টুকরো- টাকরা -৫
+++++++++ পৃথিবীতে যত ভাষা আছে, সে গুলো শেখা এক জন্মের কম্মো নয় । তবে, একটাই সর্বজনীন ভাষা আছে, নাক ডাকা । কত বিচিত্র যে তার তাল, লয়, মীড়, গমক, মূর্চ্ছনা, সে আর বলে শেষ করা যাবে না। কবিতার ছন্দ থেকে শুরু করে গদ্যের সমাহিত ভাব, সবই উপস্থিত । জানি না, ভাষাবিদরা এই নাক ডাকাকে এসপারেন্তোর মত সর্বজনগ্রাহ্য ভাষা বলে স্বীকার করবেন কিনা, তবে করলে ভালো হয় । এটাও জানি না, পশু পাখীরা নাক ডাকে কিনা, তবে আমি বাইশ তেইশ বছর আগে আমার এক বন্ধুর বাড়ীতে তার পোষা বৃদ্ধ অ্যালসেসিয়ানের নাক ডাকা শুনেছিলাম, দিনের বেলা । মনে হলো – দিন তো গেল, হরি পার করো আমারের সুরে, নাক ডাকছে তার । কালো নাসারন্ধ্র দুটো, তালে তালে নেচে নেচে- আয় মা শ্যামার বোল তুলেই যাচ্ছে । পেত্যয় করবেন কিনা, সেটা আপনাদের ব্যাপার, তবে নিজের কানের প্রতি আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে । চিলে নিয়ে যায় নি এখনও আমার কানটা! যাকগে, প্রসঙ্গে ফিরে আসি । খাওয়া দাওয়া চলছে ! আপ্পারাও পরমানন্দে চিবিয়ে চলেছে শুকনো পুরি আর আলু ভাজা, মাঝে আচারের টাকনা । আমরাও খেয়ে চলেছি অবিচ্ছিন্ন ভাবে । আমাদের নিয়ে যাওয়া চিকেন কষা আর প্রমোদের আনা চিকেন চাঁপের ফিউশন সুবাস, সারা কামরাকে মাতিয়ে রেখেছে । হ্যালো, দাদু- আমি মহেশ আগরওয়াল । আপনাদের সাথে পরিচয় করতে এলাম । নমস্কার, নমস্কার বসো ভাই বসো ! কিন্তু তোমার এই চিকেনের গন্ধ কি সহ্য হবে ? কি যে বলেন দাদু ! ওই লোভেই তো এলাম । বলো কি হে ? মারওয়াড়ীরা তো এই সব সহ্য করতেই পারে না ! আরে দাদু, এখন সেই জমানা নেই আর, বুঝলেন ? কি যাতা বলছো ? ঠিক বলছি । আমার দিদি তো বিয়ে করেছে বাঙালিকে । দিদির তারপর থেকে মাছ ছাড়া ভাতই রোচে না মুখে ! আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় ! দুঃখ কি জানেন ? কি? জামাই বাবুর সুন্দরী ছোট বোনটা পাত্তাই দেয় না আমাকে । কেন ? বলে, তোমার সাথে প্রেম করবো কি, সারা গা দিয়ে তো ভঁয়সা ঘিয়ের বাজে গন্ধ ! তারপর, তারপর ? এতো ফেসবুকে রেজিয়াল কমেন্টের মত ! তারপর আর কি, ওকে আর্সেনেলের বিরিয়ানী, সাবিরের রেজালা, দিলখুসার কষা মাংস খাইয়ে আর নিজে খেয়ে একটু লাইনে আনতে পেরেছি । তোমার বাড়ীতে জানে, মানে তোমার এই খাবার ব্যাপারটা ? চিকেন পক্স হলে কি আর চাপা দেওয়া যায় ? উরি ত্তারা ! তা, মা বাবা কি বললে ? কি আর বলবে ! আমাকে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতে বলেছে, বিয়ের পর ! ত্যজ্য পুত্র করবে না তো ? না না, সে চান্স নেই ! আমার মা তো বাঙালি, তবে খাওয়া দাওয়া সব নিরামিষ ! বাঙালি নারীর কি আত্মত্যাগ ! প্রেমে সব কিছু হয় দাদু ! তবে বলছিলাম কি, আমাকে এক পিস চিকেন আর একটু গ্রেভি দেবেন ? মা ঘি মাখানো রুটি আর মোটা লাল লঙ্কার আচার দিয়েছে, প্যাক করে । গলা দিয়ে নামছে না ! লজ্জার মাথা খেয়ে চাইলাম ! আহারে ! আগে বলবে তো ! নাও নাও ! থেংক্যু, থেংক্যু ! তারপর আর কি ? আলো নিবিয়ে , পর্দা টেনে চললো আর্ন্তজাতিক ভাষায় কথা বার্তা |
Sunday, June 5, 2016
প্রেম
সমর চক্রবর্তী
রায়গঞ্জ শহরে – সমর (চক্রবর্তী) ডাক্তার খুব নামকরা চিকিৎসক ছিলেন । প্রথমে, তাঁর চেম্বার ছিল মিটার গেজ লাইনের লেভেল ক্রসিংয়ের সামনে, তবে পরে তিনি সরিয়ে নিয়ে যান, মোহনবাটীর কাছাকাছি এক জায়গায় ।
ফর্সা, চশমা পরা এই চিকিৎসক রসিক এবং দরদীও বটে । মাঝেই মাঝেই দুটো ঠোঁট দিয়ে, গাল ফুলিয়ে একটা শব্দ করা তাঁর অভ্যাস ছিল ।
আসলে তিনি কোন ওষুধটা প্রেসক্রিপশানে লিখবেন, সেই চিন্তা করার সময় এই ব্যাপারটা ঘনঘন করতেন ।
আমি সোজাসুজি তাঁর ভীড়ে ভরা চেম্বারে ঢুকেই পড়তাম সখ্য হয়ে যাবার পর, কারণ তিনি এই অনুমতিটা আমাকে দিয়েই রেখেছিলেন আরও কয়েকজন হাতে গোনা বেচুবাবুদের সঙ্গে ।
একবার, এই রকমই ভাবছেন আর শব্দ করেই যাচ্ছেন । আমার দিকে চোখ পড়াতে বললেন – এই আমাশা কেসে কি ওষুধ দেই বলো তো , মেট্রোনিডাজোল না টিনিডাজোল ?
আমি বললাম :- জিল ৬০০ লিখুন ।
সেটা কি ?
আমাদের কোম্পানীর টিনিডাজোলের ব্র্যাণ্ড
কবে বেরুলো আবার ?
এই তো জাষ্ট লঞ্চ করতে এসেছি রায়গঞ্জ মার্কেটে । আপনাকে দিয়েই বউনী শুরু হোক!!
পাওয়া যাবে তো লিখলে ?
কি যে বলেন !!! মার্কেটে অ্যাভেলেবল করেই তো বলতে এসেছি আপনাকে !!!
তালে লিখি?
লিখুন
বেশ (খানিক থেমে ), তুমি তো আচ্ছা লোক হে, এই ফাঁকে ডিটেইলিংটা করে নিলে!!
দাদা, আপনি ট্রেণ্ড সেটিং ডাক্তার !!! আপনি লিখলে আপনার ফলোয়াররাও তো লিখবে, তাই না ?
এটা কোন কোম্পানীর ?
মানে ?
ইণ্ডেন না এইচ পি ?
ইতি মধ্যে- একজন বাচ্চার মা আবার ফিরে এসে বললেন:-
আচ্ছা ডাক্তার বাবু আমার ছেলেটাকে আপেল সেদ্ধ খাওয়াতে পারি ?
মুখ দিয়ে তাঁর ইনসিগনিয়া শব্দটা করে উত্তর দিলেন :- নিজে কোনোদিন আপেল সেদ্ধ খেয়েছেন ?
না !
জানেন কি রকম অখাদ্য খাবার ? যত্ত সব !!! পেয়ারা সেদ্ধ খাওয়ান ।
আমার দিকে ঘুরে বললেন – তা হলে ওই জিল ৬০০ ই লিখলাম !!!
=============
পরে, তিনি কেন জানি না, টিনিডাজোল লিখলে আমাদের ব্র্যাণ্ডটাই লিখতেন ।
যেখানে উনি এখন চলে গেছেন সেখানে -কেমন আছেন উনি, কে জানে !!!
থেটার
আমাদের পাড়ায় প্রতিবছর, পূজো হয় । পাড়ার মহিলাবৃন্দ পরিচালিত- ফেষ্টুনটা
হাল্কা দোল খায় । এবছরও দোল খেতে শুরু করেছিল । হরির দোকানে, এই নিয়ে জোর
আলোচনা !
লাহা কোলোনীর একজন জিজ্ঞেস করল:- রামুদা, আপনাদের পাড়ার পুরুষরা থাকে না পূজো কমিটিতে ?
মিনমিন করে বললাম :- গিন্নিরা থাকতে, আমাদের ভয় করে ওখানে থাকতে । তবে, থেটার হয় । আমরাই করি ।
এবছর হবে কি?
জিজ্ঞাসা নিয়ে,ক্ষেতু বাগচি এসে বসলেন । উনি বললেন :- থেটার করলে, আমাকে ডাকবেন না !!!!!
ক্যান স্যার ?
হরির বিনীত জিজ্ঞেসা !
আর বলো না হে ! সে বড় ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা । সব লোকই চায় মেন পার্ট করতে । আর না দিলেই একটা বিটকেল ব্যাপার ।
আমরা সবাই ঘন হয়ে ক্ষেতুদার চারপাশে, বসে আর দাঁড়িয়ে পড়লাম । হরি গদগদ
ভাবে একটা চায়ের গেলাসের অদৃশ্য ময়লা আর জীবাণু গরম জলে চুবিয়ে ঠিকঠাক করে,
সশ্রদ্ধভাবে চা তুলে দিল ক্ষেতুদার হাতে । ওনার চুমুক দেওয়া দেখে মনে হল,
উনি বেশ আয়েস করেই চা উপভোগ করছেন ।
তখন সাউথের একটা পাড়ায় থাকি ।
সেখানকার পূজো দারুন নাম করা । থীমের পূজো । সে বছর আমার ওপর ভার পড়ল
থেটারের ডিরেকশান দেওয়ার । নবমীর দিন মঞ্চস্থ হবে ।
যিনি ষ্টেজ
আরেঞ্জার থাকেন বরাবর, তিনি এবারে জেদ ধরে বসলেন- ওনাকে একটা ভালো রোল
দেবার জন্য । মুশকিল হলো একটাই, উনি এত ভালো ষ্টেজের সব জিনিসপত্র ঠিকঠাক
ভাবে যোগাড় করেন আর অভিনয়ের সময়- যোগান দেন, যে অন্য লোককে সেই ভার দেওয়া
মুশকিল । একটা ছোট খাটো রোল দেওয়া যেত, কিন্তু ওনার জেদ বড় রোল করবেন ।
অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ওনাকে বলা হলো- আপনি যদি ষ্টেজ আরেঞ্জার না থাকেন, তবে পুরো প্রোডাকশানটাই মার খাবে ।
হাসিমুখেই তার জেদটা ছাড়লেন আর আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম ।
যথাদিনে, যথাসময়ে অভিনয় আরম্ভ হলো । থেটারের মধ্যকাল চলে এসেছে । এখানে এক
ভদ্রলোককে খুন করতে এসেছে এক ভাড়াটে গুণ্ডা । পিস্তল দিয়ে গুলি করবে ।
ষ্টেজ আরেঞ্জার ভদ্রলোক ঠিক সেই সময়ে একটা পটকা ফাটাবেন, যাতে গুলির আওয়াজ
দর্শকদের কানে যায় ।
ভাড়াটে গুণ্ডা গুলি করল । শব্দ হলো না । নিরুপায়
হয়ে গুণ্ডা ছুরি বের করে ভদ্রলোকের পেটে ঢোকাতেই ষ্টেজের পেছনে পটকার শব্দ
হলো – দ্যুমমমমমমমমমমম্ ।
ঘনাদা ও ঘনার বচন
শারদীয় " কৈশোরকে" প্রকাশিত
====================
‘এদের গল্প শোনবার জিনিস, বিশ্বাস করবার নয়। তবে বিশ্বাস করাই ভাল, নইলে
ঠকতে হয়’–মন্তব্যটি করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী তাঁর সৃষ্ট নীললোহিত চরিত্রের
পরিচয় দিতে গিয়ে।
শিশু-কিশোর সাহিত্যের যাঁরা মুগ্ধ পাঠক, তাঁরা
জানেন প্রমথ চৌধুরী কি অপূর্ব নৈপুণ্যে তাঁর নীললোহিত চরিত্রটি সৃষ্টি
করেছিলেন। তবে এ-কথাও ঠিক যে, এখনকার পাঠক অনেকেই কিন্তু নীললোহিতের কথা
জানে না। যাই হোক, তিনি কি তাঁর আগে এ-রকম কোনও চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত
ছিলেন?
ঘনাদার জন্ম অনেক পরে হয়েছে তা অবশ্যই ঠিক, কিন্তু ব্যারন মাঞ্চোসেনের কথা চৌধুরী মশাইয়ের মাথায় ছিল না, এমন নয়৷
চৌধুরী মশাই জানিয়েছিলেন, “কাইজার নাকি তাঁকে বলেছিলেন যে নীললোহিত যদি
তাঁর সঙ্গে জার্মানিতে যান, তাহলে তিনি তাঁকে সাবমেরিনের সর্বপ্রধান
কাপ্তেন করে দেবেন। যে মাইনে কাইজার তাঁকে দিতে চেয়েছিলেন তাতে তাঁর
পোষায় না বলে তিনি সে প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন৷”
ওদিকে প্রেমেনবাবু
ঘনাদাকে দিয়ে বলান, “সেই যে সাংকুর নদীর ধারে এম বুজি মাঈ থেকে হিরে
পাচার করার জন্য আমায় ম্যাজিকের ধোঁকা দিয়ে এপুলু-তে নিয়ে গিয়ে মিথ্যে
খবরে ইতুরি-র গহন বনে পাঠিয়ে জংলিদের ঝোলানো ফাঁসিতে লটকে মারার চেষ্টা
করেছিল, আর যার মতলব হাসিল হলে পৃথিবী আরও বিরাট হয়ে দুনিয়ার কি দশা হত
জানি না, সেই মালাঞ্জা এমপালে ভেবেই আপনাকে একটু তাচ্ছিল্য করেছিলাম
গোড়ায়৷”
গল্প পরিবেশনে এই দুরন্ত অননুকরণীয় ভঙ্গি বাংলা সাহিত্যে বিরল।
বাংলা সাহিত্যে যাকে টলস স্টোরি বা টল টেলস-এর মর্যাদা দেওয়া হয়, তাকে
আর্টের পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন প্রমথ চৌধুরীই, মাঞ্চোসেন বা নীললোহিত
যে-কৌলীন্য অর্জন করেছিল, তার উত্তরসূরি হল ঘনাদা।
১৯৪৫ সালে দেব
সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী “আলপনা” য় ঘনাদা সিরিজের প্রথম গল্প "মশা"
প্রকাশিত হয়। এই সিরিজের প্রথম বই ঘনাদার গল্প ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত ।
ঘনাদার গল্পগুলি দুটি বর্গে বিভক্ত - কল্পবিজ্ঞান আর ঐতিহাসিক গল্প।
লম্বা, হাড়-জিরজিরে দেহের গড়ন। আর ইয়া লম্বা তার নাক। বয়স? সে কথা আর
না বলাই ভালো, আন্দাজ করাই ভার! ৩৫ থেকে ৫৫- এর মধ্যে একটা কিছু হবে।
জিজ্ঞাসা করবে কে? অমনি বলবেন, এত দেশ ঘুরেছি, বয়সের হিসেব রাখবো কি করে?
এমন লোককে কি, ঠিক গুলবাজ বলা যায়!
ঘনাদা প্রেমেন্দ্র মিত্রের
সৃষ্ট চরিত্র। পুরো নাম ঘনশ্যাম দাস। থাকেন, বেহালার-৭২ নং বনমালী নস্কর
লেনের একটি মেসের তেতলার এক চোরা কুঠুরিতে। খালি সকলকে গল্প শোনান, আর
শিশিরের কাছ থেকে ধার করে সিগারেট খান, কোনো কাজই করেন না।
তবে,
তিনি কিন্তু অকৃতজ্ঞ নন, প্রতিবার ধার করেন আর শিশিরকে বলেন কত তম সিগারেট
ধার করলেন। আর তিনি যে অনেক সিগারেট ধার করেছেন তাও কিন্তু নয়, এক গল্পে
দেখা গেলো সংখ্যাটা ২৮৫৭, কয়েক গল্প পরেই সেটা ৩৮৯৯, এ আর কতো-ই বা!
এখানেই তার কীর্তির শেষ নয়।দু:খের বিষয় – প্রায় প্রতিটা গল্পের শেষেই
শিশিরের সিগারেটের টিনটা ঘনাদার হস্তগত হয়ে যায়, সেটা আর ফেরত পাওয়ার
কোনো আশা থাকে না| ওনার মেস ভাড়া বলতে গেলে বাকিই পড়ে থাকে।
তবু
মেসের বাকি সদস্যরা, মানে শিবু, শিশির, গৌর আর সুধীর তাকে বেশ পছন্দই করে।
তাকে আরাম কেদারা ছেড়ে দেয়, তার জন্যে দুইদিন পরপর নবাবী খানার ব্যবস্থা
করে দেয়, কেবল তার গল্প অর্থাৎ গুল-গল্প শোনার জন্যে।
এই মেসের
অন্যান্য চরিত্রদের মধ্যে আছে রামভুজ নামের রাঁধুনি ঠাকুর আর সর্ব ঘটের
কাঁটালি কলা ফরমাইস খাটা- বানোয়ারী – মেসের বাবুদের ফাই-ফরমাস খাটিয়ে –
মাঝে মাঝেই বনোয়ারীর ওপর দায়িত্ব পড়ে চ্যাঙ্গারী চ্যাঙ্গারী সুখাদ্য
সরবরাহ করার।
এই অদ্ভুত মজার আর গুলবাজ (?) ঘনাদা কিন্তু বেশ
জ্ঞানী। তিনি বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন সব বিষয়ে এতো
বেশি জানেন, তাকে টেক্কা দেবে কে?
আর তাই তো তার গুল্প শুনে এত
মজা। গল্পে গল্পে কখন যে বিজ্ঞানের মজার মজার সব ব্যাপার শিখিয়ে দেবেন,
কেউ টেরও পাবে না। আর সে যে কি ভয়ানক সাহসী আর বীর, তার আর কি বলবো!
কত পালোয়ান দেখা যায় তার কাছে মার খেয়ে চিৎপটাং। কত বিপদে কত ভয়াবহ কাজ করার কথা আছে তার গল্পে।
অথচ একবার যখন মেসের সবাই মিলে ঘুরতে বের হলো, প্লেনে চড়তেই তার সে কই
ভয়! অবশ্য গল্প শুনিয়ে তিনি প্রমাণ করে দিলেন, তিনি মোটেই ভয় পাচ্ছেন
না। তিনি আসলে অতো বাজে প্লেনে চড়েনই না!
বনমালী নস্কর লেনের এই মেসবাড়ি ছাড়াও কয়েকটি গল্পে বা উপন্যাসে লেকের ধারের সান্ধ্য-আড্ডায় ঘনাদাকে আসার জমাতে দেখা যায়।
এখানে ঘনাদা আর সাধারণ ঘনাদা নয় – ইনি এখন ঘনশ্যাম বাবু। এই সব
গল্পগুলিতে মেসবাড়ির মজলিশি আড্ডার পরিবর্তে গুরুগম্ভীর আলোচনার মেজাজ
লক্ষ্য করা যায়। কথা-সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখনীর মুনশিয়ানা
দাপটে এখানে এসে হাজির হন
ঘনাদার পূর্বপুরুষরা – ঘনাদা এই সব
গল্পগুলির নায়ক নন, পরিবর্তে পৃথিবী রক্ষার দায়িত্বে আসেন ‘তস্য তস্য’
ব্যক্তিরা। ইনকা সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে শিবানীর আগ্রা থেকে পলায়ন –
এইসব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনায় ঘনাদার পূর্বপুরুষ গানাদো বা ঘনরাম
দাসের অবদান - লেকের ধারের এই আড্ডা ছাড়া জানা কখনই সম্ভব ছিল না।
স্মরণ করা যাক, ঘনাদার প্রবীণ বন্ধুদের পরিচয়৷ যাঁরা একটি জলাশয়ের ধারে
একটি নাতি বৃহৎ পর্কটী বৃক্ষকে কেন্দ্র করে সমবেত হন৷ তাঁরা কে? না–মেদভারে
হস্তীর মত বিপুল সেই সদা প্রসন্ন ভবতারণ বাবু, উদরদেশ যার কুম্ভের মত
স্ফীত সেই রামশরণবাবু, মস্তক যাঁর মর্মরের মত মসৃণ সেই শিবপদবাবু, মাথার
কেশ যাঁর কাশের মত শুভ্র সেই হরিসাধনবাবু এবং উষ্ট্রের মত শীর্ণ ও
সামঞ্জস্যহীন–আলোচনার প্রাণ ও প্রাণান্ত ঘনশ্যাম দাস ওরফে কোনও মহলে যিনি
ঘনাদা৷
লেকের ধারের এই আড্ডার গল্পগুলিতে নায়িকার আবির্ভাব ঘটেছে ও
কিছু পরিণত দৃশ্যেরও সূচনা হয়েছে, সেকারণে বলা যেতে পারে যে এই গল্পগুলি
পরিণত বয়স্ক পাঠকদের কথা মাথায় রেখেই প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন।
এই সব গল্পের যিনি লেখক, সেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের ডাক নাম ছিল – সুধীর ।
শিবু, গৌর ও শিশির চরিত্রগুলি যথাক্রমে লেখক শিবরাম চক্রবর্তী, চলচ্চিত্র
পরিচালক ও সম্পাদক গৌরাঙ্গ প্রসাদ বসু এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক ও অভিনেতা
শিশির মিত্র ।
এই চারজন সত্যিই বেহালার একটা মেসে থাকতেন, একসঙ্গে ।
এই সূত্রেই অনেকের জানতে ইচ্ছে করে ঘনাদা, চরিত্র কল্পনাকালে লেখক কোনও
বাস্তব চরিত্র অবলম্বন করেছিলেন কি না।
এ নিয়ে বেশ মজার ইতিহাস
আছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর ঘনাদা চরিত্র কল্পনা করেছিলেন দুই বিশ্বযুদ্ধ
মধ্যবর্তী মধ্যবিত্ত বাঙালি মানসিকতার বারফট্টাইকে মনে রেখে। কারও মতে
ঘনাদা আসলে বিমল ঘোষ নামে মেসের এক বাসিন্দা, যাঁকে প্রেমেনবাবু ডাকতেন
টেনদা বলে।
সেই ঘনাদা, আমাদের আজও আনন্দ দিয়ে চলেছেন, অনবরত ভাবে । আর কি কেউ লিখতে পারবেন এই ভাবে? কে জানে !!!!!!!!!!!!!
============================================
অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং ঋণ : -
১।অরুণাংশু ভট্টাচার্য ( দি সানডে ইণ্ডিয়ান) ।
২।ঘনাদা সমগ্রের মুখবন্ধ।
৩। ইন্টারনেট ।
Saturday, June 4, 2016
কিছু কথা
স্কুল থেকেই ইতিহাসে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না । সন, তারিখ মুখস্থ করা- কে কবে কোথায় আক্রমণ করেছে, সাম্রাজ্য বিস্তার কি ভাবে করেছে এইসবই ছিল মুখ্য বিষয় ।
কোনোরকমে টায়েটুয়ে পাশ করে যেতাম ক্লাসে । পরে, যখন ক্লান নাইনে উঠে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হলাম, কিছুটা অঙ্ক জানার জন্য- যার জন্য আমি কৃতজ্ঞ প্রয়াত বিজন স্যারের কাছে- ইতিহাস পড়তে হবে না ভেবে বিশাল স্বস্তি পেয়েছিলাম ।
যে কোনো কারণেই হোক- কারণটা মুখ্য নয়, আমি একটা বেসরকারী চাকরি পেলাম একটা ওষুধ কোম্পানিতে ।
ওডিশা থেকে আমার চাকরি শুরু । নানা জায়গায় ঘোরার ফলে- সেখানকার মানুষজনের ব্যবহার সংস্কৃতির বৈচিত্র্য দেখে আবার আমার ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ জন্মালো ।
ইতিহাসের সঙ্গে – আর্থ সামাজিক অবস্থারও একটা যোগ আছে বলে আমার মনে হয়েছিল।
ইতিহাস যে ভাবে আমাদের স্কুলগুলোতে পড়ানো হয়, কলেজ বা ইউনিভার্সিটির কথা বলতে পারবো না- তাতে আমার মনে হয়েছে গোটা সিস্টেমটাই ভুল ।
এক্সকারশান ছিল তবে, তাতে যতটা ঘোরার আনন্দ ছিল, ততটা ইতিহাস মনস্কতা ছিল না ।
পুরীতে যখন আমার পোষ্টিং হয়, সৌভাগ্যবশত আমার কোম্পানীর বিতরক ছিলেন একজন পাণ্ডা নিজে । তিনি নিজের ছেলেদের এই বৃত্তিতে না এনে প্রথমে ওষুধ,তারপর হোটেল এবং অন্যান্য ব্যবসায়ে জড়িয়ে দেন ।
তিনি উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসের স্নাতক ছিলেন । ফলে নানা যুগ ধরে ছড়িয়ে থাকা নানা গল্প গুজবকে পাত্তা না দিয়ে আসল সত্যটাকে খুঁজে বেড়াতেন।
নিজে ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদ যে কি ভাবে ক্ষতি করেছে আমাদের ইতিহাসকে , সেটা নিয়ে সময় পেলেই আলোচনা করতেন আমার সাথে ।
ধীরে ধীরে আকর্ষণ বাড়তে লাগল – ইতিহাসের প্রতি, যোগ্য শিক্ষক পাওয়াতে ।
পতি বাবুর কাছেই প্রথম জানলাম মাদলা পঞ্জীর কথা । পঞ্জী মানে তথ্যের সারণী, পাঁজি নয় ।
মাদলা পঞ্জীকে কেন যে প্রকাশ করতে দিচ্ছে না, পুরীর পাণ্ডাকুল, তার একটা ব্যাখ্যা আমি পেয়েছিলাম। তবে সেটা কতটা নির্ভরযোগ্য -সন্দেহ আছে।
ওখানে নাকি চৈতন্য দেবকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের কথা লেখা আছে বা ছিল।
মাদলা পঞ্জীর লেখকরা অঙ্গিকার বদ্ধ ছিল এবং আছে- কোনো খুঁটিনাটি বিবরণও চাপা যাবে না। তাই ওটা বোধহয় অপ্রকাশিত থেকে যাবে। আর সেই কারণে ওটা আনেকডোটাল!
তবে পতি বাবু বলেছিলেন – চৈতন্যদেবের সময়ের কিছু পাতা নাকি ছেঁড়া আছে, মাদলা পঞ্জীতে ।
জানি না সত্যি কিনা , তবে পতি বাবু নিশ্চিত ছিলেন চৈতন্য দেবকে পুরীতে হত্যা করা হয়েছিল ।
মূল কারণ- মহিলাদের শিবপূজা করার অধিকার পাইয়ে দেবার জন্য, এই হত্যা । হয়তো নারায়ণ শিলাও পূজার অধিকার মহিলারা পেতেন চৈতন্যদেব বেঁচে থাকলে ।
আজকাল-পত্রিকা চৈতন্য দেবকে হত্যা করার কথা কিছুটা ছেপেছিল অনেকদিন আগে, তার পরে কোনো অজ্ঞাত কারণে চুপ হয়ে যায়।
সংস্কৃত সাহিত্য পড়তে গেলে, একজন গাইড লাগে। শুধু অনুবাদ পড়ে কিছু জানা যায় না! সেই গাইড শুধু সাহিত্যের ব্যাপারটা, ব্যকরণ নিয়ে বলবে।
ধর্ম নিয়ে প্যানপ্যানানি করবে না।সেটা কিছুটা আমি পেয়েছিলাম, পতিবাবুর কাছ থেকে।
বিশ্বনাথ মহারণার নাম ওড়িশা গিয়ে শুনেছেন? তাঁকে সেইকালের বিশ্বকর্মা বলা হতো। কোণারক মন্দির তাঁরই হাতের তৈরী। অন্যান্য কিছু মন্দিরও তাঁর নির্দ্দেশে তৈরী হয়েছিল।
মহরণা- সেকালের এঞ্জিনিয়ারদের পদবী ছিল। কিন্তু এটা জনশ্রুতি বলেই পরিচিত ।
আর্কিওলজিকাল সার্ভের কিছু অফিসারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তাঁরা বলেছিলেন, কোণারকের মন্দির ব্রজলেপ দিয়ে তৈরী বলে মনে হয়।
এটার বর্ণণা বৃহ্ৎসংহিতাতে বরাহমিহির লিখে গেছেন। প্রস্তুতপ্রণালী ব্যাখ্যা করেছেন যা আধুনিককালের সিমেন্টের সমগোত্রীয় ছিল।
আজকাল এই সবের আর কোনো দরকার আছে বলে মনে হয় না। যা হারিয়ে গেছে, তা গেছে।
ঐতিহাসিকদের বই তো পড়বোই কিন্তু সাথে সেই সময় কিছু লোক তাঁদের কথা লিখে গেছেন বিভিন্ন বইয়ে । সেগুলোও পড়া দরকার ।
না পড়লে- সাধারণের জীবনযাত্রার বিবরণ পাওয়া মুশকিল ।
হ্যাঁ ! অতিরঞ্জনও থাকে, তবে সেগুলো বাদ দেওয়া যায় সমসাময়িক অন্য লেখকদের লেখা পড়লে ।
ফলে- যে গুলো কমন পড়ে, আমার মনে হয় সেগুলো সত্যি হতে বাধ্য ।
ঐতিহাসিকরাও ধর্মদোষে দুষ্ট । কোনো মুসলমান ঐতিহাসিক বলবেন – তুর্কি বিজয় আবার হিন্দু ঐতিহাসিক বলবেন – তুর্কি আক্রমণ ।
এখন কে ফয়সালা করবে আক্রমণ না বিজয় ?
আমার দুভার্গ্য কোনোদিনই ভাবিনি এসব লিখবো, কারণ তখন ফেসবুক বা আর্ন্তজাল ছিল না ।
তবে একটা খাতাতে লিখতাম, যা কিছু শুনতাম বা দেখতাম ।
অবহেলার ফলে সেই সব খাতা হারিয়ে গেছে ।
তাই এখন ভরসা পুরোনো বইয়ের পিডিএফ সংস্করণ ।
চেষ্টা জারি থাকবে প্রাচীন ভারত নিয়ে লেখার সাথে অবিভক্ত বাংলার কথা ।
আনেকডোটালও কিছু লিখবো, কারণ জনশ্রুতিকে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা বহাল তবিয়তে এখনও আছে ।
যেমন আছে, পুরাণ এবং আরও অনেক সংস্কৃত সাহিত্যের বর্ণণাকে উড়িয়ে দেবার । কারণ একটাই- প্রমাণের অভাব ।
তবু, যেসব লোকেরা এই সব ঘেঁটে আসল নির্য্যাস বের করে আমাদের সামনে আনেন, তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতেই হয় । আমার মনে হয় এঁরাই- সঠিক বিচারে ঐতিহাসিক ।
ধর্মশাস্ত্র বা যুদ্ধবিগ্রহ থেকেই ইতিহাসের সূত্রপাত হয়!
*Mythology is to be considered to be the parent of all history!!!!
Sir William Jones: - History of the primitive world!
History কথাটার উদ্ভব, বহু হাজার বছর আগের গ্রীক শব্দ HISTOR থেকে। যার অর্থ:- Knowledge and judgment। পরে ল্যাটিন শব্দ Historia আরও একটা অর্থ যোগ করে। সেটা হলো- বর্ণণ বা narration।
অলমতি
চৈতন্য দেব
ঠাকুরদা, মধুকর মিশ্র ওড়িশার যাজপুর থেকে রাজা ভ্রমরের অত্যাচারের ভয়ে ,অবিভক্ত বাংলার শ্রীহট্টে এসে বসবাস শুরু করেন। এই শ্রীহট্টই হলো এখনকার সিলেট। পরে, মধুকর মিশ্রের ছেলে জগন্নাথ মিশ্র সংস্কৃত শেখার জন্য নদীয়া জেলার নবদ্বীপে এসে সেখানেই থেকে যান।
পড়া শেষ হলে, জগন্নাথ মিশ্র, নীলাম্বর চক্রবর্তীর মেয়ে শচীদেবীকে বিয়ে করেন। এঁদের পরপর সাত মেয়ে হলেও সব কটা অকালে মারা যায়। পরে,দুই ছেলে- বিশ্বরূপ আর বিশ্বম্ভর কিন্তু অকালে মারা যান নি। সেকালে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যেত সবার। ষোলো বছরে বিশ্বরূপের বিয়ের কথা হলে, তিনি সন্ন্যাসী হয়ে সংসার ছেড়ে চলে যান।
জগন্নাথ মিশ্র ভাবলেন- অল্প বয়সে বেশী পড়াশোনার করার ফলেই বড় ছেলের এই হাল! একে তো সাত মেয়ে মারা গেছে, তার ওপর বড় ছেলে বিবাগী হয়ে চলে গেল, ফলে বিশ্বম্ভর কে আর পড়াশোনা করতেই পাঠালেন না!!!!!! বিশ্বম্ভরের ডাক নাম ছিল নিমাই!
কিন্তু, মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক!!!!!! দুষ্টু নিমাই পরে কি হয়েছিল, সেটা বলছি!!!! তার আগে ওর ছেলেবেলার কথা বলে নিই! খুব মজা পাবেন।
ওহো! নিমাইয়ের জন্ম তারিখটা তো বলতেই ভুলে গেছি। ১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ ই ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার সন্ধে ৬ টা থেকে ৭টার মধ্যে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার মায়াপুরে নিমাইয়ের জন্ম।
পাঁচ বছর থেকেই মহা দুষ্টুমি শুরু করেছিল এই নিমাই। তখনকার সব লোক গঙ্গাতে স্নান করতে যেতেন।
একটা বিশ্বাস তখনও ছিল, এখনও আছে! গঙ্গাতে স্নান করলে নাকি সব পাপ দূর হয়।
তাছাড়া, তখন তো আর ঘরে ঘরে স্নানঘরে শাওয়ার, বাথটাব ছিল না! ফলে লোকে গঙ্গাতেই স্নান করত। আর সেখানেই শুরু হত নিমাইয়ের দুষ্টুমি!
ব্রাহ্মণরা স্নান করে উঠলেই গায়ে গোবোর মেশান কাদা ছুঁড়ে দিতেন। কারও শিবঠাকুর নিয়ে পালিয়ে যেতেন। বাচ্চা মেয়েদের চুলে ওকরা নামের একটা কাঁটা ওয়ালা ফলের বীচি ছুঁড়ে দিতেন। চুল জট পাকিয়ে যেত। সে এক কেলেঙ্কারী!!!!!!
জগন্নাথ মিশ্র সাধে কি, দুঃখ করে লিখেছিলেন!!!!!!!:-
“এহি যদি সর্বশাস্ত্রে হবে গুণবান্।
ছাড়িয়া সংসার সুখ করিবে পয়ান।।
অতএব ইহার পড়িয়া কার্য্য নাই।
মূর্খ হৈয়া ঘরে মোর থাকুক নিমাঞি।।”
আপনারা কি ভাবছেন , আমি বানান ভুল করেছি? আরে না!
এটা ১৪৯১ সালে লেখা!!!!! তখনকার বানান গুলো এরকমই ছিল। আমি ওটা অবিকল তুলে দিয়েছি।
ওই বাচ্চা মেয়েরা নিজেদের বাবা মার কাছে গিয়ে বলত:-
“বলে মোরে চাহে বিভা* করিবারে”
*বিভা= বিবাহ বা বিয়ে।
পরে আর এক মেয়ে বলছে:-
“পূর্বে শুনিলাম যেন নন্দের কুমার।
সেইমত কি তোমার পুত্রের ব্যাবহার।।”
আর একজন ব্রাহ্মণ জগন্নাথ মিশ্রকে বলছেন:-
“সন্ধ্যা করি জলেতে নামিয়া।
ডুব দিয়া লৈয়া যায় চরণ ধরিয়া।।”
কি কাণ্ড নিমাইয়ের!! ওই পাঁচ বছর বয়সেই ডুব সাঁতার শিখে গেছিল। ব্রাহ্মণ, স্নান সেরে জপ করছেন জলে নেমে আর নিমাই ডুব সাঁতার দিয়ে ব্রাহ্মণের পা টেনে আবার জলে ফেলে নাকানী চোবানী খাওয়াচ্ছেন!
“কেহ বলে মোর শিবলিঙ্গ করে চুরী।
কেহ বলে মোর লয়ে পলায়ে উত্তরী*।।”
*উত্তরী= উত্তরীয় বা গায়ে দেওয়ার চাদর!
এবার দিনে দিনে বেড়েই চলল, নিমাইয়ের দুষ্টুমী! একদিন এঁটো রান্নার হাঁড়ির ওপর বসে খালি দুলতে লাগল! আর সঙ্গে ঠন্ ঠনা ঠন্ আওয়াজ !!
মা, শচী দেবী বকলেন! বললেন:- ভদ্রতা জানিস না? নিমাই নাকি এর উত্তরে বলেছিল:- ( এটা পরে অন্য লোকে লিখেছেন)
“প্রভু বলে মোরে, না দিস পড়িতে।
ভদ্রাভদ্র মূর্খ বিপ্র* জানিবে কি মতে।।
মূর্খ আমি না জানি যে ভাল মন্দ স্থান।
সর্বত্র আমার এক অদ্বিতীয় স্থান।।”
*বিপ্র= ব্রাহ্মণ
এখন আর জগন্নাথ বাবুর কোনো উপায় থাকল না! গ্রামের সকলের পরামর্শে, নিমাইকে গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে পাঠিয়ে দিলেন পড়তে!
শচী দেবীর হলো বিপদ! ছেলে আর বই ছেড়ে ওঠে না! শচী দেবী ভাবলেন- ছেলে পাগল হয়ে গেছে!!!!
এ ব্যাপারে লেখা আছে:-
“কিবা স্নানে কি ভোজনে কিবা পর্যটনে।
নাহিক প্রভুর আর চেষ্টা শাস্ত্র বিনে।।
আপনি করেন প্রভু সুত্রের টিপ্পনী।
ভুলিয়া পুস্তক রসে সর্বে দেবমণি।।
না ছাড়েন শ্রীহস্তে পুস্তক একক্ষণে।.....
পুঁথি ছাড়িয়া নিমাঞি না জানে কোনো কর্ম ।
বিদ্যারস ইহার হয়েছে সর্বধর্ম।।
একবার যে সুত্র পড়িয়া প্রভু যায়।
আরবার উল্টিয়া প্রভু সবারে ঠেকায়।।”
এই দুষ্টু নিমাই কালে কালে হয়ে উঠলো মস্ত পণ্ডিত! নাম হলো চৈতন্যদেব!
জগন্নাথ মিশ্রের শ্রাদ্ধে, ব্রাহ্মণদের সাথে চণ্ডালের নিমন্ত্রণ করায় ব্রাহ্মণরা ক্ষিপ্ত হয়ে চৈতন্যদেবকে একঘরে করার ব্যবস্থা করেছিলেন, সমাজপতিদের চাপের মুখে যবন হরিদাস কে (জন্ম সূত্রে মুসলমান হওয়ায়) মহাপ্রভূর কীর্ত্তনের দল থেকে বাদ দিতে হয়েছিল, সকল বর্ণের মানুষ নিয়ে এক সাথে হরির নাম সংকীর্ত্তন করার কারণে চৈতন্যদেবের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিচার ব্যবস্থার প্রধান, কাজী সাহেবের কাছে ব্রাহ্মণরা নালিশ করেছিলেন, এমন কি ওনার কীর্ত্তনের দলের মৃদঙ্গ (খোল) পর্যন্ত ব্রাহ্মণরা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন, তবে চৈতন্যদেব এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করেননি, বরং আরও পুরো উদ্যমে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন।
২৪বছর বয়সে স্ত্রী ও মায়ের বিনা অনুমতিতে হঠাৎ করেই কেশব ভারতী গোঁসাই এর কাছ থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন, সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর সংসারে বাস করা ও স্ত্রীর সাথে বাক্যালাপ করা শাস্ত্রীয় বিধান মতে সম্পুর্ণ নিষেধ, তাই বৃন্দাবনে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেন কিন্তু মায়ের অনুরোধক্রমে তিনি ওডিশার পুরীধামে থেকে গেলেন।
পুরী যাবার সময়, বালেশ্বরের কাছে রেমুণাতে ( ন – নয়) পথশ্রমে ও খিদেতে আকুল হয়ে এক মন্দিরের চাতালে ঘুমিয়ে পড়েন ।
( বালেশ্বর থেকে রেমুণা -১০ কিমি)
জনশ্রুতি সেই মন্দিরের বিগ্রহ গোপীনাথ চৈতন্যকে রাতে ক্ষীর চুরি করে খাওয়ান । সেই থেকে রেমুণার মন্দিরের বিগ্রহের নাম – ক্ষীরচোরা গোপীনাথ ।
পুরীতে থাকার সময় চৈতন্যদেব হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষের প্রাণের লোক।
কাশীনাথ মিশ্র, বাসুদেব সার্বভৌম, রায় রামানন্দ প্রমূখ মহা মহা বিজ্ঞ পণ্ডিতরা চৈতন্যদেবের অনুগামী হয়েছিলেন ।
ওডিশার পরাক্রান্ত রাজা প্রতাপরুদ্র গজপতিও হয়ে পড়লেন একান্ত সেবক,
তিনি আজ্ঞামত যুদ্ধ বিগ্রহ সব কিছুই ছেড়ে দিয়ে একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে শ্রীচৈতন্যদেবের সর্বাঙ্গীন মুখাপেক্ষী হয়ে পড়লেন।
চৈতন্যদেবের ইচ্ছামত রাজা প্রতাপরুদ্র, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ব্রাহ্মণ থেকে চণ্ডাল পর্যন্ত সকল বর্ণের মানুষের প্রবেশ করার অধিকার দিলেন, এতেই হল কাল বা মহাসঙ্কট।
এ জন্য মন্দিরের তত্তাবধানে থাকা ব্রাহ্মণরা (পাণ্ডা) ক্ষিপ্ত হলেন, তারা ভাবলেন এতদিনের পর এবার এই সব অস্পৃশ্য, হীন জাতিদের স্পর্শে মন্দির ও মন্দিরের দেবতা অপবিত্র হয়ে যাবে ।
এই অবস্থা ব্রাহ্মণরা কোন মতেই মেনে নিতে পারছিলেন না কিন্তু রাজা প্রতাপরুদ্রের নির্দেশ থাকায় ব্রাহ্মণরা হতাশ হয়ে গেলেন কিন্তু ব্রাহ্মণদের বুঝতে বাকী রইল না যে ঐ টিকিধারী সন্ন্যাসী গৌরাঙ্গ গোঁসাই এর মুল কারণ ।
পুরীধাম ছোট জাতের স্পর্শে অপবিত্র হয়ে যাবে।
এ কেমন সন্ন্যাসী যে বেদ বিধান কিছুই মানে না আর মহারাজ কি না সেই সন্ন্যাসীর ভক্ত হয়ে পড়লেন, কি আশ্চর্য! অবশেষে ব্রাহ্মণরা
শ্রীচৈতন্যদেবকে কি ভাবে গোপনে হত্যা করা যায় তাই যড়যন্ত্র করতে লাগলেন।
মিলেও গেল সুযোগ ।
রাজা প্রতাপরুদ্র কিছুদিনের জন্য পুরীর বাইরে গেছিলেন । এদিকে চৈতন্যদেবের পায়ে আঘাত লেগেছিল রথযাত্রার সময় ।
চুপিসারে চৈতন্যদেবকে খুন করে রটিয়ে দেওয়া হয়- তিনি জগন্নাথ বিগ্রহে বিলীন হয়ে গেছেন ।
ধর্মও থাকলো আর খুনও করা হলো এই চৈতন্য দেবকে ।
....................................................................................
তথ্যসূত্র: দীনেশচন্দ্র সেনের “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ ( ১৯০৮) । নেটের বিভিন্ন সাইট, ও বনবিহারী পতি বাবুর ব্যক্তিগত আলাপচারিতা- যতখানি স্মৃতিতে আছে ।
পদ্য: চৈতন্য ভাগবত ( আদি) থেকে উদ্ধৃত!
Friday, June 3, 2016
চিরজীবী
আমাদের শাস্ত্রে সাতজন চিরজিবীর কথা বলা হয়েছে
1) অশ্বত্থামা
1) অশ্বত্থামা
2) বলি
3) ব্যাসদেব
4) হনুমান
5)বিভীষণ
6) কৃপাচার্য ও
7)পরশুরাম।
তার মানে এই
1) অশ্বত্থামা = গুপ্ত ঘাতক।
2) বলি = দাতা ।
3)ব্যসদেব =লেখক ।
4)হনুমান =ভক্ত বা ভক্তি ।
5)বিভীষণ =বিশ্বাসঘাতক ।
6)কৃপাচার্য = কৃপার পাত্র ও পরান্ন ভোজী
7) পরশুরাম = যুদ্ধবাজ ।
এই সাত রকম চরিত্রের লোক চিরবিদ্যমান ।
3) ব্যাসদেব
4) হনুমান
5)বিভীষণ
6) কৃপাচার্য ও
7)পরশুরাম।
তার মানে এই
1) অশ্বত্থামা = গুপ্ত ঘাতক।
2) বলি = দাতা ।
3)ব্যসদেব =লেখক ।
4)হনুমান =ভক্ত বা ভক্তি ।
5)বিভীষণ =বিশ্বাসঘাতক ।
6)কৃপাচার্য = কৃপার পাত্র ও পরান্ন ভোজী
7) পরশুরাম = যুদ্ধবাজ ।
এই সাত রকম চরিত্রের লোক চিরবিদ্যমান ।
পাঠক
একজন পাঠকের চোখে
+++++++++++++
একটা বিষয় ভুললে চলবে না, আমাদের বাল্য বা কৈশোরের থেকে এখনকার বাল্য বা কৈশোর অনেক এগিয়ে ।
পুলিশ- ভূত- প্রেত- দৈত্য- দানোর গল্প যেমন আমরা আগ্রহ ভরে শুনতাম বা পড়তাম, সেটা বোধহয় এখনকার বাচ্চারা সেভাবে শোনে বা পড়ে না ।
নেট এবং নানা বিষয় পড়া এবং শোনার ফলে- তাদের বুদ্ধিমত্তা অনেক খানি এগিয়ে গেছে, কালের নিয়মেই ।
কিন্তু, সুকুমার রায়ের লেখা বইগুলোর কাটতি কেন এখনও আছে ? “ননসেন্স আইডিয়া” এখনও ওদের টানে বলে ।
সুকুমার রায় যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন বলে, আমার অন্তত মনে হয় । তাই এইসব বই পড়ার উৎসাহে ভাঁটা পড়ে নি ।
আরও একটা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখবেন- সত্যজিৎ রায়ের লেখা ভূত – প্রেত বা অতি
পার্থিব লেখার থেকে প্রফেসর শঙ্কু কিন্তু এখনও সমান ভাবে জনপ্রিয়, অন্তত
আমার তাই মনে হয়েছে ।
“টেনিদা” আমাদের সময়ে অতি জনপ্রিয় ছিল, তার
কারণ ঐ সময়ের সাথে আমরা যারা নিজেদের বড়ো বলে দাবী করি, তারা সময়, বিষয় সব
কিছুর সাথে একাত্মতা বোধ করতাম ।
এখন মনে হয়- টেনিদার ঐ চরিত্র ছোটোদের কাছে অচেনা ( ভুল হতেও পারে, তাই আগাম ক্ষমাপ্রার্থী )
এখন যারা ২৫ থেকে ৩৫ য়ের কোঠায় তারা বাংলা সাহিত্যের এই দিকটা পড়েছেন, কিন্তু পরের প্রজন্ম কি পড়ছে ?
কিম্বা, ধরুন “ঘনাদা” ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিপ্রেক্ষিতে
বাঙালির বারফাট্টাই কে তিনি ধরতে চেয়েছিলেন একটি চরিত্রের মধ্যে ।
তিনি সফল ছিলেন, কারণ কিশোররাও ঐ সমাজের সাথে নিজেদের পাড়ার দাদা, পাতানো কাকা বা জ্যাঠার মধ্যে এই চরিত্রকে ধরতে পারতো ।
“ঘনাদা”র চরিত্র এখন সেভাবে প্রকট নয়- বর্তমান প্রজন্মের কিশোর/ কিশোরীদের কাছে ।
পরিবর্তে, ছোট থেকেই তারা দেখতে পাচ্ছে সমাজের নানা স্তরে হিংস্রতা, শঠতা,
মিথ্যে কথা- যে গুলো আমরা ভাবি তারা বোঝে না- তারা কিন্তু নিজেদের মত করেই
বুঝতে পারে ।
তারা ভাবে নিজেদের নিস্পাপ মনে- এগুলো সমাজ থেকে নির্মূল করতে হবে । খেয়াল করলে দেখবেন , তাই এখনও “ফেলুদা” সমান ভাবে জনপ্রিয় ।
শঙ্কু যদি বিজ্ঞান নির্ভর কাহিনী হয়, সেখানে ফেলুদা অ্যাডভেঞ্চারের গোয়েন্দা ।
এখন যাঁরা “প্রতিষ্ঠিত” সাহিত্যিক আছেন, তাঁরা মাত্র কয়েকজন এই চেষ্টা
করেছেন বা করছেন, কিন্তু সিংহভাগই সেই ভূত- প্রেত- পুলিশের মধ্যে আটকে থেকে
বর্তমান প্রজন্মের কাছে মনে হয়- হাস্যকর হয়ে উঠছেন ।
শরদিন্দু
বাবুর “ব্যোমকেশ” এখন ভালো ভাবে মাথাচাঁড়া দিচ্ছে, তার কারণ, তিনিও তাঁর
সময়রেখার মধ্যে টানটান গল্প লিখে গেছেন- যেটা বর্তমান প্রজন্মকে টানছে ।
আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়- কিশোর সাহিত্য যাঁদের হাত ধরে “সাবালক” হবার কথা, তাঁরা এই বিষয়ে একটু ভেবে দেখবেন ।
এই বিজ্ঞানের যুগে কিন্তু বিজ্ঞান নির্ভর গল্প বা উপন্যাসের প্রয়োজন আছে,
তেমনই দরকার আছে ইতিহাসাশ্রিত গল্প বা উপন্যাসের- যে গুলো মজার ঢঙ্গে লিখে
কিশোরদের কাছে পরিবেশন করা ।
তা যদি, না করতে পারা যায়- তবে কিশোররা মনে হয় রঙচঙ্গে পূজা বার্ষিকি গুলো নেড়ে চেড়েই রেখে দেবে- পড়বে না ।
আমরা যারা- বৃদ্ধ/ প্রৌঢ় বা যৌবনের মাঝামাঝি তাদের অভ্যাসের বশে টানবে এই
সব পূজা বার্ষিকি গুলো, কিন্তু টার্গেট রিডারদের কাছে কতখানি পৌঁছবে তা
নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে আমার দ্বিধা রয়েই গেল ।
খুব সম্প্রতি আনন্দমেলায় দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের Debjyoti Bhattacharyya লেখা “ইচ্ছেপলাশ” উপন্যাসটি পড়ে আমার এত গুলো কথা লিখলাম ।
আমার মনে হয়েছে- এই লেখাটির মধ্যে একটা বেশ তরতাজা ভাব এবং বেশ কিছু
বৈজ্ঞানিক তথ্য তরল ভাবে আছে, যা বর্তমান কিশোর/ কিশোরীদের কাছে উপভোগ্য
হবে ।
বেশ সাবালক লেখা- “নাবালক/ নাবালিকা” দের জন্য ।
( একান্ত ব্যক্তিগত মত )
Subscribe to:
Comments (Atom)
