আগে ঘড়ির বিজ্ঞাপনে, এই সময়টাই দেখানো হতো । রাত না দিন – বোঝার উপায় নেই, তবে জনশ্রুতি আম্রিগার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে নাকি রাত দশটা দশে গুলি করে খুন করা হয়েছিল, তাই এই সময়টা দেওয়া হতো ।
সত্যিটা হলো -লিংকন সাহেবকে গুলি করা হয়েছিল, রাত দশটা পনেরোতে আর তিনি মারা যান পরের দিন সকাল সাতটা বাইশে ।
পরে, আরও অনেক অন্য কাহিনী যোগ হয় – জন এফ কেনেডি, মার্টিন লুথার কিং ( জুনিয়ার) দের নিয়ে, কিন্তু কোনো সময়েই সেটা দশটা দশ ছিল না ।
কিন্তু, একবার জনশ্রুতি চালু হলে সেটা কি আর থেমে থাকে ? প্রচার হলো – এই সময়তে জাপানের হিরোশিমা বা নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল ।
আবার সেই ভুল । ফ্যাট ম্যান বোম্ব, হিরোসিমাতে ফেলা হয়েছিল, স্থানীয় সময় সকাল এগারটা দুইয়ে আর তার পরের দিন নাগাসাকিতে, লিটল বয় ফেলা হয়- স্থানীয় সময় সকাল আটটা পনেরোতে ।
মজাটা হলো- খেয়াল করলে দেখা যাবে, আম্রিগা এই ব্যাপারে কোনো না কোনো ভাবে জড়িয়ে আছে ।
আসলে, ঘড়ির কাঁটা গুলো যাতে ঠিকঠাক দেখা যায় বা কোম্পানির লোগো যাতে স্পষ্ট হয় – এটাই এর কারণ বলে ঘড়ি উৎপাদন কারী রা বলে থাকেন ।
কেউ কেউ আবার আটটা কুড়িও দেখান তাঁদের বিজ্ঞাপনে । তবে, এই সব নিয়ে প্রচুর মতভেদ আছে, সেটা নিয়ে লিখে আর হ্যাজাবো না ।
প্রথম “আমপাড়া” ঘড়ি যেটা দেখি – সেটা হলো একটা বুকপকেট ঘড়ি । বাবা, ৺ রামনারায়ণ ভট্টাচার্যের কাছে ।
বুকের চোরা পকেটে সেটা লুকিয়ে রাখা থাকতো । কোন কোম্পানির সেটা মনে নেই, তবে মাথার ওপর একটা “তাজ” য়ের মত ছিল । সেকেন্ডের কাঁটা ছিল অনুপস্থিত । পাশে ছিল – দম দেবার একটা গোলাকার দণ্ডের মত, এরও মাথায় একটা ছোট তাজ মত ছিল আর একটু বেরিয়ে থাকতো ঘড়ি থেকে ।
বেনারস যাবার সময় বাবা একবার সময় দেখতে গেলে সেটা একজন ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় বিহারের এক স্টেশনে থেমে থাকা ট্রেনের খোলা গারদ হীন জানলা দিয়ে । বাবা ছিনতাইকারীর হাত চেপে ধরেছিলেন বজ্রমুষ্ঠিতে, কিন্তু আরেকজন এসে বাবার হাতে লাঠির মার মারাতে সেটা নিয়ে চলে যায় – ছিনতাইকারী । ট্রেনও ছেড়ে দেয় ।
সারা ট্রেন ধরে বাবা হায় হায় করলেও, ঘড়ি ছিল বেপাত্তা ।
বেনারসে নেমেই বাবা চলে যান কাকাকে নিয়ে গোধুলিয়া মোড়ে । তখন হাতঘড়ি চলে এসেছে বাজারে, তবে ব্যাণ্ডটা চামড়ার ।
সবাই বোঝালো – এটা গরুর চামড়া । একটু থমকালেও পরে বাবা বলেছিলেন – জুতোগুলোও তো গরুর চামড়ার, তাহলে ব্যাণ্ড আর কি দোষ করলো ?
আরও পরে যখন স্টিলের ব্যাণ্ড আসে, তখন প্রথম সুযোগেই বাবা স্টিলের ব্যাণ্ড পরিয়ে নিয়েছিলেন – সেই “জেনেক্স” ঘড়িতে । সেটা অবশ্যই সুইস্ ঘড়ি ছিল ।
বাবা একটা টেবল ক্লকও কিনেছিলেন – নাম ছিল, “সাইমা” । সেকেন্ডের কাঁটাও ছিল তবে দুটো প্রধান কাঁটা ছিল – ফসফরাস মাখানো, যাতে রাতের অন্ধকারেও সময় দেখা যায় ।
ঘড়ি পরার বয়স হলো – তখন দেখি, বাজারে হরেক কিসিম ঘড়ি । অ্যাঙলো সুইস থেকে হেনরী স্যান্ডোজ । রোলেক্স তখন ধরা ছোঁওয়ার বাইরে ।
বাজারে এলো – এইচ. এম.টি । কত রকমের মডেল । পাইলট থেকে শুরু করে আপ্পু । পার্ক স্ট্রিটে ঢুকতেই ডান দিকে একটা দোকান ছিল - সেই দোকানে লাইন দিয়ে কিনেছিলাম পাইলট ঘড়ি ।
বিয়েতে শ্বশুর মশাই দিয়েছিলেন – অটোম্যাটিক এইচ. এম.টি ঘড়ি । দম দেওয়ার বালাই ছিল না, খালি পরে থাকলেই হতো- তাতে নাকি স্বয়ংক্রিয় ভাবে দম দেওয়া হয়ে যেত । সেটা আছে এখনও অচল অবস্থায় ।
পরে এরা কোয়ার্টজ ঘড়িও আনে তবে কিনতে হয় নি । আমার কোম্পানি সবার সাথে আমাকেও একটা উপহার দিয়েছিল আর সেটা এখনও আমি হাতে পরি ।
শ্বশুর বাড়ী কোচবিহারে দেখি – এক ওয়াল ক্লক । ঘন্টায় ঘন্টায় বাজতো আর সপ্তাহে একদিন দম দিতে হতো । পেন্ডুলাম দুলতো ।
ঘড়িটা প্রায় একশোরও বেশী বয়েসি , তবে চালু ।কিন্তু আর ঘন্টাটা বাজে না ।
পঁচিশ – ত্রিশ বছর আগে, ইংরেজী স্টেটসম্যান পত্রিকায় একবার পড়েছিলাম-
এক ভদ্রলোক রোলেক্স ঘড়ি পেয়েছিলেন পৈত্রিক সূত্রে । কতবার যে হাত থেকে পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই । একবার নাকি জলের চৌবাচ্চায় ডুবে ছিল তিনদিন ধরে । পরে মনে পড়াতে জল থেকে তুলে দম দিতেই ঘড়িটা স্বাভাবিক ।
কোনোভাবে জানতে পেরে – রোলেক্স কোম্পানির প্রতিনিধি এসে ঘড়িটা ভালো দাম দিয়ে কিনে নিতে চান আর সাথে নতুন মডেলের একটা রোলেক্স ঘড়ি ।
তারা এও বলে – এই ঘড়ি আর পাওয়া যায় না, তাই তারা ওনার বাবার নাম সহ কোম্পানির সংগ্রহশালায় রেখে দেবে ।
ভদ্রলোক দিয়েই দেন ঘড়িটা- এই ভেবে যে বাবার নামটা অন্তত থাকবে এবং নগদ প্রাপ্তি ছাড়াও একটা নতুন ঘড়ি পাবেন- এই লোভে ।
একদিন পরে – ঘড়িটা অনধাবনতা বশত চৌবাচ্চার জলে পড়ে যায় । সঙ্গে সঙ্গে তুললেও – ঘড়ি আর চলে নি ।
--------------
পু:- বাবা মারা যান ১৯৮৬ সালের ১২ ই ডিসেম্বর ভোর সাড়ে পাঁচটায় । সাইমা টেবল ঘড়িটা ঠিক সেই সময়েই বন্ধ হয় ।
অনেক চেস্টা করেছি সারাতে, ঠিক হয় নি । একটা কাগজের বাক্সে রাখা আছে সেটা ।

No comments:
Post a Comment