Powered By Blogger

Wednesday, September 20, 2017

বং- আং, চিং, ফেং, ইং !




না, না- কোনো সোমসকিত নয়, পূজোরও মন্তর নয় ! ওই যে !! আজকাল সব সংক্ষেপে সারে না ? সেটাই !

বং মানেটা বলতে হবে না আশা করি ! এই বং রা আজকাল আন্তর্জাতিক হয়েছে । মানে, বংদের জিভে এখন মাল্টি কুইজিনের সহাবস্থান ।

ইডলি- ধোসা- সাম্বার বঢ়া থেকে শুরু করে- হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ, চিলি চিকেন, চিকেন আলা কিয়েভ, এরকম আরও কত ।

মিষ্টিতে –লাড্ডু, কাজু বরফি, কেক, পেষ্ট্রী ।
তাই বং আজ আং- মানে আর্ন্তজাতিক । তবে, গুর্মেরা ( খাদ্য- রসিক) বলেন এই পিথিবিতে নাকি কুল্লে তিনরকম রান্না ।

চিং – চাইনিজ
ফেং- ফ্রেঞ্চ
ইং- ইণ্ডিয়ান

আমার গুরুদেব ( আমি একলব্য শিষ্য), মুজতবা সাহেব বলতেন :- ইংরেজরা খাওয়ার ব্যাপারে হটেনটট ! পুরো রান্না ঘরটাই খাবার টেবিলে তুলে নিয়ে আসে । সব আধা সেদ্ধ ।

আরো বলেছেন :- এক ইংরেজ গেছে ফ্রান্সের এক রেষ্টুরেন্টে ! ভাষা না জানার জন্য,মেনুর মধ্যিখানে হাত দেখালো- এলো সুপ ।
আরও, ১০ টা পদ নীচে হাত দেখিয়ে ওয়েটারকে ইশারায় বলল: এইটা !
এলো আর এক রকম স্যুপ।

গুরুদেব বলছেন :- বেচারা হটেনটট ইংরেজ জানবে কি করে, ফ্রেঞ্চ মেনুর প্রথমেই ৬০ রকম স্যুপ থাকে ।

তা, বেচারা ইংরেজ শেষের থেকে ৩ ধাপ ওপরে হাত দেখাল । এলো খড়কে !

বং- জাত খাইয়ে বলে এরকম আহাম্মুকি করবে না !
তবে, হ্যাঁ ! গ্রীকরা নাকি, বং দের সঙ্গে এই ব্যাপারে টক্কর দিতে পারে । প্রবাদ আছে, গ্রীসে গেলে নাকি বেল্টের সাইজ বাড়িয়ে নিয়ে যেতে হয় ।
আর ইয়াংকিদের তো সব ব্যাপারেই “ World’s Greatest” । এক বন্ধুবর এই রকম আ্যডের খপ্পরে পড়ে , কফি খেয়েছিল । “ World’s Greatest” কফি! এক চুমুক দিয়েই- ওয়াক্ থুঃ। হাওড়া- শেয়ালদার ষ্টেশনের থেকেও বাজে কফি !!!!!!! ( এটা আমার পরোক্ষ অভিজ্ঞতা, যাঁরা থাকেন ওখানে, তাঁরাই বরং ভালো বলতে পারবেন !!!! )

আমার এক তালেবর বন্ধু আছেন । খাওয়ার ব্যাপারে তিনি খলিফা লোক ! চাইনীজ যে রান্না এই কোলকাতায় পাওয়া যায়, সেটার সাথে নাকি পাঞ্জাবী রেসিপি যুক্ত হয়েছে বলে তার বিশেষজ্ঞের মতামত ।

আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু – রূপঙ্কর সরকার, একবার আমার এই সব লেখায় মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছিলেন :-

এখন নাকি বিদেশে পাতি চিং এর বদলে ইংচিং-এর কদর বেশি। ইংচিং হল, চাইনিজ কুক্‌ড ইন ইন্ডিয়ান ফ্যাশন। আসল চিনে রান্না চিনেরা ছাড়া কেউ খেতে পারবেনা, আমরা ছোটবেলায় মাঝে মধ্যে খেয়েছি, ভাল লেগেছে, এমন সার্টিফিকেট মোটেই দেবনা।

তার পর নানা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গিয়ে কোলকাতার চিনেরা এক নতুন ফিউশন আবিষ্কার করল বাঙালিদের জন্য। সেটারই এখন সারা বিশ্বে জয়জয়কার। তবে যদিও ওরা বলে 'ইন্ডিয়ান ফ্যাশন', ভারতের আর কোনও শহরে কোলকাতার মত চিনে রান্না পাবেননা। বোম্বেরটাও ভাল তবে আমাদের মত নয় (কর্পোরেশনের জলের গুণ)। আর ফ্রেঞ্চরা সাহেবদের খেতে শিখিয়েছে, এটা তো সত্যি।

ইংরিজি ভাষা যে অ্যাংলো স্যক্সন ও অ্যাংলো নর্মান ভাষা থেকে এসেছে, সেখানে 'অক্স' শব্দটা স্যক্সন, আর 'বীফ'টা নর্মান। আবার 'ডিয়ার'টা স্যক্সন কিন্তু 'ভেনিসন' টা নর্মান। ইউরোপে রান্না বান্না ফ্রেঞ্চরা অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে। এবার আবার ইংচিং-এ ফিরি। ছেলেবেলায় এক ধরণের জাপানী নুড্‌লস খেতাম, এখন আর পাওয়া যায়না। সেগুলোর টেস্ট আমার চিনেদের থেকে অনেক ভাল লাগত।
আসল চাইনীজ খেতে গেলে যেতে হবে, চায়না টাউনে । সেখানেও ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে আপনাকে। তাহলে গিয়ে, আপনি পাবেন লক্ষী বাবুর আসলি সোনা – চাঁদি!
ক্ষী ক্ষাণ্ড !
আবার চাইনীজ খাওয়ারও শাস্ত্রীয় বিধান আছে ! পোত্থমে- এমনি এমনি তিন/ চার চামচ খেতে হবে সব আইটেম । তারপর গিয়ে, ওই সব সস- টস দিয়ে খাওয়া ইষ্টার্ট !
এবারে, থাই খাবারের কথাও বলতে হবে । এরা সুগন্ধিযুক্ত, মশলাদার খাবার বানান । গানে যেমন, হারমনি থাকে, সেইরকম ভাবেই প্রত্যেকটা রান্নায় উঁচু, নীচু স্কেলে তেতো, ঝাল, টক, লবণ সব দিয়ে এক অপূর্ব সিম্ফনি । যেন সিল্কের শাড়ীর পাড়ে ফ্লোরাল মোটিফ ।
এবারে দ্যাখা যাক ফেং বা ফ্রেঞ্চ খাবার । এটা বলা হয়:- "The Italians civilized all of Europe and it is they, without a doubt, who taught us how to eat. . . . For more than two centuries the French have enjoyed good cooking, but rest assured, dishes have never been as delicate, as expertly prepared, or better tasting, than they are today."
ইটালিয়ানরা নাকি সমস্ত ইউরোপকে সভ্য বানিয়েছে । তাই ফ্রেঞ্চ রান্না এত সোয়াদের ! মোদ্দা কথা হল এটি ।
সে যাক! পনির আর ওয়াইন হল এই সমস্ত ফ্রেঞ্চ খাবারের সুর ।ফরাসি আঞ্চলিক রন্ধনপ্রণালী চরম বৈচিত্র্যপূর্ণ । এ যেন আমাদের বংদের তাঁতের শাড়ীর হরেক কিসিম।
তবে, এখন কোলকেতায় জাঙ্ক ফুডের রমরমা ! যেমন চলছে, জাঙ্ক জুয়েলারী । এদের কদর কতদিন থাকবে বলা মুশকিল ।

বেঁচে থাক, আমাদের মোচার ঘন্ট থেকে শুরু করে, চিতল মাছের মুইঠ্যা ! যারা খায় নি, তাদের নরকে বা দোজখেও জায়গা হবে না বলে দিলাম ।

জয় – বং থুক্কু বাংলা !

দুর্গাপূজা

আড়ম্বরে দুর্গাপূজার প্রচলন ষোড়শ শতাব্দীর মোঘোল আমলেই শুরু হয়- যদিও দুর্গাপূজা এর অনেক আগে থেকেই চালু ছিল ।

ইংরেজরা আসার পর , দেওয়ান, মুৎসুদ্দি, গোমোস্তা, জমিদার, তালুকদারদের হাতে প্রচুর টাকা এলো ।

তাই দুর্গাপূজাতে আড়ম্বর করতেই হবে । জাঁকজমক না দেখালে আর কিসের বড়লোক ?

পরাধীন দেশে এই টাকাগুলো যে বিভিন্ন শিল্পতে ব্যবহার করা যেতে পারে, সেটা এই জেন্টুদের ( নামকরণ বিনয় ঘোষ) মাথায় ছিল না । থাকলেও – সেগুলো করার সাহস বা ইচ্ছা, দুটোই ছিল অনুপস্থিত ।


এই ফাঁকে রাজশাহীর, তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ রায় ( ভাদুড়ী) ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে চালু করলেন দুর্গোৎসব ।

এখন আমরা যে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী সহ যে দুর্গামূর্তি দেখি, সেটা পণ্ডিত রমেশ আচার্যর (শাস্ত্রী) পরামর্শে করা , সেই দুর্গোৎসবে ।


এখানেই প্রথম চালু হয়, নতুন জামা কাপড় পরা, নতুন জিনিস কেনা - মতপার্থক্য থাকলেও এটা মনে হয় মান্যতা পেয়েছে ।

চারদিন ধরে দরিদ্র লোকজনদের পেট ভরে খাওয়ানো হয়েছিল, যদিও স্থায়ী কিছু করার উদ্দ্যোগ রাজা কংসনারায়ণ নেন নি ।

পরোক্ষে তাঁতি, দর্জি, কুমোর থেকে চাষী এর ফল পেয়েছিল, কারণ লোকেরা রাজার ফরমান পেয়ে সব কিছুই নতুন ভাবে তৈরি করায় ।

এটাও শোনা যায় যে এই সমস্তের খরচ নাকি স্বয়ং রাজাই দিয়েছিলেন ,কিন্তু কোনো তথ্য এই সম্পর্কে পাওয়া যায় নি ।

সেই সময়, এই দুর্গাপুজোর জন্য নয় লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল । বেশীর ভাগটাই বাইজী, নাচা গানাতে খরচ হলেও লোকেদের জন্য খরচ করা হয়েছিল এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না ।

এই পুজোর পাল্লা দিতে, রাজশাহীর রাজা জগৎনারায়ণ সেই বছরেই দশ লক্ষ টাকা খরচ করে পুজো করেছিলেন ।

দুজনেই দরিদ্রনারায়ণ সেবার নামে ঐ চারদিন লোক খাইয়েছিলেন এলাহী ভাবে।
শহর কোলকাতায় ১৭৯২ সালে রাজা সুখময় রায় সকলকে টেক্কা দিতে চেষ্টা করেছিলেন ।
সুস্থ ধারার জন্য যদি এই সব টাকা খরচ করা হতো, তবে বোধহয় বঙ্গবাসীদের এতটা দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হতো না ।

সেই ধারা এখনও চলছে লাগামহীন ভাবে ।

তখনকার ব্রাহ্ম সমাজ থেকে এর নিন্দা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে ভাবে জনসাধারণের মনে দাগ কাটতে পারে নি ।

ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র তত্ত্ববোধিনীপত্রিকায় লেখা হয়েছিল :-

ষন্মনসা ন মনুতে যে নাহুর্ননোমতং ।
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ।।

অর্থ :- মনের দ্বারা যাঁহাকে মনন ( চিন্তা) করা যায় না, যিনি প্রত্যেক মননকে জানেন, তাঁহাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানো । লোকে যে পরিমিত পদার্থের উপাসনা করে তাহা কখনো ব্রহ্ম নহে ।

এতসব সত্বেও কিন্তু জাঁকজমক রেষারেষি কিচ্ছু কমে নি ।

আমার যেটা মনে হয় আমাদের মন কখনও শূন্য বা ভ্যাকুয়াম হতে পারে না । ধর্মটাই জেঁকে বসে বেশী এবং আজও বহমান ।

নবকৃষ্ণ দেবও হেষ্টিংসকে খুশী করতে ১৭৫৭ সালের পর দুর্গাপূজা করেন ।
আরেক বড়লোক চূড়ামণি দত্ত টেক্কা দিতেই থাকেন ।

 কিছু সময় এগিয়ে এলে দেখি- সেকালে পুজোর সময় পূজাসাহিত্য ছিল শারদীয় সংখ্যা ছিল না ।

প্রথম যে শারদীয় সংখ্যার উল্লেখ দেখি সেটা হলো, সুলভ সমাচার । ১৮৭৯র ৪ ঠা অক্টোবর এর প্রথম প্রকাশ শারদীয়া হিসেবে যদিও ১৮৭০ সাল থেকেই এই পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছিলো ।

দাম ছিল এক পয়সা, তাই এক পয়সার কাগজ হিসেবেই পরিচিত ছিল এই কাগজ ।

এদিকে নতুন কাপড় পরার রেওয়াজে দর্জিরা করে কর্মে খাচ্ছিল ।

রমজান ওস্তাগর তো প্রবাদ প্রতিম ধনী হয়ে গেল দর্জির কাজ করে ।

ইংরেজরা নিয়ে এলো রেডিমেড জামা কাপড় । ফলে দর্জিরা আর হালে পানি পায় না ।
ছড়া চালু হলো :-

খাচ্ছিল দর্জি সেলাই করে

ভাত মারল ইংরেজের এঁড়ে

১৮৫৩ সালে কোলকাতায় বাবু রাজেন দত্ত অ্যামেরিকা থেকে প্রথম সেলাই কল নিয়ে এলে দর্জিদের কপাল একটু একটু করে আবার খুলতে শুরু করে ।

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কোনো শাস্ত্রক্তো বিধান আছে বলে জানা নেই ।
এ ব্যাপারে পারিবারিক বিধান বা আচারকেই আজও প্রাধান্য দেওয়া হয় ।
আচার তাকেই বলে যা, দেশে বা বংশে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত।
বাবুদের বাড়ীর খাবারের বর্ণণাও আছে বটতলার কবিদের লেখায় । তখন কিছুই বাদ যেত না খাবারে, এমনকি নিষিদ্ধ গোমাংসও । হাঁ হাঁ বা হায় হায় রব না উঠলেও ক্ষুরধার ব্যঙ্গ করা হয়েছে ।

সেই রকম একটা পদ্য দিয়ে শেষ করছি :-

অমৃত সমান বীপস্টিক রলিপুলি ।
পোর্ক চপ সসেজেস, তাকে কভু ভুলি ।।
ফৌল কাটলেট আর লেগ মাটন রোষ্ট ।
দো পেঁয়াজা কাপজেলি খেলে হয় বোষ্ট ।।
ভিন কাটলেট হ্যাম টার্কি এন হ্যাম্ ।
পান কিনা পান কভু গবরনরের ম্যাম্ ।।
এমন, সুস্বাদ খাদ্য ত্রিভুবনে নাই ।
দেবের দুর্লভ ইহা কি কহিব ভাই ।।
অকসং টর্টেল সুপ সকলিং পিগ রোষ্টো ।
যা দেখিলে সেই ক্ষণে চুলকায় মুখ ওষ্ঠ।।
এই সব খানা পেটে পড়িয়াছে যার ।
ভাগ্যের কি সীমা আমি দিবো এ তাহার ।।
যে খেয়েছে সে মজেছে কি বা তার তার ।

স্বর্গ থেকে নেচে ওঠে চৌদ্দপুরুষ তার ।।

Thursday, September 14, 2017

দরদাম




জানি না কতখানি সত্যি, তবে প্রবাদ আছে-বাঙালির নিত্য অসুখ – গ্যাস, অম্বল আর বদহজম ।

তার ওপর বাজারে বা অন্য কোনো জায়গায় জিনিস কিনতে গিয়ে দরদাম না করলে অসুখ গুলো  নাকি আরও বেড়ে যায় ।

সঙ্গে যোগ হয়- মাথা ঘোরা, পা ঝিনঝিন আর হা হুতাশ ।

যদি বা কেনা হল – তবুও আফশোস থেকে যায়, কেন আরও একটু দাম কমালাম না !

তা যাক্ !  দুটো বহুশ্রুত চুটকি শোনাই আপনাদের- বাঙালির দরদামের ব্যাপারে । অবশ্যই অনেক কাল আগের কথা ।
 এক ভদ্রলোক, তাঁর পরিবারের বারো জনকে নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন- কলকাতা থেকে ব্যাণ্ডেল ।

টিকেট কাউন্টারে যখন টিকেট বাবু বললেন
:-দিন চব্বিশ টাকা! ভদ্রলোক বললেন – কি অনাসৃষ্টি কাণ্ড, একডজন টিকিট নিলাম একটু কমসম হবে না?
ঘটাং ঘটাং করে টিকিট গুলোতে তারিখ পাঞ্চ করতে করতে বললেন – আপনার বিয়ে কি রেলের কোন কত্তার সাথে হয়েছে ?
কথা না বলে ভদ্রলোক চব্বিশ টাকা দিয়ে টিকেট গুলো নিলেন ।
ভদ্রলোক ফিরছেন ব্যাণ্ডেল থেকে নিমন্ত্রণ রক্ষা করে ।
এবারে টিকেটের দাম বললেন কাউন্টারের বাবু – ত্রিশ টাকা !
ভদ্রলোক অবাক ! আসার সময় তো চব্বিশ টাকা দিলাম, আর ফেরার সময় ত্রিশ !

জবাব এল – আরে মশাই, সেটা ছিল দিনের বেলা ! এখন রাত । লাইট জ্বলবে, তার জন্য উপরি টাকা দেবেন না ?
দরাদরি করে, সেটা কমান গেল-আঠাশ টাকায় ।

ভদ্রলোক গিন্নিকে বললেন – দেখলে তো হাওড়ার লোকটা আমায় ঠকিয়েছিল !
বাজারেও এই বিপত্তি ।
 বাজারে নারকোল আছে । কিনতে হবে মরসুমের বাজারে ।
দাম জিজ্ঞেস করাতে, দোকানদার বলল:- জোড়া চল্লিশ টাকা !

একটু কম হবে না ?
-       হবে বাবু, তবে আমার এখানে নয় ।
-       কোথায় ?
-       একটু এগিয়ে যান, জোড়া ৩৫ টাকা । আর একটু এগুলে জোড়া ৩০ টাকা । করে করে, এগিয়ে গেলে দেখবেন, বিনে পয়সায় প্রচুর নারকোল পাবেন !

 দই মিষ্টিও  কেনা দরকার ।
ভাই মিষ্টি দই কত করে ? ক্রেতার ব্যাকুল জিজ্ঞাসা ।
-      দুশো কুড়ি টাকা কিলো ।
-      এ:, কিলিয়ে দিলেন ভাই ! দুশো বিশ করে হবে না ? একটু সস্তা হতো তালে !
-      নামী দোকানে একদাম ! নেবার হলে নিন, না হলে আসুন !

এখন তো অনলাইনে কেনার ধূম । তা সেখানেও নাকি -বং জাতি দরদাম করে ।

আমার জানা নেই – আপনাদের জানা আছে কি?







Monday, September 11, 2017

অন্য যাদুগর -৪


ওপিজী অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছেন ।

এদিকে শশধর মুখার্জির ফ্লিমস্তান থেকে নতুন ছবি হবে – তুমসা নেহি দেখা ।

নাসির হুসেনের গল্প, চিত্রনাট্য এবং সংলাপ।
কাস্টিং – শাম্মি কাপুর আর অমিতা ।

এবারে সুরকার চাই । নাসির হুসেন বললেন একজন নতুন সুরকার এসেছেন হিন্দি ফিল্মের জগতে ওপি নাইয়ার । তাকে সুরকার হিসেবে নিলে ভালো হয় ।

শশধর মুখার্জী বললেন – ডাকো ওকে ।

মুখার্জি বাবুর মনেই নেই – এই সেই ওপি নাইয়ার, যাকে তিনি বলেছিলেন, তোমার জীবনে সুরকার হওয়া হবে না ।

এমন কি ওপি নাইয়ার সামনে আসাতেও চিনতে পারলেন না ।
ওপি বললেন – স্যার আমিই সেই লোক, যাকে আপনি বলেছিলেন , তোমার কোনোদিন সুরকার হওয়া হবে না । সেই আপনিই কিন্তু আমাকে ডেকে এনেছেন ।

মুখার্জিবাবুর মনে পড়ল ! আরে তাইতো ! তবে এরকম ভবিষ্যৎ বাণী তো হামেশা ফেল করে না, তবে তোমার ক্ষেত্রে খাটে নি দেখে আমি খুশী । বলো কত নেবে তুমি সুর করতে ?

স্যার, এক লাখ টাকা । এর কমে আমি সুর করি না ।
চলো – ঠিক আছে । টিউন কিন্তু হিট হওয়া চাই ।
হবে স্যার- নিশ্চিন্ত থাকুন ।
তারপর যা হল- সেটা ইতিহাস ।

এখানে একটা কথা বলা দরকার । যে “হর্স বিট” ব্যবহার করা হয়েছিল, ছবির মূল গানটিতে,( তুমসা নেহি দেখা) সেটা কিন্তু পঙ্কজ মল্লিকই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন- ডক্টর ছবিতে (১৯৪১) ।

গানটি ছিল - চলে পবন কি চাল, পঙ্কজ মল্লিকের নিজের গলাতে ।

প্রথমে নৌশাদ, পরে ওপি ব্যবহার করেন এই “হর্স বিট” ।

ওপি বেশী ব্যবহার করাতে এই “হর্স বিট” – ওনার সিগনেচার হয়ে যায় ঠিকই তবে ওপি এটা নিজের মুখে বলেছিলেন গুরু হিসেবে মানা পঙ্কজ মল্লিকের ব্যাপারে ।
একটু আশকথা পাশকথাতে যাই এখন ।

ওপির আগে এস্রাজকে কেউ ফ্লিম মিউজিকে আনেন নি ।

এমনকি দুটো পাথর বা কাঠ ঠুকে, খালি গলায় গান গেয়ে পয়সা চান যে সব বিভিন্ন পথ গায়করা , সেটাও ফ্লিম মিউজিকে ওপির অবদান ।

প্রেমের গানে যে বাইজী বাড়ীর রাগপ্রধান গানে ব্যবহার করা এস্রাজ ব্যবহার করা যায়, সেটা ওপি হাতে নাতে করে দেখিয়েছিলেন – কাশ্মীর কি কলি ছবিতে, দিবানা হুয়া বাদল গানে ।

পণ্ডিত রামনারাইনের এস্রাজ, ওস্তাদ রইস খানের সেতার আর আলবুকার্কের বাজান- চেলোতেই গানটি সুপার ডুপার হিট ।

মাত্র তিনটে বাদ্যযন্ত্রেই কামাল করেছিলেন – বাদ্যযন্ত্রীদের সহায়তায় ।

পঙ্কজ মল্লিক বা রাইচাঁদ বড়ালকে তিনি গুরু মানতেন, সেটা আগেই লিখেছি ।

ওপি যে চারজন রেকর্ডিস্টের সাথে কাজ করেছেন – তাদের মধ্যে তিনজনই বাঙালি ।
মুকুল বোস, রবীন চ্যাটার্জি, আর ঈশান ঘোষ । অপর রেকর্ডিস্ট হলেন – মিনু কর্ত্রাক।

এরা রেকর্ডিং করতে সাহায্য না করলে – ওপি নিজে এত জীবন্ত মিউজিক করতে পারতেন না বলে, বারবার স্বীকার করেছেন।

ইয়ে চাঁদসা রোশন চেহেরা গানেতে ওই কাঠের টুকরো বাজিয়েছিলেন – সহকারি, জি এস কোহলি ।

জি এস কোহলি অবশ্য ঢোলকও বাজাতেন ।

ফাগুন ছবিতে পাঁচটা গানে রাগের ব্যবহার শুনে বিখ্যাত গায়ক আমীর খাঁ বলেছিলেন – ওপি, তুমি যে বলো, গান কোনোদিন শেখো নি – এটা তো মিথ্যে কথা ।

আমি যা বলি ঠিক বলি । হারমোনিয়াম নিজে বাজানো শেখা ছাড়া আর কিছু শিখি নি।

বাজে কথা ছাড়তো । পিলু রাগের ওপর এই সব গান এক কথায় অপূর্ব ।
ওপি তো হাঁ ।

পরে অবশ্য অনেক গানে তিনি বিভিন্ন রাগের ব্যবহার করেছেন । তবে সেটা শিখে না ওস্তাদ রইস খানের সহযোগিতায়- সেটা আর জানা যায় নি ।

পিলু রাগের ওপর ভিত্তি করে তিনি কিন্তু আপাত চটুল গান তৈরি করেছিলেন, যেমন:-

কভি আর কভি পার ( আর পার ১৯৫৪)

লেকে পহেলা পহেলা প্যার( সি আইডি ১৯৫৬)

তবে, ফাগুনের এক পরদেশী মেরা দিল লে গয়া, এই গানটি ময়মনসিংহ গীতি থেকে নেওয়া এটা ওপি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, যদিও গানটি পিলু রাগের ওপর তৈরি ।

========
(চলবে)
+++++++++
তথ্যসূত্র :-Z Classic টিভি চ্যানেলে জাভেদ আখতারের স্মৃতিচারণ-২০১৫,
ইউ টিউবে -ও পি নায়ারের আপন স্মৃতিচারণ ও উইকি।


Sunday, September 10, 2017

অন্য যাদুগর-৩



১৯৫৪ তে মুক্তি পেল – দত্তা সায়েবের “আর-পার । প্রতিশ্রুতি মত ওপিজী সুরকার ।

জমজমাট হিট । কি গানে বা ছবি হিসেবে ! এবারে বোনাস হিসেবে নাইয়ার সায়েব পেলেন, বেশ কিছু টাকা উপরি হিসেবে ।


মেরিন ড্রাইভের হোটেল – এভারগ্রীনে ওপি এবারে গ্যাঁট হয়ে বসলেন ।
এখন তো হোটেলের কামরাতে প্রডিউসারদের লাইন নিশ্চয়ই লাগবে ।


দরজাতে খটখটের অপেক্ষা মাত্র । দিন যায়, সপ্তাহ যায়, করে করে তিন মাস চলে গেল- কারও টিকির দেখা নেই । অবশেষে কামরার দরজায় খটখট্ ।

দরজা খুলে দেখেন – হোটেলের ম্যানেজার । ম্যানেজার বলল – অনেক দিন তো হল, এবারে বাকি ভাড়াটা দিন ! না হলে- আপনাকে জিনিস পত্র সহ বাইরে বের করে দেব ।

ওপি ঘাবড়ে গিয়ে তুতলে বললেন – আর দিন পনের সময় দিন । আমি দিয়ে দেব ।


এই যে টাকা দিতে পারবেন, এটা বলার সাহস কোত্থেকে পেলেন তিনি?
বর্তমানে, একই ছবিতে দু তিনজন সুরকার থাকেন, এবং এটা কোন ব্যাপার নয় ।


সেকালে, কিন্তু এটা হত না । দুটো হাফ ছবি তিনি পান নি যে, তা নয় ।
একটা হল – মোঙ্গু, শেখ মুক্তারের প্রডিউস করা ছবি, মাস্টার মহম্মদ সফি তার সুরকার ।

আর একটা হল – মেহেবুবা । কে অমরনাথ প্রডিউসার । সুরকার – রোশন ।


ওপিজির আত্মসম্মানে লাগছিল – এই হাফ ছবি দুটোর সুরকার হিসেবে কাজ করতে ।

তবে, টাকা বড় বালাই আর হোটেলের ম্যানেজার ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে ।

কাজ দুটো নিয়ে নিলেন । লতাজী তখন রোশনের সুরে গান রেকর্ড করে ফেলেছেন মেহেবুবা ছবির ।


এদিকে রোশনের সাথে কোনোকারণে ঝগড়া হয়ে গেছে কে অমরনাথের।

আর শেখ মুক্তারের পছন্দ হচ্ছিল না, মাস্টার সফির সুর ।


ঠিকঠাক ভাবে বলতে গেলে একদিনে প্রায় পাঁচটা গানে ওপি সুর দিতে পারতেন, কিন্তু সেটা প্রকাশ্যে কখনই বলেন নি ।

সুর করেই তিনি নোটেশনের জন্য তাঁর সহকারী জি এস কোহলি বা সেবেস্টিয়ান ডি সুজাকে দিতেন । পরের দিকে অবশ্য সেবেস্টিয়ান ডি সুজা ছিলেন না, তবে বাদ্যযন্ত্রী হিসেবে অনেকেই ছিলেন, যাঁদের নাম ক্রমশ প্রকাশ্য- এই লেখায় ।


জিএস কোহলি কিন্তু নাইয়ার সায়েবের শেষ ছবি পর্যন্ত ছিলেন সহকারী।


এদিকে – তখনকার সুরকারদের সংগঠনের অন্যতম নেতা ছিলেন , অনিল বিশ্বাস আর নৌশাদ ।

তাঁরা এসে ওপিজীকে বললেন – এটা ঠিক হচ্ছে না নাইয়ারজী । রোশন সায়েব আর মাস্টার সফি কিন্তু বড় সুরকার । তাঁদের একটা মান সম্মান আছে আর আপনি এঁদের দু দুটো সিনেমার কো মিউজিক ডিরেক্টার হচ্ছেন !

জানি, জানি – তবে কোন উপায় নেই !

কেন?

বরfবরের স্পষ্ট বক্তা – নাইয়ার সায়েব উত্তর দিলেন :-


ম্যানেজার আমাকে বের করে দেবে বলেছে ভাড়া না দিলে । আপনারা ভাড়াটা দিয়ে দিন, আমি আর মিউজিক করবো না ।


কে এখন ভাড়া মেটাবে টাকা দিয়ে !

অনিল বিশ্বাস আর নৌশাদ সায়েব গজগজ করতে করতে চলে গেলেন ।
মঙ্গু সিনেমাতে আশা ভোঁসলে ভালো ভাবে গাইতে সুযোগ পেলেন ।

গীতা দত্ত্ তো ছিলেনই । তাঁকে ছাড়া তো ওপি সুর করবেনই না ।

গীতাজীকে ব্ল্যাক বিউটি বলে ডাকতেন ওপি ।

এতো গেল ১৯৫৪ র কথা ।

৫৫ তে পেলেন – বাপরে বাপ আর মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটি ফাইভ । বাম্পার হিট ।

১৯৫৬ তে সেই যুগান্তকারি ছবি – সিআইডি ।

হিন্দি ছবির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন, সুরে এবং গানে ।

এতদিন ওপি জী একটা ট্যাক্সি করে সারা বোম্বে ঘুরে বিভিন্ন স্টুডিওতে যেতেন । দিনভর ভাড়া উঠত – প্রায় একশ টাকা, এখনকার দিনে প্রায় হাজার বারোর সমান ।

এমন নয় যে তিনি ঘুরেই বেড়াতেন । একটা স্টুডিও তে গিয়ে হয়তো ঘন্টা পাঁচেক থাকতেন । ট্যাক্সিও দাঁড়িয়ে থাকত ।

বন্ধুরা বলল – এবার একটা গাড়ি কিনে ফেল রে ।

তিনিও ওপি নাইয়ার । সৌখীন । কিনে ফেললেন – ইম্পালা ।

দিন দুয়েক পর গাড়ী নিয়ে গেলেন –শিবপুরীতে । এতদিনে মা বাবা চলে এসেছেন শিবপুরীতে । ওপি জানতেন সেটা ।


বাবাকে বলে এসেছিলেন পাটিয়ালা ছাড়ার আগে- যদি কিছু হতে পারি, তবেই আমার মুখ দেখাবো, নয়তো নয় ।

মা বাবা দেখে তো থ । আরে ! সবাইকে বলি জানিস ?


কি?


এই অমকার প্রসাদ নাইয়ার আমার ছেলে, কেউ বিশ্বাস করে না ।
তা যাও আমার গাড়ী নিয়ে, বন্ধুদের বলে এসো ।

বাবা বললেন – জনা দশবারোকে । এলেন প্রায় তিনশর ওপর ।
সবাইকে বলতে হয়ে গেলেন – তিনিই সেই অমকার প্রসাদ ।


শিবপুরী ছাড়ার আগে বাবা মহেন্দ্র প্রসাদ নাইয়ারকে বলেছিলেন :- You kidnapped my personality in my childhood and I polished my personality staying far from you.


হ্যাঁ ! ইংরেজিতেই বলেছিলেন ।




========
(চলবে)
+++++++++
তথ্যসূত্র :-Z Classic টিভি চ্যানেলে জাভেদ আখতারের স্মৃতিচারণ-২০১৫,


ইউ টিউবে -ও পি নায়ারের আপন স্মৃতিচারণ ও উইকি এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ।