Powered By Blogger

Thursday, August 31, 2017

ভূতেরা



অনেকদিন পর বুকি ঘোষের রেশন দোকানে আড্ডা দিতে গেছিলাম । সেদিন ছিল, কৌশিকি অমাবস্যার দিন । বেচা- কেনা শেষ । অপু আর জীবন বসে ভূতের গল্প করছে ।

চেয়ার এগিয়ে দিল – অলোক । তক্ষুণি গরম গরম চা নিয়ে এলো মিন্টু । ও সব দোকানেই সকাল বিকেল চা বিক্রি করে বেড়ায়।

চায়ে চুমুক দিয়ে – গল্পের ভাবধারা বোঝার চেষ্টা করলাম । কৌশিকী অমাবস্যা তিথির জন্য, চারিদিকে সাজ সাজ রব ।

অমাবস্যা থেকে – বিষয়গুলো গোল গোল ঘুরে আড্ডায় এখন ভূতে এসে ঠেকেছে ।

তর্ক চলছে – বুকি আর অপুর মধ্যে । বুকির বক্তব্য:- ভূত- নাকি স্বরে কথা বলে না আর অপু বলছে – আলবাৎ বলে ।

আমাকে জিজ্ঞেস করলো ওরা । গম্ভীর হয়ে বললুম – আমি তো স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলি ! খোনা স্বরে তো কোনোদিন কথা বলি নি !

বুকি রেগে গিয়ে বললো – আপনি ভূত ? জানতাম না তো !

জানবে, কি করে হে ? গুহ্য তথ্যটা আমার বৌ ছাড়া, যে কেউ জানে না !
যাক্ !

তালে শুনুন – বুকি উবাচ !
ওই যে ডান দিকে বাঁধানো পুকুরটা দেখছেন – ওটা পঞ্চাশ বছর আগে বিরাট ছিল । বাবা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিয়েছে সেই অন্ধকার থাকতে । মুখ ধুতে গেলাম – পুকুরে । ফিরে এসেই পড়তে বসতে হবে ।

দেখি, ওই ভোরে গণেশকাকু, জাল ফেলে মাছ ধরছে । মাছগুলো জাল থেকে বের করে পাশের ঝুড়িতে রাখতেই সেগুলো খালি মাছের কাঁটা হয়ে যাচ্ছে- নিজের চোখেই দেখলাম ।

আমি গণেশ কাকুকে বললাম:- দেখেছো কাকু কাণ্ডটা !

গণেশকাকু ভয়ডর হীন লোক ছিলেন । একটু তাকালেন – ঝুড়ির দিকে ।
তারপর

কে রে আমার মাছ খাচ্ছে? – গণেশ কাকুর চিৎকার ।
উত্তর এলো – আমি তোর অনাদি কাকা রে গণেশ । দু বছর আগে মারা গেছি, জানিস তো । আজ তুই মাছ ধরছিস দেখে কয়েকটা মাছ খেলাম । বহুদিন খাই নি । এখন পেট ভরেছে – চলে যাচ্ছি ।

কোনো খোনা স্বর ছিল না- বুকি ?

একদম না !

অপু বললো – বাতেলা আর মিথ্যে কথা !

কি রকম ? – আমার জিজ্ঞাসা ।

সন্ধেবেলা আমার মা, সেও প্রায় বছর পঞ্চাশ হবে, মাছ কাটছিল । আঁশ ছাড়িয়ে পাশে রাখতেই একটা কপাৎ করে আওয়াজ । এরকম বার দুয়েক হতেই মা তাকিয়ে দেখে – একটা কাটা মুণ্ডু ,গালে বিশাল দাড়ি, আরাম করে আঁশ গুলো খাচ্ছে শব্দ করে ।

মা একটা ঝাঁটার বাড়ি দিয়ে বললো – যা , ভাগ্ এখান থেকে !

কেঁমনে যাঁই মাঁ । পেঁট যেঁ ভঁরে নিঁ ।
অপু, তুমি নিজের কানে শুনেছো ? – আমার কৌতুহল ।

তবে আর বলছি কি ?
এরকম চলতো হয়তো, তবে আমার ফোনে রিং টোন বেজে উঠলো । স্ক্রিনে দেখলাম – আমার বৌ কল করেছে আমায় ।
বলো !

শোনো – তাড়াতাড়ি এসো তো !

কুট্টুর ( আমার নাতনী )খুব কেক খিদে পেয়েছে ! কিনে নিয়ে এসো তো ।

ফিরলাম বাড়িতে ।

কুট্টু বললো – দাদা তুই কি করে জানলি, আমার কেক খেতে ইচ্ছে করছে ? ( কুট্টু আমাকে আর তার দাদীকে ইয়ার বলে মনে করে ।)

কেন, তোর দাদী যে ফোন করে বলল আমায় !
বাজে কথা কেন বলো? আমি তোমায় ফোন করি নি !

কি যে বলো না ! এই দ্যাখো কল‌্ লিস্ট‌্ । দেখি কল্ লিস্টে্ আমার বৌয়ের কল্ নেই ।

ওনার ফোনেও আমার নং ছিল না !

ভ্রান্তিবিলাস




ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে, ভালো করে ব্যাগ হাতড়েও চাবিটা পেল না রিয়া ।

সব আছে, খালি চাবিটাই নেই । রাত আটটার সময়, চাবিওয়ালা কে পাওয়ার চেয়ে স্বয়ং ভগবানকে পাওয়া বোধহয় সহজ।

মা- বাবা পুরী গেছে বেড়াতে । রিয়ারও যাবার কথা, কিন্তু শেষ মুহূর্তে অফিসে একটা প্রজেক্ট এসে যাওয়াতে, আর যাওয়া হয় নি তার ।

মা, পই পই করে বলে গেছে- গ্যাস অন করলে, আগে রেগুলেটার বন্ধ করবি । তোর যা ভুলো মন ।

মায়ের এই সব দোষারোপ ভালো লাগে না রিয়ার ।

না হয় একদিন লন্ড্রি থেকে বাবার জামা কাপড় এনে আলমারি মনে করে , সামসাঙের বিশাল ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখেছিল !

মা যে, স্নানের সময় তোয়ালে ঘাড়ে করে সারা বাড়ি খোঁজে, তোয়ালে, তার বেলা?

খালি রিয়ারই দোষ?

তার বয়ে গেছে – রান্না করতে । দুপুরে অফিস ক্যানটিনে খেয়ে নেয় আর রাতে পাড়ার মোড় থেকে রুটি তরকারি আনে ।

সাতটা দিন এভাবেই চালিয়ে দেবে রিয়া, এটা ঠিকই করে রেখেছিল ।

সকালের চা পাশের ফ্ল্যাটের আন্টি দিয়ে যায় । অত সকালে ভালো করে ঘুমই ভাঙে না রিয়ার । তবু উঠে দরজাটা খুলতে হয়, চায়ের জন্য ।

বিড়বিড় করেই যাচ্ছে, রিয়া । এখন কি করবে, ভেবেই পাচ্ছে না ।
পাশের বাড়ীর আন্টিকে ডাকবে?

নাঃ ! আজকেই মায়ের কাছে খবর যাবে ফোনে ।

সব কটা শত্তুর । সে যতই আদর করে আজকের ডিনারে তাকে নেমতন্ন করুক না কেন আন্টি !

সারাদিনের পরা সালোয়ার কামিজ ছেড়ে তো ফ্রেশ হতে হবে ।

সেটার কি হবে ? আবার কালকে অফিস যেতে হলে তো, এই একই সালোয়ার কামিজ পরতে হবে ।

মাগো ! গা শিরশির করছে ।
হটাৎ, মোবাইলে একটা ফোন । স্ক্রিনে দেখল- কল করেছে আন্টি !

এখন কি করবে রিয়া?

ফোনটা অ্যাকসেপ্ট করবে না বেজে যেতে দেবে? রিজেক্ট করলেই তো সেই আবার সন্দেহ । মেয়েটার কিছু হলো না তো, বা মোবাইল কি হারিয়ে ফেলল ?

মহা ঝামেলায় পড়া গেল ।

দোনো মনো করে ফোনটা তুলল ।

কি রে রিয়া, তুই কোথায়?
এই তো ফ্ল্যাটের সামনে ।
ফোন করতে কি হয়েছিল? এক মিনিট দাঁড়া- আসছি । সকালে বেরুবার সময় ,ফ্ল্যাটের চাবিটা তো আমার কাছে রেখে গেছিলি, হারিয়ে যেতে পারে ভয়ে ।

Sunday, August 13, 2017

রান্না – বান্না





এটা ঠিক – রান্নার কোনো জাত বা নির্দ্দিষ্ট প্রণালী নেই ।
মুখতব্য বা মুখরোচক হতে হবে – এটাই পূর্বশর্ত ।
তবে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে একটা “নিয়ম” তৈরি হওয়াতে –  সেটা সাধারণতঃ মেনে চলা হয় ।
বাঙালি রান্নার ঐতিহ্য যখন সরষের তেলে মধ্যে জনপ্রিয়, সেরকম দক্ষিণ ভারতে হয় নারকেল তেল বা তিলের তেলেই রান্না হয় ।
অবশ্য কেরালাতে আজকাল সাদা তেল ব্যবহার করা হচ্ছে । কিন্তু আন্ধ্রা আবার তিলের তেলেই আটকে ।

মাখন আবার পঞ্জাবে ব্যবহার করা হয়, ঘি – সমগ্র মধ্য বা উত্তর প্রদেশ জুড়ে ।
বাংলাদেশে – বেশ কয়েকবছর হলো পাম তেল ব্যবহার করা হচ্ছে, সরষের তেলের বদলে । কারণটা জানা নেই ।
ব্যক্তিগত ভাবে বলি – অভ্যাসের কারণে কিনা জানি না – সরষের তেলে রান্না ছাড়া ঠিক মুখে রোচে না আমার ।
ডাল হলে – অবরে সবরে মাখন দিয়ে বাগাড় বা সম্ভার দেয়া হয় বটে, খেতেও চমৎকার লাগে, তবে মধ্যবিত্ত হবার কারণে সেটা রোজ সম্ভব নয়, আমার পক্ষে ।
খেতে দুর্দান্ত হয়- সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ।
দুঃসাহস করে, এক আধবার বড় মাখনের প্যাকেট কিনে লুচি ভেজে খেয়েছি বটে ।
একটু দাঁড়ান – জিভের জলটা আটকিয়ে নেই ।
অহো – কি দুর্দান্ত স্বাদ সেই লুচির । শুধু চিনি দিয়েই গোটা কুড়ি খেয়ে নেওয়া, কোনো ব্যাপার নয় ।
আমার বাড়ীতে ডালটা মাষ্ট । দু বেলা হবেই হবে । না থাকলে মনে হয় কি যেন খেলাম না । বিধু ভটের ভাষায়, নিজেকে কেমন যেন উলঙ্গ মনে হয় ।

আমার বাবা মূলত নিরামিশাষী ছিলেন , তাই অড়হঢ় ডাল হিং দিয়ে খেতেন, আমার সেই অভ্যেসটা আছে ।

মামার বাড়ী থেকে বড় হওয়ার কারণে মুশুরের ডাল খেতেও ভালবাসি । এই দুটো ডাল হবেই আমার বাড়ীতে ।
আমি তো মশুরের ডাল দিয়েই সব ভাত খেয়ে নিতে পারি, অন্য কোনো পদের দরকার হয় না । তবে আচার আমার খুবই প্রিয় । বিশেষ করে টক আচার ।
মশুরের ডাল, টক আচার আর ভাত একদম বাপী বাড়ী যা কেস ।

সকালে হাতে গড়া রুটি , আলুর তরকারি, চিঁড়ে দই আর ছুটির দিনে তেলেভাজা লুচি বা পরোটা ।
পারলাখেমুণ্ডিতে (আন্ধ্রা – ওডিশার সীমান্তে) বাবার চাকরি সূত্রে থাকায় সাম্বারটা আমার খুবই পছন্দের ।
কেন জানি না, খাস কোচবিহার নিবাসী আমার উনিও খুব খেতে ভালোবাসেন সাম্বার ।
তাই মাসের বাজারে সাম্বার পাউডার নিশ্চিত ভাবেই আসে আমাদের বাড়ীতে ।

আমি ইলিশ আর চিংড়ি ছাড়া সে ভাবে মাছ খেতাম না, কিন্তু আর আর্থিক কারণেই আর খাওয়া হয় না । যা দাম ! কিনতে গেলেই গা কসকস করে, তাছাড়া অন্য আর কিছু কিনতে পারবো না ।

তাই কাটাপোনা, কাতলা, মৌরালা, কাঁচকি, চারাপোনা,তেলাপিয়া খাই এবং ভালোই খাই । তবে এর মধ্যে কাটা পোনা আমার না পসন্দের তালিকায় পড়ে ।
ডিম পেলে তো কথাই নাই তবে, হাঁসের ডিম আমার এবং পরিবারের হট ফেভারিট ।
দুটো ডিম কোনো দিনও খাই না, খেলেও কালে ভদ্রে ।
সজনে ডাঁটা সকলের প্রিয় আমাদের বাড়ীতে । গোলমরিচ আর আলু দিয়ে ঝোল করলে মনটা কেমন যেন পাগল পাগল লাগে আর গিন্নিকে আবার ভাত বসাতে হয় ।
কাঁচা পোস্ত বাটা আমার খুব প্রিয় আর মুগের ডালে ফুলকপি, কড়াইশুটি বা খিচুড়িতে ।
গরমকালে টক দই খাই । আগে বাড়ীতে জমানো হতো, এখন আর হয় না হ্যাপা বলে । তাই আমুলের দই এবং ফাষ্টো কেলাস ।

টক আচার, দই আর ভাত মিশিয়ে আমার খেতে যা লাগে না আহা । এ ব্যাপারে আমি দক্ষিণ ভারত পন্থী ।

নিমপাতা খাই না । তবে আমার গৃহিণী এবং বৌমা নিম বেগুন বলতে পাগল ।
এবারে আসি আমাদের প্রাত্যহিক মেনুতে ।

দুপুরে :- ভাত, ডাল, আচার, একটা তরকারি, মাছ বা ডিম ( সপ্তাহে চারদিন) আর মুরগীর মাংস ( সপ্তাহে একদিন) আর দই ।

রাতে :- ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা, আলুর ঝাল ঝাল দম( বৌমা আবার এদেশীয়, তাই আলুর দমে আরামসে চিনি ঢেলে খায় এটা)  আর আচার । সাধারণত রাতে আমিষ হয় না আমাদের বাড়ীতে ।
খাদ্যশাস্ত্রের কয়েকটা ব্যাকরণ মেনে চলার চেষ্টা করি ।
যেমন, রাতে দই খাই না ।
সংস্কৃত শাস্ত্রে আছে – ন নক্তৌ দধি ভুঞ্জিত । মানে রাতের বেলা দই খাবে না । কারণ – এতে নাকি শ্লেষ্মা বৃদ্ধি পায় ।
তবে বিখ্যাক গায়ক হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে বাড়িতে রাতে দই খেতে দেখেছি ।
অন্যরা জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন – জীবন একটাই । অমৃতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে চাই না ।
মাংস খাওয়ার পরে – পায়েস, দই খেতে নেই । তাতে নাকি হৃদযন্ত্রকে সমস্যায় ফেলতে পারে ।
অবশ্য মাংস খাবার পরে যে স্বাদটা জিভে লেগে থাকে, সেটা দই পায়েস খেয়ে নষ্ট করার কোনো মানে হয় না বলে আমার মতামত ।
ইলিশ হলে আর মাংস বা ডাল খাবার দরকার নেই বলে বজুর্গরা বলে গেছেন ।
ঝাল, ঝোল, অম্বলে ইলিশ মাছ একাই কাফি । ইলিশ যদি নায়ক হয় বাকিরা সব ফর্সা । ভিলেন হবার কারুর সুযোগ নেই ।

যে সুগন্ধ হাতে লেগে থাকে, তাতে হাত ধুতেও কষ্ট হয় ।
চিংড়ি হলেও তাই । পান্তাভাতের সঙ্গে চিংড়ির মানে কুচো চিংড়ির বড়া খেয়ে দেখুন – দিল্ একেবারে তররর্ ।
বাগদা দিয়ে আলু-ফুলকপির ঝোল এক থালা ভাত খাওয়া কোনো ব্যাপারই নয়।
পোস্তবাটা, নারকোল, সাদা  সর্ষেবাটা দিয়ে গলদাচিংড়ি ! উফ্
লাও লাও – লাও তো বটে, কিন্তু আনে কে ?
পহা কোত্থেকে আসবে মহাই ?