Powered By Blogger

Sunday, May 1, 2016

উহ্যনাম পণ্ডিত


মে মাসের আজ দুই তারিখ, ভোরের দিকেও শরীরটা ঘেমে যায় গরমে  । বৃষ্টি খালি আসবো আসবো করেও আসছে না ।
ভোর ৫ টা নাগাদ চলে গেলাম হরির দোকানে ।

গলির ঢোকার মুখটাতে, কালভার্ট নতুন করে তৈরি হয়েছে- হরির দোকান ঘেঁসে । একটা ক্রংকিটের স্ল্যাব জোগাড় করে, তার নীচে ইট দিয়ে, দোকানের সামনে বসার জায়গা তৈরি করেছে হরি ।

ষ্টোভে সাঁ সাঁ করে জল ফুটছে । এখনও সে রকম চাতাল রা আসে নি ।

নাগের বাজারের দিক থেকে রিক্সা করে এসে, একজন নামলেন, দোকানের সামনে ।
সায়েবী পোষাক পরণে, তবে পুরোনো ধাঁচের । কলারটা উঁচু আর সেই কলারে বাঁধা আছে মোটা টাই । চোখে সেই আদ্যিকালের গোল গোল চশমা । বেশ রাজপুত্তুর টাইপ চেহারা ।

বসার জায়গা দেবেন প্লিজ ! অনুরোধ করলেন - রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে । স্বরটা মনে হলো ব্যারিটোন ভয়েস ।

সরে গিয়ে বসার জায়গা করে দিলাম । ভদ্রলোকের চেহারাটা বড়ই পরিচিত তবে ঠিক কোথায় দেখেছি- মনে করতে পারছি না !

ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম- স্যার ! ( সম্ভাষণটা আপনা আপনি চলে এলো মুখে) আপনাকে তো এই পাড়ায় দেখিনি ! নতুন এলেন বুঝি ?

নাহে ! আমি ঘুরে ঘুরেই বেড়াই আজকাল । থাকি একটা অজানা জায়গায়, তবে মাঝে মাঝে আসি কোলকাতায় ।

বুঝলাম না স্যার !

সাগর যেথা লুটিয়ে পড়ে নতুন মেঘের দেশে
আকাশ-ধোয়া নীল যেখানে সাগর জলে মেশে।
মেঘের শিশু ঘুমায় সেথা আকাশ-দোলায় শুয়ে-
ভোরের রবি জাগায় তারে সোনার কাঠি ছুঁয়ে।
এই হলো আমার দেশ ।

কবিতাটা বেশ চেনা চেনা লাগছে, তা স্যার, আপনার নামটা ?

উহ্যনাম পণ্ডিত !

নামটা উহ্য আবার পণ্ডিত ? আমার মুখটা হাঁ হয়েই রইল ।

হেসে আবার পদ্য আউড়ালেন :-

এক যে রাজা”–”থাম্ না দাদা,
রাজা নয় সে, রাজ পেয়াদা৷
তার যে মাতুল”–”মাতুল কি সে?—
সবাই জানে সে তার পিশে
তার ছিল এক ছাগল ছানা”—
ছাগলের কি গজায় ডানা?”
একদিন তার ছাতের পরে”—
ছাত কোথা হে টিনের ঘরে?”
বাগানের এক উড়ে মালী”—
মালী নয়তো! মেহের আলী৷
মনের সাধে গাইছে বেহাগ”—
বেহাগ তো নয়! বসন্ত রাগ৷

আমাকে ছাগল বললেন ? রাগই হলো আমার ।

উদাত্ত হেসে বললেন :- তোমাকে ছাগল বলবো কেন হে ? যে যা, সেটা কখনও বলতে নেই শাস্তরে মানা আছে ।

মুখটা গোমড়া হলো আমার ।

একি ! ওমনি গোমড়া থেরিয়াম হয়ে গেল ? হরি ! চা দাও এই বাবুকে । হরির চা খাও, তবেই মাথা খুলবে, বোয়েচ ?

গোমড়া থেড়িয়াম ? এটা আমার খুব চেনা ! সুকুমার রায়ের লেখা !

হ্যাঁ হ্যাঁ ! ওই ঢ্যাঙ্গা মাণিকের বাবা সুকুমার রায় ।

ঢ্যাঙ্গা মাণিক ?

আরে, তোমাদের সত্যজিৎ রায় ! ওই যে কমলবাবু ছিলেন না, সাউথ পয়েন্টের শিক্ষক, তিনি ওই নামেই ডাকতেন মাণিককে । আজ তো ওর জন্মদিন ।


 সেটা জানা, তবে-কমল বাবু মানে, কমলকুমার মজুদার ?

হ্যাঁ রে বাবা ! সাউথ পয়েন্টে ছোট ক্লাসে ক্রাফ্ট পড়াতেন ।

আপনি এত জানলেন কি করে ?

জানার কথা নয়, তবে জেনেছি । মাণিকের তিন বছরের বয়সেই তো আমি গড়পার পার !

হ্যাঁ, সুকুমার রায় সত্যজিৎ বাবুর তিন বছর বয়সেই মারা গেছিলেন, সেটা শুনেছি !

আপনি সুকুমার রায়ের বন্ধু ছিলেন বুঝি ?

বন্ধু কি হে ? একেবারে হরিহর আত্মা । সুকুমারই তো উহ্য হয়ে গেছিল ।

কেন স্যার ?

হুঁকোমুখো হ্যাংলা
বাড়ী তার বাংলা, মুখে তার হাসি নাই, দেখেছ ?
নাই তার মানে কি ?
কেউ তাহা জানে কি ? কেউ কভু তার কাছে থেকেছ ?

ওঃ ! কিছুই বুঝতে পারছি না ।

বুঝবেও না ! তোমার ,মাথায় খালি ক্রংকিট ।

মাণিকের জন্যই আজ এলাম । সেই ছোট্ট বেলায় দেখেছি – তারপর তো বড় নাম করেছিল ।
বলেন কি, শুধু নাম ? একেবারে অস্কার এনে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ।
 জানি হে জানি ! ওসব আর বোলো না । বাবার কাছে, বাপের বাড়ীর গপ্পো । বলি- প্রফেসর শঙ্কু কে জানো ?

উনি তো একজন বিজ্ঞানী
ধ্যাৎ, কিস্সু জানে না ! বলি নিধিরাম পাটকেলকে চেনো ? বা  প্রফেসর হেঁশোরাম হুঁশিয়ার?

হ্যাঁ হ্যাঁ একটু একটু নাম শুনেছি বটে ।

তুমি একটা গবেট ।

আজ্ঞে, আমার মা – বাবা বলতেন বটে ।
ঠিকই বলতেন । যাগ্গে – শোনো ! নিধিরাম পাটকেলের মহা এক আবিষ্কার ছিল গন্ধবিকট তেল। এই তেল মাখিয়ে দিলে গোঁফ বড় হয়ে যায়। এক ভদ্রলোক ভুল করে নিজের ছেলেকে এই তেল মাখিয়ে দেওয়ায় বিরাট গোঁফ বেরিয়ে গিয়ে এক বিতিকেচ্ছিরিয়াস ব্যাপার! প্রফেসর শঙ্কু সেই সব দেখেই শিখেছিল ।

মাণিকের ছোট বেলায় আমি তাকে গন্ধবিকট তেল লাগিয়েছিলাম । তারপরে ওর গোঁফ গজায় নি বটে, তবে প্রফেসর শঙ্কুর সঙ্গে তার দেখা হয় গিরিডিতে ।
সেখানেই তাঁর গবেষণাগার। আর বাড়িতে তাঁর সঙ্গী সেই নিউটন নামের বিড়ালটা আর চাকর প্রহ্লাদ। এ ছাড়া দুজন সঙ্গী বিভিন্ন সময় ছিলেন শঙ্কুর সঙ্গেঅবিনাশ বাবু ও নকুড় বাবু। শঙ্কুর খ্যাতি বিশ্বজোড়া।

তাঁর লেখা বের হয় বিশ্বের নামকরা সব বিজ্ঞান পত্রিকায়। তাঁকে সম্মান দেয় আন্তর্জাতিক সায়েন্স কংগ্রেস। তাঁর বিদেশি বন্ধুরাও সব নামকরা বিজ্ঞানী। সমস্যার সমাধান করতে শঙ্কু জলের তলে, মঙ্গল গ্রহে, পাহাড়ের চূড়ায় ঘুরে বেড়ান। শঙ্কুর আবিষ্কারগুলোও সব জবরদস্তঅ্যানাইহিলিন বন্দুক, মিরাকিউরল, নার্ভিগার, অম্নিস্কোপ, স্নাফগান, ম্যাঙ্গোরেঞ্জ, ক্যামেরাপিড, লিঙ্গুয়াগ্রাফ! তাঁর আবিষ্কার করা রোবুকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড়।

তবে, তারক চাটুজ্জে  ওই ডায়েরীগুলো এনে দিয়েছিল মাণিককে । উল্কার গর্তের মধ্যে লাল খাতাটা তো তারক চাটুজ্জেই খুঁজে পেয়েছিল। টানাটানি যাচ্ছিল বলে মাত্র কুড়িটা টাকার বিনিময়ে খাতাটা হাত ফেরতা করেছিল। খাতাটা অদ্ভুত! পাতা ছেঁড়ে না, লেখার কালি ঘন্টায় ঘন্টায় রং বদলায়। আগুনে পোড়ে না! যে খাতাটা অবিনশ্বর মনে হয়েছিল, শেষে কিনা বুভুক্ষু ডেঁয়ো পিঁপড়েরা খেয়ে ফ্যালে!!!!!! তা খোঁজ খবর করে,পরে আরও একুশটা খাতা/ডায়েরী হাতে আসে, তিলুরই লেখা। না হলে কি যে হতো!!!!
আগ্গে – তিলু কে ?
তুমি তো মহামূর্খ
তা বটে স্যার
গিরিডির ধন্বন্তরী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক, ত্রিপুরেশ্বর বাবুর একমাত্র এই ছেলেটা; গিরিডির ইস্কুল থেকে মাত্র বারো বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাস করে। তারপর চোদ্দোতে, আই.এস-সি আর ষোলোয় ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতে ডাবল অনার্স নিয়ে বি.এস-সি। এক কথায় ব্রিলিয়ান্ট!!!!!!!জীবনে সেকেন্ড হয় নি কোনো পরীক্ষায়। আবার বিশ বছর বয়সে কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজে অধ্যাপক!

তোমাকে আর এসব বলে কি হবে ? নেহাত আজ মাণিকের জন্মদিন – তাই এসব কথা মনে পড়লো । চলি হে !





একটা রিক্সা ডেকে পদ্য আউড়াতে আউড়াতে চলে গেলেন :-

এইত সে দুপ'রে
'সে ওই উপরে, খাচ্ছিল কাঁচকলা চট্‌‌কে-
ওর মাঝে হল কি ?
মামা তার মোলো কি ? অথবা কি ঠ্যাং গেল মট্‌‌কে ?
হুঁকোমুখো হেঁকে কয়,
আরে দূর, তা তো নয়, দেখ্‌ছ না কি রকম চিন্তা ?
মাছি মারা ফন্দি এ,
যত ভাবি মন দিয়ে, ভেবে ভেবে কেটে যায় দিনটা।

++++++++++++++++

ভেবেই পেলাম না- ভদ্রলোক কে?

No comments:

Post a Comment