Powered By Blogger

Thursday, November 2, 2017

সংগ্রাম


দেশভাগের কথা সবাই জানেন, তাই আর চর্বিতচর্বণ না করাই ভাল ।

দেশভাগ কেন হয়েছিল, কি ভাবে হয়েছিল কারা দায়ী- এসব এখন পুরোনো কথা ।
আমি এসব স্বচক্ষে দেখিনি অনেকের মতই।

কিন্তু, আমার- মা, বাবা, কাকা,পিসিমা, দাদু, দিদিমার মুখে এই সব শুনতে শুনতে বড় হওয়ার ফলে, সব যেন চোখের সামনে দেখতে পাই ।

ওডিশায় থাকার ফলে বাবা পড়াশোনার জন্য দাদুর বাড়ীতে পাঠিয়েছিলেন । তাই দেখতে পেয়েছি- উদ্বাস্তু কলোনির সংগ্রাম ।

কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ, সব জায়গায় গড়ে উঠেছিল- বাস্তুহারাদের বসতি, লোকমুখে যার নাম ছিল কলোনি ।

অধিকাংশ কলোনি এখন জাতে উঠে গিয়ে হয়েছে – পল্লী ।

পরবর্তী প্রজন্ম আর কলোনী নামটা বজায় রাখেন নি, কারণ ওটা একটা নিকৃষ্ট শব্দ ।

তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মরা এপারে এসে কিভাবে সংগ্রাম করেছেন – সেটা তো ভোলবার নয় ।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় – এই বেঁচে থাকার লড়াইটা যদি ওপারেই করতেন, তাহলে এত অপমান আর জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করতে হত না ।

যাক্, যেটা হয় নি তা নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই ।

আমি মামাবাড়ীতে থাকতাম- বাঘাযতীন কলোনীর ই ব্লকে । মামা বাড়ী আজও আছে সেখানে, কিন্তু দালান কোঠা হয়েছে ।

আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য, যা যা দরকার – সবই মজুত সেখানে, তবে পাঁচ মামার মধ্যে মাত্র তিনজন জীবিত ।

রূপান্তরটা আমার চোখের সামনেই হয়েছে ।
ছিল – মাটির মেঝে, বেড়ার ঘর । সামনে ছিল দুটো বকফুলের গাছ ।
জলের জন্য ছিল – টিপকল । জলে ভকভক করছে আয়রণের গন্ধ ।

স্নানের জন্য ছিল – পুকুর । তালগাছের গুঁড়ি দিয়ে তার ঘাট বানান ।
এইরকম পুকুর বাঘাযতীনের প্রায় সব জায়গাতেই ছিল । হয়, কাটান বা প্রাকৃতিক।

ওপারে অভ্যেস ছিল, পুকুরে হাত পা ধোয়া, স্নান করা, সেটাই এপারে তৈরি করে ওপারকে ছুঁয়ে থাকার একটা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।

লায়েলকার মাঠেও পুকুর ছিল । বাঘাযতীন থেকে হেঁটে, বিজয়গড় শিক্ষানিকেতনে যাবার সময় দেখা যেত একটা পুকুর ।

ফাঁকা লায়েলকার মাঠে তখন তৈরি হল – একটা দালান বাড়ী ।
নাকি, ইংরেজি ব্যাকরণের বিখ্যাত লেখক – পিকে দে সরকারের মালিকানা ছিল ওই বাড়ীটার ।

তারপর সেই পুকুরটাকে ঘিরে তৈরি হল – কয়েকটা দোতলা বাড়ীর । শুনতে পেতাম – আকাশবাণীর তখনকার বাংলা সংবাদ পাঠিকা বিখ্যাত ইভা নাগের একটা বাড়ী ছিল ওখানে ।

সত্যি মিথ্যে যাচাই করার সময় ছিল না তখন ।

অনেক পরে, বাঘাযতীনে আমার মামার বাড়ী ঢোকার পরের গলিটা (আগের গলিটা ছিল, চালপট্টির) দিয়ে ঢোকার বাঁ দিকে বাড়ী তৈরি করেন অভিনত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায় ।

যাওয়া আসার পথে এক ঝলক কখনও দেখতে পাওয়া যেত মাধবীদেবীকে ।

মাধবীদেবীর জীবনসঙ্গী- নির্মলকুমার পড়েছেন মালদার অক্রুরমণি স্কুলে। তাঁকে একটা সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন – স্কুল কর্তৃপক্ষ বা প্রাক্তনীরা । ঠিক মনে নেই । তবে সেই সময় আমি মালদায় ।

সন্ধেবেলা চারিদিক থেকে ভেসে আসতো চিৎকার করে পড়ার আওয়াজ।
আমার কেন জানি এখন মনে হয়, সেই চিৎকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকত- প্রতিষ্ঠিত হবার বাসনা ।

লন্ঠনের মৃদু হলদেটে আলো – খালি নিয়ন সাইনের অপেক্ষা ।
রাত বিরেতে তিনটে আলু বা পেঁয়াজ ধার নেবার প্রয়োজন হত অনেকের কারণ হয়তো বাড়ীতে অতিথি এসেছেন ।

পরের দিন বাজার করে, সেই ধার মেটান হতো ।

বাঘাযতীন বাজার ছিল বিজয়গড়ের রাস্তায় ।

কলোনি ঢোকার মুখ আর বাঘাযতীনের মধ্যে ছিল – বড় রাস্তা ।
চলত- ৮০ বি আর সরকারি পাঁচ নম্বরের দোতলা বা একচোখ কানা একতলা বাস ।

ভোরবেলা – পুণ্য করতে কিছু লোক যেতেন গঙ্গাস্নান করতে ।
বেশীর ভাগ লোকই পুকুরে স্নান করতেন । বাসভাড়াটা সেই হিসেবে তখনকার দিনেও বেশী ছিল ।

তাই অনেকেই যেতেন না, সাশ্রয় করার জন্য মানে যেটুকু পারা যায়।
পুকুরে স্নান করার মন্ত্র ছিল । একঢেলা মাটি তুলে পাড়ে ছুঁড়ে দেবার ।

এই করে করে বোধহয় পুকুরটা গভীর হত ।

উত্থিষ্ঠোত্থিষ্ঠো পঙ্ক ত্বং ত্যজ পুণ্য পরস্য চ।
পাপানি বিলয়ং যান্তু শান্তিং দেহি সদা মমঃ॥

হে পাঁক, তুমি ওঠো । পরের পুণ্য নিয়ে আমাদের পাপগুলো দূর করে আমাদের শান্তি দাও ।

শান্তি এখনও খুঁজে চলেছি ।

ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ,

-----
মন্ত্রটা ভুলে গেছিলাম । সিলেটের পরম বন্ধু বিধুভূষণ ভট্টাচার্য মন্ত্রটা পাঠিয়েছেন আমাকে । আমি কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে ।

Monday, October 30, 2017

দক্ষিণী ক্ষেতুদা


দুপুরের দিকে একটা ব্যক্তিগত কাজ ছিল, সেটা সেরে – ভাত টাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, খানিক।
ঠিক, ঘুম বলা যাবে না, তবে তন্দ্রা মতন হয়েছিল আর কি !
এখন আমার কাজ বলতে দুই – খাই আর শুই ! তাই দুপুরে বেশী ঘুমোই না । রাতে আর ঘুম আসবে না !
তখন আর কটা হবে? এই সন্ধে ছটা ফটা ! হরির দোকানে গেলাম ।
চা খেয়ে, সবে গেলাসটা রাখব, এই সময় একটা মেরুন রঙের অল্টো গাড়ী এসে দাঁড়াল, দোকানের সামনে । ড্রাইভিং সিট থেকে গাঁকগাঁক করে শব্দবাণ ভেসে এলো -
আমার জন্য চা বল্ রে রামকেষ্ট । আওয়াজ শুনে দেখি – আমাদের ক্ষেতুদা, মানে ক্ষেতু বাগচী ।
চা খেতে খেতে ক্ষেতুদা উবাচ – দমদম স্টেশন যেতে, মতিঝিলের একটু ভেতরে ,ইসকন একটা সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারের দোকান খুলেছে, জানিস?
না তো !
জানবি কি? ব্যাটা তো সবসময় ঘরে বসে থাকিস ! তুই না, ধোসা- ইডলি খেতে ভালবাসিস !
সে তো ভালবাসি, তবে পাচ্ছি কোথায়? মাঝে একটা ছেলে, সপ্তাহের মঙ্গল আর শনিবার নিয়ে আসত । এখন আর আসে না । বলে- বিক্রি নেই !
বলিস্ কি রে? এই ইসকনওয়ালারা তো আরও দুটো ব্রাঞ্চ খুলেছে কলকাতায় !
কোথায়, কোথায়?
মিন্টো পার্ক আর গুরুসদয় দত্ত রোডে !
তাই?
তালে আর বলছি কি ! চ, চ খেয়ে আসি !
তুমি যাও ক্ষেতুদা ! আমার আজ পেট ভাল নেই!
আম্মো বারিন্দির, তুইও বারিন্দির ! তোর পেটের প্যাঁচ আমি বুঝি না- মনে করছিস? তোর গায়ে টাচ হলেই তো আমি উল্টো সাত পাক ঘুরি- প্যাঁচ ছাড়াতে ।
সে তো আমিও !
বুঝি রে বুঝি! বারিন্দিরের প্যাঁচ বলে কথা !
মাইরি বলছি,ক্ষেতুদা – তুমি টেনিদার জ্যাঠা আর ঘনাদারও তস্য তস্য দাদা ! তুমি খাওয়াবে, এটা বিশ্বাস করার চেয়ে, ম্যানড্রেক- মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখাচ্ছে- এটা বিশ্বাস করা বরং ভাল ।
ছোট মুখে বড় কথা বলছিস যে বড়? বলি, আমি কি তোকে খাওয়াই নি?
সে তো- দু টাকার চানাচুর !
অকৃতজ্ঞ! দু টাকাটাই দেখলি, চানাচুরটা দেখলি না? চ চ, গাড়িতে ওঠ্ । খেয়ে আসি ওখান থেকে !
মা কালীর দিব্বি ! আমার পকেটে মাত্র দশটা টাকা ! তাও হরিকে দিতে হবে চায়ের দামের জন্য ! তুমি যাও দাদা – আমি না হয় পরে যাবো একদিন ।
এই দ্যাখ !
কি?
তিনটে পাঁচশো টাকার নোট আমার পকেটে ।
কোত্থেকে পেলে দাদা?
আবার?
মানে তোমার কাছে তো পাঁচ টাকার বেশী দেখি নি, তাই আর কি !
বাজার খরচ থেকে জমিয়েছি – তিন মাস ধরে !
বৌদি ধরতে পারে নি ?
তা পারে নি !
যাক ! বাঁচা গেল !
যাবি তো?
চলো – এত করে বলছ যখন !
তা, লোকজনকে জিজ্ঞেস করে মতিঝিলের ভেতরে অল্প ঢুকেই
দোকানটা ।
বড় করে ইংরেজিতে লেখা – ইসকন । সাথে রাধাকৃষ্ণের ছবি ।
দোকানের দুটো ভাগ । একদিকে মিষ্টি আর একদিকে টেবিল আর চেয়ার পাতা ।
মিষ্টিগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল –মে মাসের দোওয়া দুধ থেকে , ছানা বা ক্ষীর হয়েছে- অগাস্ট মাসে আর মিস্টি তৈরি এই অক্টবরে ।
ভাবগতিক ভাল নয় দেখে কেটে পড়ার তাল করছি, সেই সময় দেখি ওডিয়া ভাষায় কথা বলছে কাউন্টারে বসা ছেলেটা ।
ওর ফোন শেষ হতেই জিজ্ঞেস করলাম – ঘরঅ কৌঠি কি হ? ( বাড়ি কোথায় হে?)
কান এঁটো করে হেসে বলল – আইজ্ঞা, জাজপুর ! আপণঅ ওডিয়া কি? ( আজ্ঞে জাজপুর । আপনি কি ওডিয়া?)
(আগামীকাল শেষ পর্ব)
তুমঅ ঘর জাজপুররে, বিরজা মন্দিরঅ পাখরে ?
( তোমার বাড়ী, জাজপুরে- বিরজা মন্দিরের কাছে?)

আইজ্ঞা, হেলে টিকে ভিতরে । আপনঅ  বিরজা মন্দিরঅ দেখিছন্তি কি ?

(আজ্ঞে, একটু ভেতরে । আপনি বিরজা মন্দির দেখেছেন?)

 মলা ! মু পরা বালেশ্বর লুকঅ ! বিরজা হেলে, বঙালি মানঙ্ক দুর্গা । হেলে, এইঠি – দুর্গা, দি হাতিয়া আউ মহিষাসুরঅ কু পানি মহিশাসুর কুহা যায়ে । এইঁথি পাঁই এই বিরজা মন্দিরঅ পরা বিরজা ক্ষেত্র !
( মর ! আমি বালেশ্বরের লোক ! বিরজা হলেন – বাঙালিদের দুর্গা, কিন্তু দুটো হাত আর মহিষাসুরকে জল মহিষাসুর বলে । এই জন্য- বিরজা মন্দিরকে বিরজা ক্ষেত্র বলা হয়)

আপনঅ তো সবু জানিছন্তি
(আপনি তো সব জানেন)

তমে জানিছ কি, চৈতন্য দেবঅ পরা জাজপুরঅ লুকঅ ।

( তুমি জানো কি, চৈতন্য দেব জাজপুরের লোক!)
আইজ্ঞা – ভলঅ ভাবে জানে । সেঁইথি পাঁই ইসকন গুটে মন্দিরঅ ভি করিছন্তি জাজপুররে ।

( আজ্ঞে, ভালো ভাবেই জানি । সেই জন্য তো  ইসকন সেখানে একটা মন্দির করেছে ওখানে)
 হঁ না ?
( তাই নাকি?)
ক্ষেতুদা দেখলাম –উসখুস করছেন । বললেন – তোর এই ভজর ভজর থামাবি? ক্ষিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে, আর তুই- ইতিহাস বলছিস্ । বলি হ্যাঁ হে, কি কি পাবো এখানে?

এবারে ছেলেটা সরাসরি বাংলায় চলে এল যদিও একটু ওডিয়া টান ছিল বাংলা কথায়।

আজ্ঞে- ধোসা, ইডলি, বড়া, সাম্বার বড়া, সব পাবেন । চাই কি, রাতের ভাতও খেয়ে যেতে পারেন । আমাদের কোনো রান্নাতেই পেঁয়াজ রসুন নেই । এমনকি মিষ্টিতেও ।

মিষ্টিতে কেউ পেঁয়াজ রসুন দেয় নাকি? – ক্ষেতুদা রেগে অগ্নিশর্মা ।

আজ্ঞে, পেঁয়াজ রসুনের ছোঁয়া পর্যন্ত লাগে না এখানে !

সেটা সব মিষ্টির দোকানেই । সিঙারাতে পুরেও পেঁয়াজ রসুন  থাকে না ।
যাকগে-আমরা ধোসা খাবো । কত করে পিস?
আজ্ঞে ৭০ টাকা ।
নারকেল চাটনি আর সাম্বার থাকবে ?
আজ্ঞে, সেটা তো থাকবেই ।
আপাতত দাও দু প্লেট । খেয়ে দেখি । কতক্ষণ লাগবে আনতে ?

এই ২০ থেকে ২৫ মিনিট !
আচ্ছা, ঠিক আছে ।

ছেলেটি কে .ও.টি নিয়ে চলে গেল কিচেনে ।
আমার ,মনে ধন্ধ !  আন্ধ্রার কথা জানি, কিন্তু তমিড়নাড্ ? লাগাও ফোন – প্রকল্পকে ।

ফোন ধরলে – দুটো খেজুরে আলাপের পর জিজ্ঞস করলাম – বলি,তোমাদের চেন্নাই শহরে পেঁয়াজ রসুন  ছাড়া মসালা ধোসা পাওয়া যায়?

খানিক চুপ থেকে – প্রকল্পর উত্তর :-

সেটা তো ঠিক জানি না, তবে খুঁজলে মিলতে পারে । তবে পেঁয়াজ রসুন   ছাড়া ধোসার ফ্লেভারটই তো আসবে না !

 ওখানে আমিষ খাওয়ার চল এখন কেমন ?

বেড়েছে দাদা । এমনকি তমিড়রা এখন চাট, ফুচকা, চিকেন তন্দুর, তড়কা সবই খায় । তবে তড়কাতে কারি পাতা থাকে।
তাই?
হ্যাঁ ! আজকাল রুটিও খায় তমিড়রা ।
বলো কি হে? রুটি ?
হ্যাঁ দাদা । আর আগে রাতে ইডলি খাওয়ার চল ছিল না, তবে এখন রাতে দেদার খায় ইডলি, তাও মাংসের সাথে ।
হোটেলে – মিলস্ রেডি বোর্ড থাকে ?

থাকে, তবে শুধু দিনের বেলা ! রাতে থাকে না ।
 কেন?
মিলস্ মানে এখানে ভাত । রাতে এরা ভাত খায় না এখন ।
ব্রেকফাস্টটাতো আগে হোটেলেই সারত, এখন কি অবস্থা ?

প্রায় কমে গেছে । বাড়ীতেই করে নেয় এরা ।

আর মিষ্টি?

ওই মাইশোর পাক আর লাড্ডু ।

ইতিমধ্যে ধোসা চলে এসেছে – গরম গরম । বেশ মন মাতান পুরোনো সুবাস ।
প্রকল্পকে বললাম – পরে কথা বলব ।

ধোসার মশালাতে – আলু,কড়াইশুঁটি,গাজর, এই সব ।
সাম্বারেও তাই । শুধু নারকোলের চাটনিতে ধনেপাতা বাটা ।ওটা খেয়ে ভাল লাগল না।
 রাতে নাকি ভাতও মেলে । দুরকম তরকারি, ডাল, সাম্বার, পাঁপড়, চাটনি ।
দাম- ২০০ টাকা প্লেট ।
 ক্ষেতুদা বলল – চ রামকেষ্ট ! ফুটি এবারে । তোর তো ইতিহাস, ভূগোল সব জানা হল । এবারে বাড়ী না গেলে ঝাড় ! রাতে তো ভাত খেতেই হবে । তবে কম । পেট ভরে গেছে । তোর বৌদি আবার সন্দেহ করবে ।

ছেলেটি বলল – আবার আসবেন !









Friday, September 22, 2017

টেবল ম্যানার্স

খাওয়া দাওয়া নিয়ে আমার দুর্বলতা সর্বজনীন । এই বয়সে এসেও, সেই দুর্বলতাটা ভয়ঙ্কর ভাবে বিদ্যমান । খেতে বসলে আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না আমার ।

আমার ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে জল খাওয়া বা কচকচ করে মাংস চিবোনোর শব্দ শুনে আমার দিকে অনেকেই ( এর মধ্যে আমার “উনিও” আছেন ) ভুরু কুঁচকে তাকান ।

একবার তো পার্ক স্ট্রীটের “স্কাইরুমে” ( এখন ঘচাং ফু হয়ে গেছে ) গিয়ে বলেই দিয়েছিলাম- ও ঠাহুর !!! ঝুলে ( স্যুপ) কদু ( লাউ) দিসো ক্যা?

আশ্চর্য জনক ভাবে উত্তর এসেছিল :- মিঁঞা, ধইর‌্যা ফেলসেন দেহি ।

তারপর থেকেই আমার “কনফি” তুঙ্গে । এই সব নাক উঁচুপনাকে – আমি তাচ্ছিল্যর চোখেই দেখি এখন ।

ফেসবুকের বন্ধুদের বাইরেও কয়েকটা বিয়ে, এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে– খাওয়াটা জব্বর হয়েছিল ।

আজ একটু খাওয়া দাওয়া নিয়ে অন্য কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলি ।

প্রথমেই বলবো – আজ থেকে প্রায় বছর পঞ্চাশ আগেকার কথা ।

যাদের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ– তাঁরা আবার বারিন্দির এবং স্বয়ং গৃহকর্তা আবার ডাক্তারও বটে ।

মাটীতে কলাপাতায় পরিবেশন আর মাটীর ভাঁড়ে জল ।

পদগুলোও বেশ উঁচুমানের । শেষ হয়ে এসেছে খাওয়া, তখন গৃহকর্তার মনে পড়ল শাকটা দেওয়া হয় নি, প্রথম পাতে ।

উনি যথারীতি উচ্চগ্রামে হাঁক ( বারিন্দিররা আবার পেছনে ভর দিয়ে কথা বলেন- বরিন্দের প্রাচীন প্রবাদ) দিলেন :- ওরে শাকটা নিয়ে আয় !!!!

নামকরা খাইয়েরা আপত্তি তুলে বললেন :- ওটা আর দিতে হবে না । এখন তো গলা পর্যন্ত মিষ্টান্নে ভর্তি ।

প্রথামত শাক পেটের নীচে থাকার কথা ।

ডাক্তার আবার হাঁক দিলেন বরিন্দ টোনে :-

ওরে, শাক গুলো একটা বালতীতে গুলে নিয়ে আয়, সঙ্গে গরুকে ইনজেকশান দেওয়ার মোটা কাঁচের সিরিঞ্জ । শাকটা সকলের পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দি । অতিথি সৎকারে ত্রুটি যেন না হয় ।

আপত্য কারীরা সহ সব নিমন্ত্রিতরা দুড়দার করে উঠে দৌড়ে পালিয়েছিলেন সেবার ।

বিল্ববৃক্ষ

শুধু পূজার সঙ্গে সম্বন্ধ আছে বলে নয়- গাছের থেকে একটা ডাল কাটতেও কুণ্ঠা ছিল, প্রাচীন কালের লোকেদের । এটা জানানর জন্যই লিখলাম ।

+++++++

ওঁ বিল্ববৃক্ষ মহাভাগ সদা ত্বং শংকরপ্রিয়।

গৃহিত্বা তব শাখাঞ্চ দুর্গাপূজাং করোম্যঽম্।।

ওঁ শাখাচ্ছেদোদ্ভবং দুঃখং ন চ কার্যং ত্বয়া প্রভো।

দেবৈর্গৃহীত্বা তে শাখাং পূজ্যা দুর্গেতি বিশ্রুতিঃ।।

অসার্থ্য:-

হে বিল্ববৃক্ষ, হে মহাভাগ (দয়াদি সদ্‌গুণসম্পন্ন) ! তুমি সর্বদা শংকরের প্রিয় ।

আমি তোমার শাখা লইয়া দুর্গাপূজা করিব । হে প্রভো ! তুমি শাখাচ্ছেদজনিত দুঃখ করিও না ।

দেবগণ তোমার শাখা লইয়া দুর্গাপূজা করেন, এইরূপ প্রসিদ্ধি আছে ।

=======

ঋণ :- ডঃ নিরঞ্জন মিশ্র ,এম.এ, কাব্যমীমাংসা তীর্থ, প্রণীত- কালিকা পুরাণোক্ত দুর্গোৎসব পদ্ধতি ।

Wednesday, September 20, 2017

পুজোর খাওয়া

স্পাঘেটি, চাউ, রোল- এসব শুনলে কি মনে হয়? মাথার মধ্যে , ঘেটি ধরে, চই চই করে রোলিং করে স্পা হচ্ছে। যা- তা ব্যাপার!

পূুজোর কেনাকাটি করতে গিয়ে, বাঙালী যেটা লিষ্টে প্রথম রাখে- সেটা হলো, বাজার করতে গিয়ে কি খাওয়া হবে!

তারপর , প্ল্যানিং চলে পূজোর চারদিন আরও সব কি খাওয়া হবে। খেতে খেতেই এই বাঙালী জাতটা
গেল!!!!!

এমন পেট সর্বস্ব জাত, দুনিয়াতে, গ্রীক ছাড়া আর কেউ নেই।

প্রবাদ আছে, গ্রীসে গেলে নাকি বেল্টের ফুটো বাড়াবার দরকার নেই।

পূজোর সময়, বাঙালীর সব বিচিত্র খাওয়া- দাওয়ার কম্বিনেশন। ইডলি- দোসা, বিরিয়ানী, কাবাব, লুচি-মাংস, মিক্সড চাউমিঁএ- আরও সব কত নাম জানা- অজানা খাবার! বাপরে বাপ!

ফেসবুকে আবার আজকাল দেখছি, বাজার দর দিচ্ছেন, বিভিন্ন জন!

কোলকাতার সল্ট লেকের একটি পাড়ায় যে পুজো হয় , ওদের চাঁদার বরাদ্দ ২০০০ টাকা, তবে সপ্তমী থেকে দশমী -এই ৪ দিনে দু বেলার খাবার ব্যবস্থা পুজো প্যান্ডেলে !

পূব বাংলায়, পুজোর রান্না করতে করতে, রান্নার ঠাকুর নাকি, এই গানটি গাইতো:—

“কি বঙ্গ দ্যাখাইলি হরি কলিতে

মানে না ধর্মাধর্ম করে না কোনও কর্ম

সুগম্য অগম্য পথে চলিতে”—

এই ঠাকুর মনে হয়, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিল। এখন তো তাই হচ্ছে!

বাড়ির তৈরি গাওয়া ঘি, কাঠের উনুনের রান্নার স্বাদ, মাটির হাঁড়ির ঝরঝরে ভাত, হাঁড়ির ভাতের মাঝে

সরষে-লঙ্কা বাটা কাঁচাতেল দিয়ে ভাপে দেওয়া ইলিশের গন্ধ, কখনও পুজোর সকালের লুচি, যেগুলো এপার বাংলার ছোট মাপের লুচি না, আকারে বেশ বড়। প্রায় মাপসই এখনকার একটা ষ্টীলের রেকাবীর মত।
উল্লুস!

অষ্টমীতে পাঁঠা বলি হত। সেই মাংসে পেঁয়াজ রসুন দেওয়া হত না।তাই বলা হত নিরামিষ মাংস। ধনে বাটা, জিরে বাটা, লঙ্কাবাটা দিয়ে তৈরী সেই নিরামিষ মাংস চেটেপুটে খেত বাঙালী।

“ঘরের মেঝেতে নকশি কাঁথাটি মেলে ধরে পল্লীবধূ তাঁর কলমি ফুলের মতো সুন্দর আঙুলগুলি দিয়ে সরু সূত্র জালে যে পদ্মফুলটাকে জীবন্ত করে তুলেছেন, কৃষাণ বধূ ঘরের আঙ্গনে.............. ঘরের চৌকাঠে জানালায় সুতার মিস্তরিরা কঠিন কাঠ কেটে যে নক্সা এঁকে দিয়ে গেছে — বাড়ির গৃহিণী পাথরের উপরে সূক্ষ্ম বাটালি ও নরুনের আঘাতে তাকে রূপ দিয়ে তারই ছাঁচে নানা রকমের পিঠা তৈরি করে আপন আত্মীয় পরিজনদের আনন্দ পরিবেশন করেছেন”— জসীমউদ্দিন।