একজন পাঠকের চোখে
+++++++++++++
একটা বিষয় ভুললে চলবে না, আমাদের বাল্য বা কৈশোরের থেকে এখনকার বাল্য বা কৈশোর অনেক এগিয়ে ।
পুলিশ- ভূত- প্রেত- দৈত্য- দানোর গল্প যেমন আমরা আগ্রহ ভরে শুনতাম বা পড়তাম, সেটা বোধহয় এখনকার বাচ্চারা সেভাবে শোনে বা পড়ে না ।
নেট এবং নানা বিষয় পড়া এবং শোনার ফলে- তাদের বুদ্ধিমত্তা অনেক খানি এগিয়ে গেছে, কালের নিয়মেই ।
কিন্তু, সুকুমার রায়ের লেখা বইগুলোর কাটতি কেন এখনও আছে ? “ননসেন্স আইডিয়া” এখনও ওদের টানে বলে ।
সুকুমার রায় যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন বলে, আমার অন্তত মনে হয় । তাই এইসব বই পড়ার উৎসাহে ভাঁটা পড়ে নি ।
আরও একটা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখবেন- সত্যজিৎ রায়ের লেখা ভূত – প্রেত বা অতি
পার্থিব লেখার থেকে প্রফেসর শঙ্কু কিন্তু এখনও সমান ভাবে জনপ্রিয়, অন্তত
আমার তাই মনে হয়েছে ।
“টেনিদা” আমাদের সময়ে অতি জনপ্রিয় ছিল, তার
কারণ ঐ সময়ের সাথে আমরা যারা নিজেদের বড়ো বলে দাবী করি, তারা সময়, বিষয় সব
কিছুর সাথে একাত্মতা বোধ করতাম ।
এখন মনে হয়- টেনিদার ঐ চরিত্র ছোটোদের কাছে অচেনা ( ভুল হতেও পারে, তাই আগাম ক্ষমাপ্রার্থী )
এখন যারা ২৫ থেকে ৩৫ য়ের কোঠায় তারা বাংলা সাহিত্যের এই দিকটা পড়েছেন, কিন্তু পরের প্রজন্ম কি পড়ছে ?
কিম্বা, ধরুন “ঘনাদা” ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিপ্রেক্ষিতে
বাঙালির বারফাট্টাই কে তিনি ধরতে চেয়েছিলেন একটি চরিত্রের মধ্যে ।
তিনি সফল ছিলেন, কারণ কিশোররাও ঐ সমাজের সাথে নিজেদের পাড়ার দাদা, পাতানো কাকা বা জ্যাঠার মধ্যে এই চরিত্রকে ধরতে পারতো ।
“ঘনাদা”র চরিত্র এখন সেভাবে প্রকট নয়- বর্তমান প্রজন্মের কিশোর/ কিশোরীদের কাছে ।
পরিবর্তে, ছোট থেকেই তারা দেখতে পাচ্ছে সমাজের নানা স্তরে হিংস্রতা, শঠতা,
মিথ্যে কথা- যে গুলো আমরা ভাবি তারা বোঝে না- তারা কিন্তু নিজেদের মত করেই
বুঝতে পারে ।
তারা ভাবে নিজেদের নিস্পাপ মনে- এগুলো সমাজ থেকে নির্মূল করতে হবে । খেয়াল করলে দেখবেন , তাই এখনও “ফেলুদা” সমান ভাবে জনপ্রিয় ।
শঙ্কু যদি বিজ্ঞান নির্ভর কাহিনী হয়, সেখানে ফেলুদা অ্যাডভেঞ্চারের গোয়েন্দা ।
এখন যাঁরা “প্রতিষ্ঠিত” সাহিত্যিক আছেন, তাঁরা মাত্র কয়েকজন এই চেষ্টা
করেছেন বা করছেন, কিন্তু সিংহভাগই সেই ভূত- প্রেত- পুলিশের মধ্যে আটকে থেকে
বর্তমান প্রজন্মের কাছে মনে হয়- হাস্যকর হয়ে উঠছেন ।
শরদিন্দু
বাবুর “ব্যোমকেশ” এখন ভালো ভাবে মাথাচাঁড়া দিচ্ছে, তার কারণ, তিনিও তাঁর
সময়রেখার মধ্যে টানটান গল্প লিখে গেছেন- যেটা বর্তমান প্রজন্মকে টানছে ।
আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়- কিশোর সাহিত্য যাঁদের হাত ধরে “সাবালক” হবার কথা, তাঁরা এই বিষয়ে একটু ভেবে দেখবেন ।
এই বিজ্ঞানের যুগে কিন্তু বিজ্ঞান নির্ভর গল্প বা উপন্যাসের প্রয়োজন আছে,
তেমনই দরকার আছে ইতিহাসাশ্রিত গল্প বা উপন্যাসের- যে গুলো মজার ঢঙ্গে লিখে
কিশোরদের কাছে পরিবেশন করা ।
তা যদি, না করতে পারা যায়- তবে কিশোররা মনে হয় রঙচঙ্গে পূজা বার্ষিকি গুলো নেড়ে চেড়েই রেখে দেবে- পড়বে না ।
আমরা যারা- বৃদ্ধ/ প্রৌঢ় বা যৌবনের মাঝামাঝি তাদের অভ্যাসের বশে টানবে এই
সব পূজা বার্ষিকি গুলো, কিন্তু টার্গেট রিডারদের কাছে কতখানি পৌঁছবে তা
নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে আমার দ্বিধা রয়েই গেল ।
খুব সম্প্রতি আনন্দমেলায় দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের Debjyoti Bhattacharyya লেখা “ইচ্ছেপলাশ” উপন্যাসটি পড়ে আমার এত গুলো কথা লিখলাম ।
আমার মনে হয়েছে- এই লেখাটির মধ্যে একটা বেশ তরতাজা ভাব এবং বেশ কিছু
বৈজ্ঞানিক তথ্য তরল ভাবে আছে, যা বর্তমান কিশোর/ কিশোরীদের কাছে উপভোগ্য
হবে ।
বেশ সাবালক লেখা- “নাবালক/ নাবালিকা” দের জন্য ।
( একান্ত ব্যক্তিগত মত )

No comments:
Post a Comment