছে কিছু ডাক্তারদের ভিজিট করে দেরীও হতো ।
আগেই বলেছি – মন্দিরের সামনে বটগাছ ছিল আর ছিল , একটা উঁচু মত জায়গা, যেখানে বেশ কিছু দোকান এবং ডঃ মহাদেব মিশ্রের চেম্বার ছিল ।
ভদ্রলোক ইংরেজিতে কথা বলা পছন্দ করতেন না, তবে ওডিয়া টানে বাংলা বলতেন আর আমাদের কথা বাংলাতেই শুনতেন ।
তবে, মেডিক্যাল টার্ম গুলো ইংরেজিতে না বলে উপায় ছিল না, আর বললে – তিনি কিছু মনেও করতেন না ।
পুরী শহরে, সেই সময়ে কুল্লে একটাই অভিজাত হোটেল ছিল, বোধহয় এখনও আছে ।
বি, এন, আর হোটেল নামেই তার পরিচিতি । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ে চালাতেন এই সরাইখানা ।
সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ের আগের নাম ছিল – বেঙল নাগপুর রেলওয়ে । সংক্ষেপে – বি. এন. আর ।
ঠাট্টা করে বলা হতো – বি নেভার রেগুলার ।
সময়ে নাকি কোনো ট্রেনই চলতো না । একবার দেখা গেল- একটি ট্রেন ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় ষ্টেশনে এসে দাঁড়ালো ।
আশ্চর্য হতেই – গার্ড সাহেব নাকি ভুল ভাঙিয়েছিলেন । এটা গতকালের ট্রেন, পাক্কা চব্বিশ ঘন্টা লেট । আজকের ট্রেনের কোনো পাত্তা নেই ।
আমি অবশ্য বি. এন. আরের ট্রেনে চড়িনি । তবে, বালেশ্বর, কটক, ভুবনেশ্বর, পুরী, ওয়ালটেয়ার ( বর্তমান ভাইজাগ )ওয়েটিং রুমে, বার্মা টিক কাঠের আলনা, চেয়ার, কাবার্ডে বি. এন. আর নামটা খোদাই করা দেখেছি ।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেলটি তৈরিই হয়েছিল – সায়েবদের জন্য । নিজস্ব সী বিচ আর নুলিয়াও ছিল হোটেলের ।
সেভেন কোর্স লাঞ্চ আর ডিনার ছিল – কি বিশেষণ বলি বলুন তো ? এককথায় মাইন্ড ব্লোয়িং ।
চিকেন আলা কিয়েভ – প্রথম এখেনেই খাই । ছুরি দিয়ে কাটলেই বেরিয়ে আসতো তরল সোনার মত মাখন । ওই স্বাদের “কোনো ভাগ হতো না । মাখনের সাথে মাংস গুলো ইসোফেগাস ধরে স্টমাকে চলে যেত কোনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছাড়াই ।
টেষ্ট বিড গুলো বুঁদ হয়ে থাকতো সেই স্বাদে । “ত্রিলোক তারিণী গঙ্গে, তরল তরঙ্গ রঙ্গে এ বিচিত্র উপত্যকা আলো করি করি চলেছ মা মহোল্লাসে!” ...
মাখনে মাংসে জিভ একেবারে “গলগলায়িত
শেষ পাতে আসতো – হিমালয়ান আইসক্রিম । আকৃতি এবং বপুতে একেবারে হিমালয় । পরতে পরতে তার অনেককিছু থাকতো ।নিজচোখে না দেখলে এই আইসক্রিমের রূপ- বর্ণণা দেয়া খুবই কঠিন। অনেকটা 'অন্ধের হস্তি' দর্শনের মতো।
ও হরি – বলাই হয় নি । আমাদের কোম্পানির মিটিং এখানে হতো মূলত আমাদের ম্যানেজারদের দৌলতে । এছাড়া পুরীর ডাক্তারদের মাঝে মাঝে এখানে খাওয়ানো হতো – কোম্পানি দের পয়সায় । আমাদেরটাও ব্যতিক্রম ছিল না ।
যা হয় আর কি – ম্যানেজার থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য কর্মীদের সাথে আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল সহজবোধ্য কারণেই । এছাড়া ওষুধপত্র তো ছিলই ।
১৯৭৪ সালে বিয়ে করে – এই হোটেলে মধুচন্দ্রিমা যাপন করবো ভেবেছিলাম, কিন্তু দামের কথা ভেবে পেছিয়ে আসি ।
জানতে পেরে -বন্ধুরা চাঁদা তুলে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল । এখানেই আমার একমাস বিয়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারতো ।
তবে সমুদ্রে সাঁতার কি ভাবে কাটতে হয়, সেটা শিখে যাবার ফলে, চুলের মুঠি ধরে ওনাকে জল থেকে তুলে নিয়েছিলাম – তাই ৪২ বছর ধরে বিবাহিত জীবন কাটাতে পারছি শৃঙ্খলিত অবস্থায় । সে সব দুঃখের কথা না হয় পরেই বলবো ।
দেখুন তো – কথায় কথায় আসল বিষয় থেকে সরে গেছি ।
ডঃ মহাদেব মিশ্র ভিজিটে কোনো স্যাম্পেল নিতেন না । তবে, মাসে বা দুমাসে একবার করে ক্যাম্প করতেন নুলিয়া এবং রিক্সাওয়ালাদের বস্তিতে । আমরাও সোৎসাহে অংশ গ্রহণ করতাম ।
সেবার এক জার্মান কোম্পানির ছেলে এলো পুরীতে । পাক্কা দর্জিপাড়ার নতুন দা । ফ্রম টপ টু টো – পুরো ক্যালকেসিয়ান ।
ধরা যাক, তার নাম অনুপ । অনুপ আমাকে জিজ্ঞেস করলো – দাদা আপনার কোলকাতায় বাড়ী কোথায় ?
গম্ভীর হয়ে বলেছিলাম – মেদিনীপুরের কাছেই । অনুপ উত্তর দিয়েছিল – আমি নর্থ কোলকাতার তো । সাউথটা আমার তেমন ঘোরা নেই । মেদিনীপুর, ভবানীপুরের কাছে বোধহয়, তাই না ?
এহেন অনুপ কে আমরা পইপই করে বলে দিয়েছিলাম – ডঃ মহাদেব মিশ্রের সাথে ইংরেজিতে কথা না বলতে । বাংলাতেই কাজ সারা যাবে । তোর যে কোনো দুটো প্রডাক্টের কথা বলে দিবি – ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে দেবেন ।
কিন্তু, ধর্ম কাহিনী কে কবে শুনেছে ?
চেম্বারে ঢুকেই বাও করে বলল – ডক্টর, আই অ্যাম ফ্রম -----
হউ
বেচারা অনুপ – ভাবল ওটা হাউ
উত্তরে বলল – কম্পানি হ্যাজ সেন্ট মি ওভার হিয়ার
হউ
বিকজ আই হ্যাভ বিন সিলেক্টেড টু ডু সো
হউ
এরকম “হউ কাণ্ড খানিক চলার পর ডঃ মিশ্র রেগে মেগে অনুপকে বেরিয়ে যেতে বললেন চেম্বার থেকে ।
তারপরের এপিসোড অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছিলাম আমরা ।
এর পরে অনুপকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলতো :- হউ ।
-----------------------

ইতি পুরী কাণ্ডে “হউ পর্বঃ সমাপ্তম