অবশেষে সেই কাঙ্খিত ইন্টার ভিউ লেটার এলো কটক ওয়াই এম সি এ য়ের ঠিকানায় ।
কটকে সন্ধে বেলা কাজের পর খুব একটা করার কিছু থাকতো না- বেচুবাবুদের ।
সলিল দা ( গুপুদা নামেই পরিচিত ছিলেন) , জ্যোৎস্নাদা এবং আরও কয়েকজন আড্ডা মারতেন সমীরদার কাছে এসে ।
মাঝে মাঝে – জ্যোৎস্নাদার অমরবোর্ডিয়েও আড্ডা বসতো ।
সেদিন ওঁরা আসতেই খবরটা দিলাম ।
বেশ উৎফুল্ল সবাই । জ্যোৎস্নাদা বেশ কয়েকটা টিপস্ দিলেন । প্রথমেই বললেন :-
যে প্রশ্নটা অবধারিত করবে, সেটা হলো – লেট আস নো সামথিং অ্যাবাউট ইয়োর সেল্ফ ।
এটা অন্য ভাবেও আসতে পারে তবে এই প্রশ্নটা কেন করা হয় জানো হে ?
আমি তো বাক্যিহারা ।
উনি বললেন :-
কোন বিষয়টা সব চেয়ে ভালো জানো তুমি বলতো হে রামকেষ্ট !
সবচেয়ে ভালো ?
হ্যাঁ, এমনকি নিউটন আইনষ্টাইন- সবার থেকেও ভালো জানো তুমি !
আমি পপাত ধরণীতলে । একি রে ভাই, কোথায় নিউটন, আইনষ্টাইন আর কোথায় আমি ?
মিচকি হেসে সমীরদা বললেন :- বুঝলে হে ! যে বিষয়টা সবচেয়ে ভালো জানো তুমি, সেটা হলো নিজের সম্বন্ধে । ওটা তুমি ছাড়া আর কে ভালো জানবে বল?
এগজাক্টলি ! জ্যোৎস্না দা পাইপ টা দাঁতে কামড়ে বললেন ।
ইউ হ্যাভ টু কমিউনিকেট টু ডক্টরস্ অ্যাবাউট প্রডাক্টস্ । দে উইল জাষ্ট সি, হাউ ইউ কমিউনিকেট অ্যাবাউট এ সাবজেক্ট ইউ নো বেষ্ট ! ইফ দ্যাট ক্যান বি ডান- ইউ আর থ্রু এইট্টি পারসেন্ট ।
তারপর আরও কিছু শেখালেন আমায় । যেমন, পাশ করার পর আমি বেকার বসে নেই, প্রাইভেট টিচিং করি- এই সব ।
তার পরের দিনই রওনা দিলাম কোলকাতার উদ্দেশ্যে ।
+++++++++++++++
গ্র্যাণ্ড হোটেল কিন্তু তখন – এখনকার মত ছিল না ।
রাস্তা থেকে ঢুকতেই একটা লম্বা করিডর । একটু এগোলেই ডান দিকে রিসেপশান । সুবেশা , সুন্দরীরা দাঁড়িয়ে রয়েছেন- মুখের আলতো হাসিটা সুকুমার রায়ের খুড়োর কলের মত ঝুলিয়ে রাখা।
সদ্য চৌরঙ্গী উপন্যাসটা পড়া শেষ করেছি তখন । শাজাহান হোটেল নাকি আসলে গ্র্যাণ্ড । নাকি গ্রেট ইর্ষ্টান ?
জানতাম, স্যাটা বোসের দেখা পাবো না, তবু একটা আশা ছিল মনের কোথাও।
দৃশ্যান্তর
হোটেলের একটা বড় ঘরে তিনজনের সামনে আমি একা । একজন পূর্বপরিচিত – তপন মুখার্জ্জি, আর দুজনের পরিচয় পরে পেয়েছিলাম ।
মিঃ ফনসেকা আর মিঃ দিশা , দুজনেই গোয়ান ।
আমার হাতে লেখা বায়োডাটা মন দিয়ে পড়ছেন – মিঃ ফনসেকা আর আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মিঃ দিশা ।
ফনসেকা ( হাতটা বাড়িয়ে) :- সো মিঃ ভট্টাচারিয়া, গ্ল্যাড টু মিট ইউ ।
- ( একটু ঘাবড়িয়ে, তাও হাত বাড়িয়ে) মি টু স্যার !
- হোয়াই ?
- আই আম একস্পেকটিং মাই জব ফ্রম ইউ স্যার ( জিবে দুষ্ট সরস্বতীর ভর তখন)
- বাট ইয়োর একস্পেকটেশন মে গো রং !
- নাথিং সিওর ইন লাইফ, বাট টু এক্সপেক্ট ইজ এ পজিটিভ থিংকিং স্যার্( জ্যোৎস্নাদার শেখানো কমন প্রশ্নটা পড়ে গেল বলে, মুখস্থ করা উত্তরটা ঝেড়ে দিলাম)
- হাউ মেনি টাইমস, ইউ লাই ইন এ ডে মিঃ ভট্টাচারিয়া ?
- ( জ্জয় গুরু জ্যোৎস্নাদা, আবার কমন) , ইটস এ সিচুয়েশানাল ডিমাণ্ড স্যার
- ( বিস্মিত হয়ে) গুড !
- এনি আইডিয়া অ্যাবাউট দ্য জব ?
- টু সাম এক্সটেন্ট বাট .......
- এনি প্রিভিয়াস এক্সপিরিয়েন্স ?
- নো স্যার !
- হোয়াট ইজ সালফা ?
- আই ডোন্ট নো স্যার
- ডু ইউ নো তেলুগু অ্যাণ্ড ওডিয়া সিরিয়াসলি ?
- ক্যান আই ষ্টার্ট স্পিকিং ইন দোজ টু ল্যাংগুয়েজেস ?
- ( হেসে) নট রিয়েলি ! ওক্কে ইউ মে গো নাও । উই উইল ইনফর্ম ইউ বাই কেবল । আর ইউ রেডি টু জয়েন ?
- অ্যাজ সিওর আ্যাজ আই অ্যাম সিয়িং ইউ স্যার ।
- ওকে ।
বেরিয়ে এলাম মনে একটা খুঁতখুঁতোনি নিয়ে
তবে, শেষ মেষ চাকরীটা জুটেছিল ওই দুটো স্থানীয় ভাষা জানার জন্য ।
ট্রেলিগ্রাম পেলাম যথাসময়ে । বাবার কাছ থেকে দুশো টাকা নিয়ে রওনা বোম্বের পথে ।
উঠতে হবে বায়াকুল্লার নতুন পাঁচতারা হোটেল হেরিটেজে ।
সেখানকার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি আপনাদের । এটা আমি বারবার লিখি আমার বোকামির নিদর্শন হিসেবে ।
কারণ একটাই এখানে জ্যোৎস্নাদা ছিলেন না আমাকে শেখানোর জন্য ।
+++++
নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের কাছে বোম্বে শহরটা তখন অধরা ।
একবার মায়ের কাছে আবদার করে, টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম বোম্বেতে । সে যে কি করুণ হাল হয়েছিল, সেটা হয়ত অনেকেই পড়েছেন আমার বোকা বোকা লেখায় ।
তবে, দ্বিতীয় বারের বোম্বে যাত্রা- প্লেনে । সেই কাহিনীও হয়তো অনেকে পড়েছেন । আমার প্রথম ওষুধ কোম্পানীতে চাকরীর দৌলতে সেই আইবুড়ো প্লেন যাত্রা ।
বায়কুল্লার পাঁচতারা “হোটেল হেরিটেজ” সবে কয় দিন হলো খুলেছে তখন । অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে “ট্যাস্কি” করে পৌঁছলাম,সেই হোটেলে ।
বিশাল রিসেপশান কাউন্টারে এক লম্বা সুন্দরী মহিলা দাঁড়িয়ে টেলিফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলেন ।
আমি যেতেই, টেলিফোন নামিয়ে রেখে মিষ্টি হাসি হেসে বললেন :- ইয়েস স্যার, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ ?
“স্বপ্ন নু, মতিভ্রম নু” অবস্থা আমার । মনে হলো স্বয়ং আশা পারেখ আমার সঙ্গে কথা বলছেন ।
আমার গলা দিয়ে একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরুলো ।
ধূলি – ধূসরিত চেহারা । পরণে সেজ মামার ঢলঢলে ব্লেজার ।
টাই তখন কণ্ঠে কা লঙ্গোটি হয়ে ঝুলে আমার আত্মহত্যার পথ প্রশস্ত করছে । বোম্বের গরমে ঘামছি দরদর করে ।
ভদ্রমহিলা একটুও না ঘাবড়িয়ে আমাকে একটা সুন্দর কাঁচের গ্লাসে জল দিলেন । গোঁৎ গোঁৎ শব্দে সবটুকু জল খেয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম ।
বুঝতে পারছিলাম, তিনি আমার জল খাবার শব্দ আর কণ্ঠার ওঠাপড়া লক্ষ্য করছিলেন।
কি বলবো- সেটা বাংলায় ভেবে নিয়ে ইংরেজীতে অনুবাদ করে বললাম :-
“ ম্যাডাম, আই এসেছি হিয়ার ফর ট্রেনিং ইন ওষুধ কোম্পানি ।”
ধনুকের মত পটল চেরা চোখের ভ্রু বোধহয় একটু কুঁচকেছিল ।
অ !!! বাঙালি ? জার্মান রেমেডিস কোম্পানীর ট্রেইনিংয়ে এসেছেন ?
আজ্ঞে !!! আপনি বাঙালি ?
আমার চোদ্দপুরুষ বাঙালি । তবে বোম্বেতে আছি প্রায় পনোরো বছর, বাবার কাজের সূত্রে । এই প্রথম আসা হলো বুঝি ?
আজ্ঞে না, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার । তবে এই রকম হোটেলে প্রথম বার ।
বুঝেছি !! আপনার অ্যাপো লেটার আর পোষ্টাল আইডেন্টটি কার্ড দিন । ( তখন এটাই ছিল পরিচয় পত্র)
আজ্ঞে, অ্যাপো লেটার কি ?
আপনি কি বাঙলা বোঝেন না ?
আজ্ঞে তা বুঝি, তবে ওই অ্যাপো না কি বললেন যে !!!
হুম !!!! ওইটা হলো আ্যপয়েন্টমেন্ট লেটার ।
সেটা বলবেন তো !! সেটা আছে, তবে পোষ্টাল আইডেন্টি কার্ড আনা হয় নি, মানে করা হয় নি ।
আপনার নাম কি ?
এজ্ঞে ! রামকেষ্টো ভশ্চাজ !!!
তিনি একটা জাবদা খাতা বের করে মন দিয়ে পেন ওপর নিচু করে বললেন :- ওই নাম নেই, তবে রামাক্রিষ্ণা ভটাচারিয়া আছে ।
আরে, ওটাই তো আমার নাম
তবে যে বড়ো রামকেষ্টো ভশ্চাজ বললেন !!
এজ্ঞে ওটা আমার নামের বঙ্গীয় সংস্করণ ( ততক্ষণে সাহস ফিরে পেয়েছি )
ঠিক আছে, আপনার অ্যাপো লেটার দেখি !!
এবারে আর বুঝতে অসুবিধে হল না । চামড়ার স্যুটকেস খুলে- সব জামা কাপড়, জাঙ্গিয়া, গেঞ্জী, চিড়ের প্যাকেট, মুড়ির প্যাকেট চকচকে মাটিতে ফেলে একদম নীচ থেকে বের করলাম, আমার দোমড়ানো ফাইল ।
খেয়াল করিনি, আমার চারপাশে তখন বেশ কয়েকজন পুরুষ মহিলা আমাকে ঘিরে ধরে বিস্ফারিত চোখে আমার কীর্তি কলাপ দেখছে ।
বিজয়গর্বে ওই লেটার বের করে মহিলার হাতে দিলাম । মনে মনে আশা- বোম্বে যখন, তখন এই মহিলা হিন্দি সিনেমার ফরমূলা মেনে আমার প্রেমে পড়তে বাধ্য ।
যেন, এক চিমটে দিয়ে আরশোলা তুলছেন- এই ভাবে, আমার অ্যাপো লেটার নিয়ে দেখলেন ।
নামটা মিলিয়ে বললেন :- এবার আপনার লাগেজটা গুছিয়ে নিন প্লিজ ।
আমি ওনার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি সপ্রেম নয়নে ।
আমার চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে বললেন :- ক্যান ইউ লিশন টু মি ?
চমক ভাঙলো আমার ।
তাড়াতাড়ি করে সব কোনো রকমে কুড়িয়ে নিয়ে স্যুটকেসে ঢুকিয়ে দিয়ে বন্ধ করতে গেলাম । বন্ধ আর হয় না ।
শেষে একটা পা দিয়ে ডালাটা চেপে ধরে ( দুঃ শাসনের রক্তপানের মত ) লক আটকে দিতেই, পঁচিশ বছরের চামড়ার স্যুটকেশের লকের লম্বা পার্টটা পটাং করে সশব্দে বেরিয়ে গেল ।
দাঁত বের করার মতন সুটকেশের ডালা একদিকে খোলা আর একটা ময়লা গেঞ্জি উঁকি দিচ্ছে ।
মহিলা কোনো রকমে একটা খাতায় আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নিলেন । তারপর একজনকে ডেকে বললেন :- সাব কা সামান রুম নং ১১৬ মেঁ লেকে যাও ।
আমি বললাম :- ম্যাডাম , একটা দড়ি হবে ?
কি করবেন , গলায় দেবেন ?
আরে না !!! বিজয়সিংহের বংশধর আমি, হেলায় করি বোম্বে জয় । ওসব কিছু নয়, সুটকেশটা বাঁধবো ।
বোকার মত তাকিয়ে থেকে বললেন – আপনি পারেনও বটে ।
বন্ধুবর অমিতাভ সেনগুপ্ত এই ঘটনার সাক্ষী । সে তখন কোলকাতার পণ্ডিতিয়া নিবাসী ঝকঝকে যুবক, একেবারে রজার মুরের মত চেহারা ।
তোর কি মনে আছে রে, সেই বোকামীর গল্প----- অমিতাভ ?