Powered By Blogger

Saturday, May 27, 2017

ঝাড়খণ্ডী ভাষা

মালদহের ঝাড়খণ্ডী বাংলা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে খোদ শহরেই, যদিও গ্রামাঞ্চলে এখনও টুকটাক চলে ।

এই মিষ্টি ভাষা, রাজশাহীর চাঁপাই নবাবগঞ্জেও চালু এখনও ।

শুধু এই ভাষা কেন, বাংলার কত যে উপভাষা নিশ্চিহ্ন হচ্ছে, তার কোনো খবর আমরা রাখি না ।

গ্রামে বা গঞ্জে ভাষার কোনো শ্লীলতা হয় না । বরং নিজের ভাবে জোর আনার জন্য তথাকথিত “ অশ্লীল” শব্দ ব্যবহার হয়/ হতো ।

মহিলারাও এই সবে কিছু মনে করেন/ করতেন না, বরং এটাকে সমর্থন করতেন/ করেন ।

এই শ্লীলতা/ অশ্লীলতা আমার মনে হয়- ব্রিটিশ মিশনারিদের আনা, যার ফল আমরা ভোগ করছি আর তার ফলে গোটা ভাষাটাই অবলুপ্তির দিকে এখন ।

এত কথা বললাম একটা ঘটনা বলতে ।

মালদার ছেলের বিয়ে হয়েছে, কোলকাতার খোদ শ্যামবাজারে ।
জামাই এসেছে অষ্ট মঙ্গলায় শ্বশুরবাড়ীতে । শ্বাশুড়ী মা খেতে দিচ্ছেন ।
ম্যার ! এত্তা ভাত কেনে দিছেন জী ? খেইতে লারবো ।

এরকম বলেই যাচ্ছে ।

রাতে বৌ বলল :- তুমি এত শিক্ষিত, ভালো সরকারি চাকরি করো-অথচ এই ভাষায় কথা বলে হাস্যাস্পদ হচ্ছো এটা বুঝতে পারছো না?

ম্যার শালার ব্যাটা শালা ! মাতৃভাষায় কথা কহছি, এত্তা সানকাছো ( ঘাবড়ে) কেনে?

বৌ রাগ করে আর মালদাতে ফিরল না । বলল ;- যেদিন তুমি শুদ্ধ বাংলা বলবে সেদিন আমি তোমার সাথে মালদা ফিরবো ।

ছেলেটি মনের দুঃখে মালদায় ফিরে এসে বাংলার অধ্যাপকের কাছে মন দিয়ে “শুদ্ধ” বাংলা শিখতে লাগলো ।

সাতদিন পরে কোলকাতায় ফিরলো ছেলেটি ।

তা শাশুড়ি যথারীতি খেতে দিয়েছেন ।

ভাত বেশী হওয়াতে ছেলেটি বলল :- থাক মা, আর অন্ন দিতে হইবে না । ব্যাঞ্জনও প্রচুর হয়েছে ।

শাশুড়ী বজ্রাহতর মত চুপ করে বসে ।

এটা দেখে ছেলেটি বলল :- ম্যার্! এতেই গ্যাঁড় ফেটে গেল ? এখনও তো ঘৃত আর মৎস কহিই নি !

অভিজ্ঞতা


=====
মে মাসের চাঁদিফাটানো গরম এবারে । যেদিকে চোখ যায়, রোদে চারিদিক ঝলসে যাচ্ছে । বৃষ্টির নাম গন্ধ নেই ।

রমাপদর গাড়ীর এসিটা হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিল । দরকার না হলে খুব একটা বেরোয় না আজকাল । নতুন গাড়ীর এসি কেন কাজ করছে না, এটা ভাবার আগেই জানলা খুলতেই ধেয়ে এলো গরম হাওয়া ।

ড্রাইভার ভোলা – অনেক চেষ্টা করেও কারণটা বের করতে পারছে না একে রবিবারের বাজার তায় রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে ।

রমাপদ ফোনটা হাতে নিয়ে কার সার্ভিসে ফোন করতে যেতেই চোখে পড়ল – আজকের প্রথম ফোনটাই ফেসবুক বন্ধু রমার কলের দিকে ।
কথা হয়েছিল সকালেই । বার বার আসতে বলেছিল ওদের বাড়ীতে একবার ।

আগে ওদের বাড়ী গিয়ে এসিতে বসে তারপর না হয় কার সার্ভিসে ফোন করা যাবে ভেবে রমাকেই ফোন করলো রমাপদ ।

হ্যাঁ কাকু বলুন ।

রমাপদ বিপদটা খুলে বললো । রমার প্রথম জিজ্ঞাসা – খাওয়া হয়েছে? না হলে, আমাদের এখানেই না হয় চারটে ডাল ভাত খেয়ে নেবেন । কোথায় আছেন এখন?

বলাতে রমার উত্তর – ও মা ! এতো আমার বাড়ীর একদম কাছে । এক কাজ করুন । গাড়ীটা নিয়ে স্টেট ব্যাংক এটিয়েমের সামনে আসুন

তারপর পরের গলিতে ঢুকেই বাঁ দিকের প্রথম দুটো বাড়ী ছেড়ে, তৃতীয় বাড়ীটাই আমার । চলে আসুন । আমি আর দীপক আপনার জন্য অপেক্ষা করছি ।

রমাপদ পৌঁছে গেল । দোতলা ছিমছাম বাড়ী । বেশ যত্ন নিয়ে করা ।
কলিং বেল বাজালো রমাপদ । রোদে কান ঝাঁ ঝাঁ করছে, এদিকে তেষ্টায় প্রাণ যায় যায়।

একটা চিৎকার করা গলা শুনলো রমাপদ । এই গলাটা মনে হলো না, দীপকের ।

ধড়াম করে দরজা খুলে গেলে- এক বিশাল চেহারার লোক বাঁজখাই গলায় বললো :- কাকে চাই?

রমাপদ রুমাল দিয়ে মুখ মুছে উত্তর দিলো – রমাকে বলুন, রমাপদ কাকু এসেছে ।

এই বাড়ীটা ওদের নয় । আমার বাড়ী । যান, বেরিয়ে যান । দরজা বন্ধ হলো সশব্দে ।

রোদ আর অপমানে ভোঁভোঁ করা মাথা নিয়ে রমাপদ ভোলাকে বলে গাড়ী ঘুরিয়ে নিয়ে একটা এসি রেস্তোঁরাতে এসে বসলো ।

একটু রেস্ট নিয়ে কার সার্ভিসে ফোন করতে যেতেই রমার ফোন । একটু রাগও হলো । তবু কলটা অ্যাকসেপ্ট করতেই রমার উদ্বেগের গলা – কাকু আপনি কোথায় ?

রমাপদ যতটা সম্ভব খুলে বললো – ঘটনাটা ।

দীপক ফোনটা নিয়ে ঘটনাটা আবার শুনে খালি বললো – একটু ওখানেই বসুন – আমরা আসছি রেস্তোঁরায় ।

ইতি মধ্যে ভোলা এসে খবর দিলো – এসি একদম ঠিক কাকু, কি করে যে চলছিল না সেটা বুঝলাম না । চলেন এবার ।

রমাপদর উত্তর – এঞ্জিন চালিয়ে এসি চালা । গাড়ীটা ঠাণ্ডা হবে । পারলে একটা ছায়ার তলায় বোস্, আমি একটু পরে আসছি ।

দীপক আর রমা এসে পুরো ঘটনাটা শুনে খালি ওই ভদ্রলোকের চেহারার বর্ণণা চাইতেই রমাপদ যতটা পারে গুছিয়ে সেটা বললো ।

দীপকের উত্তর – উনি আমার বাবা । তিন বছর আগে মারা গেছেন এক শনিবার দুপুরবেলা হিট স্ট্রোকে । ওনারই তৈরি বাড়িটা । এই নিয়ে তিনবার হলো । আর হবে না – এবারে আমাদের ওখানে চলুন ।
+++++++

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

Wednesday, May 24, 2017

কোলকাতা বিষয়ক



==========

আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গের বাইরের রাজ্য বা এই রাজ্যের জেলা শহর থেকে প্রথম কোলকাতায় আসি – তারা হকচকিয়ে যাই বৈকি ।

যদিও আমি নিজে স্কুল জীবন কোলকাতায় কাটিয়েছি – তবু তখনকার কোলকাতায় এত যানজট বা কোলাহল ছিল না ।
জীবন যাপন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের পক্ষে অনেক সহজ ছিল ।

আর বাঘাযতীন, গড়িয়া এমনকি যাদবপুরও তার গা থেকে ঢিলেঢালা গ্রামীন চাদরটা ছেড়ে ফেলতে পারে নি তখনও ।

উত্তর কোলকাতায় আসা যেত দোতলা টুবি বাসে , গড়িয়াহাট থেকে । এই জায়গা থেকেই শহরের আলতো ছোঁয়া পেতে শুরু করতাম আমরা ।

তখন, ঢাকুরিয়াতে রেলের লেভেল ক্রসিং ছিল । সবে তৈরি হতে শুরু করেছে ফ্লাইওভার যার এখনকার পোষাকী নাম – চৈতন্যদেব সেতু ।
যখনকার কথা বলছি – (১৯৬১ -১৯৬৪), তখনও শ্যামবাজারে নেতাজীর মূর্তিও স্থাপিত হয় নি ।

আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ আসতে হলে তখন টুবি ভরসা । ওই রুট ছিল – বালীগঞ্জ ষ্টেশন থেকে পাইকপাড়া পর্যন্ত ।
আর জি করের পরে আর যেতে সাহস হয় নি, কিশোর বয়সে । জানতাম, ওদিকে দমদম, তবু আসা হয় নি কোনো অজানা কারণে ।
পকেটমারি ছিল বাসে ট্রামে তবে এতটা নয় । খুন জখম যে ছিল না, তাও নয় তবে সেটা বেশীরভাগই ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্যকিছু থেকে হতো ।

রাজনৈতিক খুনের ঘটনা বেড়ে গেল ১৯৭০ সাল থেকে । তখন যে ভাবে খুন জখমের বর্ণণা দেওয়া হতো কাগজে – তাতে হৃৎকম্প, বাড়তো বই কমতো না ।

আমি পড়তাম – একদিনের বাসী কাগজে । তাও সকালে নয়, দুপুরের দিকে । ট্রেণ লেট থাকলে সন্ধেতে । বেশী লেট হলে, আর কাগজ দিতো না হকাররা ।
একবার ১৯৬৮ বা ১৯৬৯ হবে বোধহয় – দেখি, শ্যামবাজারের আমূল পরিবর্তন । নেতাজীর ষ্টাচু বসানোর কাজ চলছে বা বসে গেছে ।
ধীরে ধীরে বাঘাযতীন আর যাদবপুর , হালতু ইউনিয়ন, ছগণ্ডা পরগণার থেকে কোলকাতা হয়ে যাচ্ছে ।

বদলে যাচ্ছে জীবন যাপনের ধারা । পাড়ার আঁটসাঁট ভাবটা বদলে কেমন যেন একটা অচেনা অজানা চেহারায় বদলে যাচ্ছে সব কিছু ।
বাঘাযতীন থেকে বিজয়গড় যেখানে হেঁটে যেতে হতো, সেখানে চলে এসেছে রিক্সা।

উত্তর কিন্তু নট নড়ন চরণ । সেই পাড়া – বৈঠকী মেজাজ , রকের আড্ডা , হা হা করে হাসা, সব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা জমজমাটি ভাব তখনও ।
আড্ডাতেই তৈরি হয়েছিল স্লোগান:-

বোরদে, তু খেলনা ছোড়দে! 

শ্যামবাজারে অনেক কটা দোকান ছিল যেখানে সুগন্ধওয়ালা চা , সেদ্ধ হাঁসের ডিম আর ঝাল মিষ্টি টোষ্ট পাওয়া যেত আসল পলসন বাটার দিয়ে ।

একটা কফি হাউসও ছিল । উত্তরের দিগগজরা আড্ডাও মারতেন সেখানে । 
কলেজ ষ্ট্রিটকে বলা যায় মধ্য কোলকাতা । রেলিংয়ে ঝোলানো বা ফুটপাতে রাখা থাকতো – অজস্র পুরোনো বই ।

চারমিনার সিগারেটে টান দিতে দিতে বই পিপাসু লোকজন তাদের হারানিধি খুঁজতো ।

দরাদরিও চলতো । সবচেয়ে বেশী পুরোনো বইয়ের ষ্টক ছিল – করিম চাচার কাছে ( নামটা এখন ঠিক মনে পড়ছে না ) ।
মোড় থেকে হেদুয়ার দিকে যেতে বোধহয় বাঁ দিকে দোকানটা পড়তো ।

তখনকার ফিল্ম মেকাররা ওই বইয়ের দোকানে হানা দিয়ে বই টই কিনে এসে বসতেন কফি হাউসে ।

গণসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান তো হতই, কাফকা কামু থেকে শরৎ, বিভূতি ( যেন সব ইয়ার দোস্ত) সবাইকে নিয়েই আলোচনার রমরমা ।

প্রথমে ঢুকলেই মনে হতো – ভুভুজেলা বাজছে চারিদিকে , যদিও তখন ভুভুজেলা কি জিনিস জানে না কোলকাতা শহর ।

১৯৯৬ সালে যখন পাকাপাকি ভাবে দমদমে এলাম – চেষ্টা করেছিলাম, সেই পুরোনো যাদবপুর বাঘাযতীন, শ্যামবাজারকে খুঁজতে ।
একটু করে মন খারাপ হয়, তবু মেনে নেই আস্তে আস্তে ।

ধীরে ধীরে যে সেই পুরোনো কোলকাতা গুগুল পিকচারসে বা ইউ টিউবে চলে যাবে সেটা বুঝি নি ।

“ভেসে আসে কোলকাতা, কুয়াশা তুলিতে আঁকা

শহরতলীর ভোর মনে পড়ে ।” ( মহীনের ঘোড়াগুলি)

Monday, May 22, 2017

বাজার ও গঙ্গাজলী যাত্রা



+++++++++++++++++

আচ্ছা, অভ্যাস কাকে বলে ? বারবার একই জিনিস এক সময়ে করার নাম বোধহয় অভ্যাস ।

ধরুন – সকালে উঠেই দাঁত মাজা, প্রাতঃকৃত্য করা , এগুলো অভ্যাসের মধ্যেই পড়ে।
বাজার করা একটা অন্যতম অভ্যাস ।

কিশোর বয়সে বাজার করাটা যেচে নিতাম, টু পাইস ইনকাম করার জন্য । বাঙালি যেমন কবিতা লেখে কৈশোরে, বাজার থেকে টু পাইস উপার্জন করাটাও একটা কৈশোর সিমটম ।

এক কেজি আলু কিনে তাকে দেড় কেজি বলে চালানোর সময় কত বার যে ধরা পড়েছি, ম্যাথেমাটিক্যালি তার ভ্যালু – এনেথ টাইমস ।
এখানে এন সংখ্যাটির মান যা খুশী হতে পারে ।

তাও বাজারে আমাকে পাঠানো হত, কারণ মামাদের সময় ছিল না বাজার করার ।

নিজে উপার্জন ক্ষম হয়ে বাজার করি বটে, তবে ছোট বেলার অভ্যাস বলে কথা !
অঙ্গারঃ শতধৌতেন মলিনত্বং ন মুঞ্চতি । হাজার বার ধুলেও কয়লা কালোই থাকে।

তবে, এখানে একটা বিশেষত্ব আছে । পয়সাটা বাঁচে । মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেই- ইংরেজী আপ্তবাক্যটি বলে:-

এ রুপি সেভড্ ইজ এ রুপি আর্নড ।
হরে দরে সেই ইনকামই হল আর কি !
এটা একটা ভিসিয়াস সাইকেল ।

যে কথা বলছিলাম । স্পোনডিলোসিসে আক্রান্ত হবার পর – আজকাল খুব একটা বাজার যাই না ।

ঠেলাওয়ালার কাছ থেকে সব্জী আর বুড়োকে ফোন করে মাছ আনাই । অবরে শবরে রাজা মুরগীর মাংসটাও দিয়ে যায় ।
কিন্তু, উবু হয়ে বসে আলু, পটল, পেঁয়াজ, শাক – বাছার মধ্যে যে আনন্দ, সেটার মত অন্য কিছু হয় না ।

কাতলা মাছের কানকো খুলে শুঁকে দেখতে হয় । কাদার গন্ধ থাকলে, তার টেষ্ট ভালো হবে না ।

এখন উবু হয়ে বসা বারণ ।

আজকে তাও গেলাম বাজারে । যেতেই, চনি তার হাতে ধরা ছোট বালতি থেকে একটা প্ল্যাসটিকের কাপ আর কেটলি থেকে চা ঢেলে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল – খান।

তবে, আজ বাজার সরগরম । গলদা চিংড়ি আটশো থেকে হাজার টাকা কিলো, আড় বড়ো-৫০০ টাকা । দেখে টেকে আর ইলিশের দিকে তাকাই নি ।

পেত্যয় যাবেন না – কোনো মাছই পড়ে থাকছে না । খাসীর মাংসের দোকানে লম্বা লাইন । দাম জিজ্ঞেস করবো কি !

মুরগীর মাংসর অবস্থাও তথৈবচ ।

আম, লিচু কড়া রোদে শুকনোর কথা, কিন্তু বাজারে বাবুরা তাদের সযত্নে ঘিরে রেখেছে যাতে ফল গুলো না শুকোয় ।

খানিক পরেই দেখি- জহর সরকারের ভোজ বাজী । ঝাঁকায় কিস্সু নেই ।
৫০০ গ্রাম ভোলা মাছ কিনে ঠেলাওয়ালা সেলিমকে বললাম – বাড়ীতে সব্জী দিয়ে যা তো !

পশ্চিম বঙ্গে নাকি লোকের হাতে পয়সা নেই ।

ছোট বেলা থেকে এই মিথ শুনে আসছি ।

যাই হোক – এই বয়সে কিস্সু হজম হচ্ছে না । তাই অজীর্ণে ভোজনং বিষম্ ।

সাবধান থাকা ভালো কারণ গঙ্গাজলী যাত্রার তো দেরী নেই !

চুল কাটানো


====

খুব ছোটবেলার একটা আবছা স্মৃতি আছে আমার চুল কাটানোর । বাবা আমার মাথা ধরে আছেন জোর করে আর চক্র বারিক আমার মাথার চুল ঘ্যাস ঘ্যাস করে কেটে যাচ্ছে, যেন লনের ঘাস ছাঁটছে ।

আমার পরিত্রাহি চিৎকার আর বাবা বলছেন :- এই তো হয়ে এলো । একটু দাঁড়া ।
সেই সময়ে ওডিশা- আন্ধ্রার সীমান্তবর্তী আধা শহর পারলাখেমুণ্ডিতে সেলুন ছিল বলে মনে পড়ছে না ।

এই করেই চলছিল আমার চুল কাটানো , তারপর তো মা বাবা পাঠিয়ে দিলেন কোলকাতার বাঘাযতীন কলোনীতে মামাবাড়ী, পড়াশোনার জন্য।
প্রথমেই ভেবলু হয়ে গেছিলাম – কোলকাতার এই অংশে এসে । তখন ওটা ছিল হালতু ইউনিয়ন , জিলা :- ছ গণ্ডা পরগণা ।
বড় রাস্তা দিয়ে চলতো ক্যালকাটা স্টেট ট্র্যানস্পোর্টের দোতলা আর একচোখ কানা একতলা বাস ।

ওপরে লেখা থাকতো – ৫ গড়িয়া বা হাওড়া, আপ বা ডাউন বাসে । রাস্তা পেরিয়েই বাঁদিকে বাঘাযতীন বাজার, তারপরেই লাইন দিয়ে আকষর্ণীয় বাঘাযতীন গার্লস্ হাইস্কুল, ইস্টবেঙল সুইটস্ । পরেই একটা খুপরী । ওপরে সাইনবোর্ড – শ্রীশ্রীবজরঙ্গবলী হেয়ার কাটিং সেলুন ।
নীচে আরও লেখা :- এখানে স্বল্পমূল্যে সব ধরণের চুল কাটা হয়, এমনকি উত্তমকুমারের মত । পরীক্ষা প্রার্থনীয় ।
ইচ্ছে করতো ঠিকই, তবে দুটো কারণে সেই সেলুনে ঢুকতাম না । প্রথমত ঠিক কত নেবে সেটা জানতাম না আর পরীক্ষা ব্যাপারটাই আমার কাছে বরাবর গডজিলার মত বিভীষিকা ।
ভয় ছিল, চুল কাটার আগে আবার পড়া টরা না ধরে ।
অগত্যা বিহার নরসুন্দর বাবুলাল ঠাকুরই ভরসা । বাড়ীতে এসে সের দরে দাদু থেকে শুরু করে মামাদের চুল দাড়ি কেটে চেঁছে সাফ করে দিতো ।
আমারটা ছিল ফাউ । কারণ অতগুলো মক্কেল পেয়ে তার হৃদয় গলিত হতো ।
আমি একদিন সাহস করে বাবুলালদাকে বলেছিলাম – উত্তমকুমারের মত চুল কাটতে পারবে ?

বাবুলালদা হো হো করে হেসে বলেছিল – উত্তমকুমার নাকি ওর খদ্দের। সরল কিশোর মনে বিশ্বাস করে মাথাটা ওর হাতে সঁপে দিয়েছিলাম ।
তারপরে আয়না দিয়ে দেখি – প্রায় ন্যাড়া আর মাথার ওপরে চার পাঁচ গাছি চুল ।
কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেছিলাম – এটা উত্তম ছাঁট ?
পরিশ্রম শেষে খৈনি ডলতে ডলতে বাবুলালদা ভাঙা বাংলায় বলেছিল :- ওই যে যিন ফিল্মমেঁ উত্তম জী লাউয়া কা রোল করেছিলোন্ ।

লাউয়া মানে যে নরসুন্দর সেটা জানতাম না । যাক্ তবু সান্ত্বনা । একটা কিছু তো হয়েছে !

দাদু আমাকে দেখেই গম্ভীর হয়ে গেলেন । দিদিমার মুখে আঁচল । তবু চানটান করে ভাত খেয়ে ইস্কুলে যাবার পথে দেখি প্যাঁক মারার আওয়াজ ।
যাঁরা প্যাঁক মারা কাকে বলে জানেন না – তাদের বলি হাত মুঠো করে কড়ে আঙুল উঁচু করে মুখের কাছে এনে শাঁখের মত আওয়াজ করাকে বলতো – প্যাঁক ।

ডান দিকে প্রথমেই পড়তো – সম্মিলিত বাস্তুহারা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় । মেয়েরা একবার করে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর হেসে গড়িয়ে পড়ছে অন্যদের ওপর ।

একজন তো বলেই বসলো - কাকতাড়ুয়াটা সেজেছে বেশ ! সেই প্রথম বুঝলাম – মানুষ নানা সমস্যার মধ্যেই বাঁচে ।
ইস্কুলে খালি চাঁটা পড়তেই লাগলো মাথায় । নতুন চুল না গজানো পর্যন্ত গানটা মনে মনে গাইতাম – সহে না যাতনা ।

এই একটা লাইনই জানতাম, কারণ পাড়ার অপর্ণাদি সন্ধে বেলায় একটা ভাঙা হারমোনিয়াম নিয়ে ফাটা রেকর্ডে পিন আটকে যাবার মত ঐ একটা লাইনই গাইতো রোজ ।
তারপরে সেই বজরঙ্গবলী সেলুনে সাহস করে ঢুকতেই দেখি একটা বেঞ্চিতে বসে বাবুলালদা খৈনি ডলছে । ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম ।

লায়েক হয়ে – একটা বড় সেলুনে ঢুকেছিলাম । সামনে পেছনে আয়না । গদি আঁটা চেয়ার । চুল কাটার নানা রকম মাথার ছবি দেয়ালে টাঙানো ।

ট্র্যানজিসটারে রেডিও সিলোনের হিন্দি গান বেজে চলেছে । সেই প্রথম দেখলাম – লোকে রাতেও চুল দাড়ি কাটে ।
আরেকবার বিউটি সেলুন লেখা দেখে স্যুয়িং ডোর ঠেলে ঢুকে পড়েছিলাম আরও ভালো কিছু হতে পারে ভেবে ।

তারপর শুধু পুলিশ ডাকা বাকী ছিল ।

বাবুলাল নিতো চার আনা আর সেলুনে নিতো দু টাকা । নামী জায়গায় পাঁচটাকা । এখানে নাকি চুল কাটালে দাড়ি কাটা ফ্রি । ব্যাপারটা আজও বুঝি নি ।

আজকাল প্রদীপ বাড়ীতে আমার চুল দাড়ি কাটতে আসে । দাড়ি ২০ টাকা । চুল – ৩০ টাকা ।

অ্যালবাট এসটাইল আর জেবনে হলো নি ।