দেশভাগের কথা সবাই জানেন, তাই আর চর্বিতচর্বণ না করাই ভাল ।
দেশভাগ কেন হয়েছিল, কি ভাবে হয়েছিল কারা দায়ী- এসব এখন পুরোনো কথা ।
আমি এসব স্বচক্ষে দেখিনি অনেকের মতই।
কিন্তু, আমার- মা, বাবা, কাকা,পিসিমা, দাদু, দিদিমার মুখে এই সব শুনতে শুনতে বড় হওয়ার ফলে, সব যেন চোখের সামনে দেখতে পাই ।
ওডিশায় থাকার ফলে বাবা পড়াশোনার জন্য দাদুর বাড়ীতে পাঠিয়েছিলেন । তাই দেখতে পেয়েছি- উদ্বাস্তু কলোনির সংগ্রাম ।
কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ, সব জায়গায় গড়ে উঠেছিল- বাস্তুহারাদের বসতি, লোকমুখে যার নাম ছিল কলোনি ।
অধিকাংশ কলোনি এখন জাতে উঠে গিয়ে হয়েছে – পল্লী ।
পরবর্তী প্রজন্ম আর কলোনী নামটা বজায় রাখেন নি, কারণ ওটা একটা নিকৃষ্ট শব্দ ।
তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মরা এপারে এসে কিভাবে সংগ্রাম করেছেন – সেটা তো ভোলবার নয় ।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় – এই বেঁচে থাকার লড়াইটা যদি ওপারেই করতেন, তাহলে এত অপমান আর জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করতে হত না ।
যাক্, যেটা হয় নি তা নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই ।
আমি মামাবাড়ীতে থাকতাম- বাঘাযতীন কলোনীর ই ব্লকে । মামা বাড়ী আজও আছে সেখানে, কিন্তু দালান কোঠা হয়েছে ।
আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য, যা যা দরকার – সবই মজুত সেখানে, তবে পাঁচ মামার মধ্যে মাত্র তিনজন জীবিত ।
রূপান্তরটা আমার চোখের সামনেই হয়েছে ।
ছিল – মাটির মেঝে, বেড়ার ঘর । সামনে ছিল দুটো বকফুলের গাছ ।
জলের জন্য ছিল – টিপকল । জলে ভকভক করছে আয়রণের গন্ধ ।
স্নানের জন্য ছিল – পুকুর । তালগাছের গুঁড়ি দিয়ে তার ঘাট বানান ।
এইরকম পুকুর বাঘাযতীনের প্রায় সব জায়গাতেই ছিল । হয়, কাটান বা প্রাকৃতিক।
ওপারে অভ্যেস ছিল, পুকুরে হাত পা ধোয়া, স্নান করা, সেটাই এপারে তৈরি করে ওপারকে ছুঁয়ে থাকার একটা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।
লায়েলকার মাঠেও পুকুর ছিল । বাঘাযতীন থেকে হেঁটে, বিজয়গড় শিক্ষানিকেতনে যাবার সময় দেখা যেত একটা পুকুর ।
ফাঁকা লায়েলকার মাঠে তখন তৈরি হল – একটা দালান বাড়ী ।
নাকি, ইংরেজি ব্যাকরণের বিখ্যাত লেখক – পিকে দে সরকারের মালিকানা ছিল ওই বাড়ীটার ।
তারপর সেই পুকুরটাকে ঘিরে তৈরি হল – কয়েকটা দোতলা বাড়ীর । শুনতে পেতাম – আকাশবাণীর তখনকার বাংলা সংবাদ পাঠিকা বিখ্যাত ইভা নাগের একটা বাড়ী ছিল ওখানে ।
সত্যি মিথ্যে যাচাই করার সময় ছিল না তখন ।
অনেক পরে, বাঘাযতীনে আমার মামার বাড়ী ঢোকার পরের গলিটা (আগের গলিটা ছিল, চালপট্টির) দিয়ে ঢোকার বাঁ দিকে বাড়ী তৈরি করেন অভিনত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায় ।
যাওয়া আসার পথে এক ঝলক কখনও দেখতে পাওয়া যেত মাধবীদেবীকে ।
মাধবীদেবীর জীবনসঙ্গী- নির্মলকুমার পড়েছেন মালদার অক্রুরমণি স্কুলে। তাঁকে একটা সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন – স্কুল কর্তৃপক্ষ বা প্রাক্তনীরা । ঠিক মনে নেই । তবে সেই সময় আমি মালদায় ।
সন্ধেবেলা চারিদিক থেকে ভেসে আসতো চিৎকার করে পড়ার আওয়াজ।
আমার কেন জানি এখন মনে হয়, সেই চিৎকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকত- প্রতিষ্ঠিত হবার বাসনা ।
লন্ঠনের মৃদু হলদেটে আলো – খালি নিয়ন সাইনের অপেক্ষা ।
রাত বিরেতে তিনটে আলু বা পেঁয়াজ ধার নেবার প্রয়োজন হত অনেকের কারণ হয়তো বাড়ীতে অতিথি এসেছেন ।
পরের দিন বাজার করে, সেই ধার মেটান হতো ।
বাঘাযতীন বাজার ছিল বিজয়গড়ের রাস্তায় ।
কলোনি ঢোকার মুখ আর বাঘাযতীনের মধ্যে ছিল – বড় রাস্তা ।
চলত- ৮০ বি আর সরকারি পাঁচ নম্বরের দোতলা বা একচোখ কানা একতলা বাস ।
ভোরবেলা – পুণ্য করতে কিছু লোক যেতেন গঙ্গাস্নান করতে ।
বেশীর ভাগ লোকই পুকুরে স্নান করতেন । বাসভাড়াটা সেই হিসেবে তখনকার দিনেও বেশী ছিল ।
তাই অনেকেই যেতেন না, সাশ্রয় করার জন্য মানে যেটুকু পারা যায়।
পুকুরে স্নান করার মন্ত্র ছিল । একঢেলা মাটি তুলে পাড়ে ছুঁড়ে দেবার ।
এই করে করে বোধহয় পুকুরটা গভীর হত ।
উত্থিষ্ঠোত্থিষ্ঠো পঙ্ক ত্বং ত্যজ পুণ্য পরস্য চ।
পাপানি বিলয়ং যান্তু শান্তিং দেহি সদা মমঃ॥
হে পাঁক, তুমি ওঠো । পরের পুণ্য নিয়ে আমাদের পাপগুলো দূর করে আমাদের শান্তি দাও ।
শান্তি এখনও খুঁজে চলেছি ।
ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ,
-----
মন্ত্রটা ভুলে গেছিলাম । সিলেটের পরম বন্ধু বিধুভূষণ ভট্টাচার্য মন্ত্রটা পাঠিয়েছেন আমাকে । আমি কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে ।
