দুপুরের দিকে একটা ব্যক্তিগত কাজ ছিল, সেটা সেরে – ভাত
টাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, খানিক।
ঠিক, ঘুম বলা যাবে না, তবে তন্দ্রা মতন হয়েছিল আর কি
!
এখন আমার কাজ বলতে দুই – খাই আর শুই ! তাই দুপুরে বেশী
ঘুমোই না । রাতে আর ঘুম আসবে না !
তখন আর কটা হবে? এই সন্ধে ছটা ফটা ! হরির দোকানে গেলাম
।
চা খেয়ে, সবে গেলাসটা রাখব, এই সময় একটা মেরুন রঙের অল্টো
গাড়ী এসে দাঁড়াল, দোকানের সামনে । ড্রাইভিং সিট থেকে গাঁকগাঁক করে শব্দবাণ ভেসে এলো
-
আমার জন্য চা বল্ রে রামকেষ্ট । আওয়াজ শুনে দেখি – আমাদের
ক্ষেতুদা, মানে ক্ষেতু বাগচী ।
চা খেতে খেতে ক্ষেতুদা উবাচ – দমদম স্টেশন যেতে, মতিঝিলের
একটু ভেতরে ,ইসকন একটা সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারের দোকান খুলেছে, জানিস?
না তো !
জানবি কি? ব্যাটা তো সবসময় ঘরে বসে থাকিস ! তুই না, ধোসা-
ইডলি খেতে ভালবাসিস !
সে তো ভালবাসি, তবে পাচ্ছি কোথায়? মাঝে একটা ছেলে, সপ্তাহের
মঙ্গল আর শনিবার নিয়ে আসত । এখন আর আসে না । বলে- বিক্রি নেই !
বলিস্ কি রে? এই ইসকনওয়ালারা তো আরও দুটো ব্রাঞ্চ খুলেছে
কলকাতায় !
কোথায়, কোথায়?
মিন্টো পার্ক আর গুরুসদয় দত্ত রোডে !
তাই?
তালে আর বলছি কি ! চ, চ খেয়ে আসি !
তুমি যাও ক্ষেতুদা ! আমার আজ পেট ভাল নেই!
আম্মো বারিন্দির, তুইও বারিন্দির ! তোর পেটের প্যাঁচ আমি
বুঝি না- মনে করছিস? তোর গায়ে টাচ হলেই তো আমি উল্টো সাত পাক ঘুরি- প্যাঁচ ছাড়াতে ।
সে তো আমিও !
বুঝি রে বুঝি! বারিন্দিরের প্যাঁচ বলে কথা !
মাইরি বলছি,ক্ষেতুদা – তুমি টেনিদার জ্যাঠা আর ঘনাদারও
তস্য তস্য দাদা ! তুমি খাওয়াবে, এটা বিশ্বাস করার চেয়ে, ম্যানড্রেক- মহাজাতি সদনে ম্যাজিক
দেখাচ্ছে- এটা বিশ্বাস করা বরং ভাল ।
ছোট মুখে বড় কথা বলছিস যে বড়? বলি, আমি কি তোকে খাওয়াই
নি?
সে তো- দু টাকার চানাচুর !
অকৃতজ্ঞ! দু টাকাটাই দেখলি, চানাচুরটা দেখলি না? চ চ,
গাড়িতে ওঠ্ । খেয়ে আসি ওখান থেকে !
মা কালীর দিব্বি ! আমার পকেটে মাত্র দশটা টাকা ! তাও হরিকে
দিতে হবে চায়ের দামের জন্য ! তুমি যাও দাদা – আমি না হয় পরে যাবো একদিন ।
এই দ্যাখ !
কি?
তিনটে পাঁচশো টাকার নোট আমার পকেটে ।
কোত্থেকে পেলে দাদা?
আবার?
মানে তোমার কাছে তো পাঁচ টাকার বেশী দেখি নি, তাই আর কি
!
বাজার খরচ থেকে জমিয়েছি – তিন মাস ধরে !
বৌদি ধরতে পারে নি ?
তা পারে নি !
যাক ! বাঁচা গেল !
যাবি তো?
চলো – এত করে বলছ যখন !
তা, লোকজনকে জিজ্ঞেস করে মতিঝিলের ভেতরে অল্প ঢুকেই
দোকানটা ।
বড় করে ইংরেজিতে লেখা – ইসকন । সাথে রাধাকৃষ্ণের ছবি ।
দোকানের দুটো ভাগ । একদিকে মিষ্টি আর একদিকে টেবিল আর
চেয়ার পাতা ।
মিষ্টিগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল –মে মাসের দোওয়া দুধ থেকে
, ছানা বা ক্ষীর হয়েছে- অগাস্ট মাসে আর মিস্টি তৈরি এই অক্টবরে ।
ভাবগতিক ভাল নয় দেখে কেটে পড়ার তাল করছি, সেই সময় দেখি
ওডিয়া ভাষায় কথা বলছে কাউন্টারে বসা ছেলেটা ।
ওর ফোন শেষ হতেই জিজ্ঞেস করলাম – ঘরঅ কৌঠি কি হ? ( বাড়ি
কোথায় হে?)
কান এঁটো করে হেসে বলল – আইজ্ঞা, জাজপুর ! আপণঅ ওডিয়া
কি? ( আজ্ঞে জাজপুর । আপনি কি ওডিয়া?)
(আগামীকাল শেষ পর্ব)
তুমঅ ঘর জাজপুররে, বিরজা মন্দিরঅ পাখরে ?
তুমঅ ঘর জাজপুররে, বিরজা মন্দিরঅ পাখরে ?
( তোমার বাড়ী, জাজপুরে- বিরজা মন্দিরের কাছে?)
আইজ্ঞা, হেলে টিকে ভিতরে । আপনঅ বিরজা মন্দিরঅ দেখিছন্তি কি ?
(আজ্ঞে, একটু ভেতরে । আপনি বিরজা মন্দির দেখেছেন?)
মলা ! মু পরা
বালেশ্বর লুকঅ ! বিরজা হেলে, বঙালি মানঙ্ক দুর্গা । হেলে, এইঠি – দুর্গা, দি হাতিয়া
আউ মহিষাসুরঅ কু পানি মহিশাসুর কুহা যায়ে । এইঁথি পাঁই এই বিরজা মন্দিরঅ পরা বিরজা
ক্ষেত্র !
( মর ! আমি বালেশ্বরের লোক ! বিরজা হলেন – বাঙালিদের দুর্গা,
কিন্তু দুটো হাত আর মহিষাসুরকে জল মহিষাসুর বলে । এই জন্য- বিরজা মন্দিরকে বিরজা ক্ষেত্র
বলা হয়)
আপনঅ তো সবু জানিছন্তি
(আপনি তো সব জানেন)
তমে জানিছ কি, চৈতন্য দেবঅ পরা জাজপুরঅ লুকঅ ।
( তুমি জানো কি, চৈতন্য দেব জাজপুরের লোক!)
আইজ্ঞা – ভলঅ ভাবে জানে । সেঁইথি পাঁই ইসকন গুটে মন্দিরঅ
ভি করিছন্তি জাজপুররে ।
( আজ্ঞে, ভালো ভাবেই জানি । সেই জন্য তো ইসকন সেখানে একটা মন্দির করেছে ওখানে)
হঁ না ?
( তাই নাকি?)
ক্ষেতুদা দেখলাম –উসখুস করছেন । বললেন – তোর এই ভজর ভজর
থামাবি? ক্ষিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে, আর তুই- ইতিহাস বলছিস্ । বলি হ্যাঁ হে, কি কি পাবো
এখানে?
এবারে ছেলেটা সরাসরি বাংলায় চলে এল যদিও একটু ওডিয়া টান
ছিল বাংলা কথায়।
আজ্ঞে- ধোসা, ইডলি, বড়া, সাম্বার বড়া, সব পাবেন । চাই
কি, রাতের ভাতও খেয়ে যেতে পারেন । আমাদের কোনো রান্নাতেই পেঁয়াজ রসুন নেই । এমনকি মিষ্টিতেও
।
মিষ্টিতে কেউ পেঁয়াজ রসুন দেয় নাকি? – ক্ষেতুদা রেগে অগ্নিশর্মা
।
আজ্ঞে, পেঁয়াজ রসুনের ছোঁয়া পর্যন্ত লাগে না এখানে !
সেটা সব মিষ্টির দোকানেই । সিঙারাতে পুরেও পেঁয়াজ রসুন
থাকে না ।
যাকগে-আমরা ধোসা খাবো । কত করে পিস?
আজ্ঞে ৭০ টাকা ।
নারকেল চাটনি আর সাম্বার থাকবে ?
আজ্ঞে, সেটা তো থাকবেই ।
আপাতত দাও দু প্লেট । খেয়ে দেখি । কতক্ষণ লাগবে আনতে
?
এই ২০ থেকে ২৫ মিনিট !
আচ্ছা, ঠিক আছে ।
ছেলেটি কে .ও.টি নিয়ে চলে গেল কিচেনে ।
আমার ,মনে ধন্ধ !
আন্ধ্রার কথা জানি, কিন্তু তমিড়নাড্ ? লাগাও ফোন – প্রকল্পকে ।
ফোন ধরলে – দুটো খেজুরে আলাপের পর জিজ্ঞস করলাম – বলি,তোমাদের
চেন্নাই শহরে পেঁয়াজ রসুন ছাড়া মসালা ধোসা
পাওয়া যায়?
খানিক চুপ থেকে – প্রকল্পর উত্তর :-
সেটা তো ঠিক জানি না, তবে খুঁজলে মিলতে পারে । তবে পেঁয়াজ
রসুন ছাড়া ধোসার ফ্লেভারটই তো আসবে না !
ওখানে আমিষ খাওয়ার
চল এখন কেমন ?
বেড়েছে দাদা । এমনকি তমিড়রা এখন চাট, ফুচকা, চিকেন তন্দুর,
তড়কা সবই খায় । তবে তড়কাতে কারি পাতা থাকে।
তাই?
হ্যাঁ ! আজকাল রুটিও খায় তমিড়রা ।
বলো কি হে? রুটি ?
হ্যাঁ দাদা । আর আগে রাতে ইডলি খাওয়ার চল ছিল না, তবে
এখন রাতে দেদার খায় ইডলি, তাও মাংসের সাথে ।
হোটেলে – মিলস্ রেডি বোর্ড থাকে ?
থাকে, তবে শুধু দিনের বেলা ! রাতে থাকে না ।
কেন?
মিলস্ মানে এখানে ভাত । রাতে এরা ভাত খায় না এখন ।
ব্রেকফাস্টটাতো আগে হোটেলেই সারত, এখন কি অবস্থা ?
প্রায় কমে গেছে । বাড়ীতেই করে নেয় এরা ।
আর মিষ্টি?
ওই মাইশোর পাক আর লাড্ডু ।
ইতিমধ্যে ধোসা চলে এসেছে – গরম গরম । বেশ মন মাতান পুরোনো
সুবাস ।
প্রকল্পকে বললাম – পরে কথা বলব ।
ধোসার মশালাতে – আলু,কড়াইশুঁটি,গাজর, এই সব ।
সাম্বারেও তাই । শুধু নারকোলের চাটনিতে ধনেপাতা বাটা ।ওটা
খেয়ে ভাল লাগল না।
রাতে নাকি ভাতও
মেলে । দুরকম তরকারি, ডাল, সাম্বার, পাঁপড়, চাটনি ।
দাম- ২০০ টাকা প্লেট ।
ক্ষেতুদা বলল
– চ রামকেষ্ট ! ফুটি এবারে । তোর তো ইতিহাস, ভূগোল সব জানা হল । এবারে বাড়ী না গেলে
ঝাড় ! রাতে তো ভাত খেতেই হবে । তবে কম । পেট ভরে গেছে । তোর বৌদি আবার সন্দেহ করবে
।
ছেলেটি বলল – আবার আসবেন !
