হউ - শব্দটা একটি ওডিয়া লব্জ । এর কাছাকাছি
অর্থ বাংলাতে করলে দাঁড়ায় – আচ্ছা বা বেশ ।
পুরী বাঙালিদের কাছে বেড়ানোর জায়গা । রথদেখা
– কলাবেচা দুটোই হয় । জগন্নাথকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় – চক্কাডোলা । মানে হলো গিয়ে
– চাকার মত গোল চোখ ।
আমি ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পুরীতে
বেচুবাবুর কাজ করেছি – দুটো ওষুধ কোম্পানির হয়ে ।
প্রথমটা – জার্মান রেমেডিস, পরে সারাভাই
কেমিক্যালস । অবশ্য দুটো কোম্পানির ক্ষেত্রেই কটকঅ শহরঅ, বড় মনোহরঅ ছিল আমার হেডকোয়ার্টার
।
পুরী, বড় জেলা হওয়াতে ন্যূনতম সাতদিন কাজ
করতে হতো সমস্ত জেলার কিছু বাছা অংশে । সেলও ভালো ছিল ওই জেলায় ।
থাকার জন্য – ছিল ইউনিয়েনের রেষ্টহাউস ।
রাঁধিয়ে ছিল – নীরঅ । চমৎকার রান্না করতো । যে বাড়ীতে রেস্ট হাউস ছিল- তার নাম ছিল
– অক্ষয় ধাম ।
সব মিলিয়ে দুটো বড় বড় ঘর রেষ্টহাউসে । খাটা
পায়খানা । পরিবারকে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো না, তবে পরের ঘরটা প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকতো
বলে আমরা রেভিনিউ তোলার জন্য – ছেড়ে দিতাম একটা ঘর ।
রেষ্ট হাউসে মদ খাওয়া বারণ । আমরা কেউই
নিয়ম ভাঙতাম না । খেতে ইচ্ছে হলে চেনা শোনা হোটেলে একটা ঘরে ম্যানেজ করে টাংকু টানা
চলতো ।
বেরিয়ে আসার সময় ম্যানেজার আর বয়দের একটা
ভালো রকম বখশিস দিতাম আমরা, খাবারের দাম সহ ।
তবে টাংকু হিসেবে আমাদের বিয়ারটাই বেশী
পছন্দ ছিল – কারণ তখন কোয়ালিটি কন্ট্রোলে পাশ না হওয়া বিয়ারের বোতলগুলো সেই কোম্পানির
প্রতিনিধিরাই এনে দিতেন, কখনও পয়সা দিয়ে বা না দিয়ে ।
না না, গুণগত মান খারাপ ছিল না, তবে কোনো
কোনো বোতলে ঠিকঠাক ফিলিং হতো না বলে, সেগুলো কোম্পানি ষ্টাফদের হয় মিনে মাগনায় বা অল্প
কিছু টাকা নিয়ে বিলিয়ে দিতো কোম্পানি ।
পরিভাষায়, এদের নাম ছিল – সেকেন্ডস্ । দাম
প্রতি বোতল- দেড় টাকা ।
ঠিক সেই সময়েই প্রথম ফিল্টার সিগারেট লঞ্চ
হয় উইলস কোম্পানিতে । নাম ছিল – ফিলটার উইলস্ । দাম ছিল – প্রতি প্যাকেট আশী পয়সা ।
একটা প্যাকেটে থাকতো দশটা সিগারেট স্টিক । সেই সময়ে – বেশ দামী সিগারেট ।
তখন ক্যাপস্টান সিগারেটে দেশী তামাক ব্যবহারের
কারণে – গুণমান পড়ে গিয়েছিল, ফলে ঠিক আভিজাত্যটাও ছিল না সেই ব্র্যান্ডের । দামও কমে
এসেছিল ।
পুরী মন্দিরের পেছনেই ছিল লক্ষ্মীবজার ।
এটা এখন আর নেই । যেমন নেই একটা বিশাল বটগাছ – পুরী মন্দিরে ঢোকার দরজায় ।
লক্ষ্মীবজারেই ছিল আইটিসির পুরী জেলার ডিষ্ট্রিবিউটার
। এনার আসল পরিচয় ছিল – মন্দিরের নাম করা পণ্ডা, বাঙালি উচ্চারণে পাণ্ডা ।
এই কোম্পানি বাজার ধরার জন্য প্রত্যেক খরিদ্দারকেই
এক প্যাকেট কিনলে আরেকটা প্যাকেট ফ্রি দিতেন সেই সময় – যদিও শতকরা নিরানব্বই কেসেই
এই ফ্রিটা জুটতো না প্রান্তিক খরিদ্দারের ।
আরও একটা ব্যাপার ছিল – একটা প্যাকেটে যদি
৯ টা সিগারেট দৈবাৎ পাওয়া যেত, তবে দোকানে থাকা কোম্পানির ফর্ম ভর্তি করে বিক্রেতার
সই ছপ্পর নিলেই , দিনকয়েকের মধ্যেই মিলতো মুফতে পাঁচ প্যাকেট সিগারেট ।
এই সবই জেনেছিলাম, কারণ ওই ডিস্ট্রিবিটারের
আপন ভাই ছিলেন আমার কোম্পানির ডিষ্ট্রিবিটার । তাই সিগারেটটাও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রায়
বিনে পয়সায় । বিয়ারও তাই ।
এঁদের দৌলতে প্রায়ই জগন্নাথ দেবের নিরামিষ
ভোগ জুটতো লাঞ্চ হিসেবে । ষোলো রকম তরকারি আর সুগন্ধী আতপ চালের ভাত ।
ফুরফুরে সুগন্ধে ভরে উঠতো চারিদিক ।
এখন যেটা স্বর্গদ্বার সেটা আসলে শ্মশান
। তারই পাশ দিয়ে আমাদের আসতে হতো রেষ্টহাউসে জনবিরল রাস্তা ধরে । উঁচু নিচু রাস্তার
বাঁপাশে ছিল একটা আশ্রম আর ডান দিকে ছিল রেলের গেষ্ট হাউস ।
তাই, বেশী রাত করতাম না রেস্টহাউসে ফেরার
সময়ে । সন্ধে সাতটার মধ্যেই শুনশান হয়ে যেত রাস্তাটা ।
রেষ্টহাউসের বাঁধা রিক্সাওয়ালা ছিল – বাঙালি
রতন । সারা পুরীতে ঐ একটাই বাঙালি রিক্সাচালক ।
ভয় দেখাতো – নানা গল্প শুনিয়ে, ফলে বিশ্বাস
না করলেও একটা শিরশিরে অনুভূতি তো থাকতোই । সবসময় সন্ধে সাতটার মধ্যে ফেরা হতো না,
কারণ স্টেশনের কাছে কিছু ডাক্তারদের ভিজিট করে দেরীও হতো ।
আগেই বলেছি – মন্দিরের সামনে বটগাছ ছিল
আর ছিল , একটা উঁচু মত জায়গা, যেখানে বেশ কিছু দোকান এবং ডঃ মহাদেব মিশ্রের চেম্বার
ছিল ।
ভদ্রলোক ইংরেজিতে কথা বলা পছন্দ করতেন না,
তবে ওডিয়া টানে বাংলা বলতেন আর আমাদের কথা বাংলাতেই শুনতেন ।
তবে, মেডিক্যাল টার্ম গুলো ইংরেজিতে না
বলে উপায় ছিল না, আর বললে – তিনি কিছু মনেও করতেন না ।
পুরী শহরে, সেই সময়ে
কুল্লে একটাই অভিজাত হোটেল ছিল, বোধহয় এখনও আছে ।
বি, এন, আর হোটেল
নামেই তার পরিচিতি । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ে চালাতেন এই সরাইখানা ।
সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ের
আগের নাম ছিল – বেঙল নাগপুর রেলওয়ে । সংক্ষেপে – বি. এন. আর ।
ঠাট্টা করে বলা হতো
– বি নেভার রেগুলার ।
সময়ে নাকি কোনো ট্রেনই
চলতো না । একবার দেখা গেল- একটি ট্রেন ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় ষ্টেশনে এসে দাঁড়ালো ।
আশ্চর্য হতেই – গার্ড
সাহেব নাকি ভুল ভাঙিয়েছিলেন । এটা গতকালের ট্রেন, পাক্কা চব্বিশ ঘন্টা লেট । আজকের
ট্রেনের কোনো পাত্তা নেই ।
আমি অবশ্য বি. এন.
আরের ট্রেনে চড়িনি । তবে, বালেশ্বর, কটক, ভুবনেশ্বর, পুরী, ওয়ালটেয়ার ( বর্তমান ভাইজাগ
)ওয়েটিং রুমে, বার্মা টিক কাঠের আলনা, চেয়ার, কাবার্ডে বি. এন. আর নামটা খোদাই করা
দেখেছি ।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত
হোটেলটি তৈরিই হয়েছিল – সায়েবদের জন্য । নিজস্ব সী বিচ আর নুলিয়াও ছিল হোটেলের ।
সেভেন কোর্স লাঞ্চ
আর ডিনার ছিল – কি বিশেষণ বলি বলুন তো ? এককথায় মাইন্ড ব্লোয়িং ।
চিকেন আলা কিয়েভ
– প্রথম এখেনেই খাই । ছুরি দিয়ে কাটলেই বেরিয়ে আসতো তরল সোনার মত মাখন । ওই স্বাদের
“কোনো ভাগ হতো না” । মাখনের সাথে মাংস গুলো ইসোফেগাস ধরে
স্টমাকে চলে যেত কোনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছাড়াই ।
টেষ্ট বিড গুলো বুঁদ
হয়ে থাকতো সেই স্বাদে । “ত্রিলোক তারিণী গঙ্গে, তরল তরঙ্গ রঙ্গে এ বিচিত্র উপত্যকা
আলো করি করি চলেছ মা মহোল্লাসে!” ...
মাখনে মাংসে জিভ একেবারে
“গলগলায়িত” ।
শেষ পাতে আসতো – হিমালয়ান
আইসক্রিম । আকৃতি এবং বপুতে একেবারে হিমালয় । পরতে পরতে তার অনেককিছু থাকতো ।নিজচোখে
না দেখলে এই আইসক্রিমের রূপ- বর্ণণা দেয়া খুবই কঠিন। অনেকটা 'অন্ধের হস্তি' দর্শনের
মতো।
ও হরি – বলাই হয় নি
। আমাদের কোম্পানির মিটিং এখানে হতো মূলত আমাদের ম্যানেজারদের দৌলতে । এছাড়া পুরীর
ডাক্তারদের মাঝে মাঝে এখানে খাওয়ানো হতো – কোম্পানি দের পয়সায় । আমাদেরটাও ব্যতিক্রম
ছিল না ।
যা হয় আর কি – ম্যানেজার
থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য কর্মীদের সাথে আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল সহজবোধ্য কারণেই । এছাড়া
ওষুধপত্র তো ছিলই ।
১৯৭৪ সালে বিয়ে করে
– এই হোটেলে মধুচন্দ্রিমা যাপন করবো ভেবেছিলাম, কিন্তু দামের কথা ভেবে পেছিয়ে আসি ।
জানতে পেরে -বন্ধুরা
চাঁদা তুলে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল । এখানেই আমার একমাস বিয়ের পরিসমাপ্তি
ঘটতে পারতো ।
তবে সমুদ্রে সাঁতার
কি ভাবে কাটতে হয়, সেটা শিখে যাবার ফলে, চুলের মুঠি ধরে ওনাকে জল থেকে তুলে নিয়েছিলাম
– তাই ৪২ বছর ধরে বিবাহিত জীবন কাটাতে পারছি শৃঙ্খলিত অবস্থায় । সে সব দুঃখের কথা না
হয় পরেই বলবো ।
দেখুন তো – কথায় কথায়
আসল বিষয় থেকে সরে গেছি ।
ডঃ মহাদেব মিশ্র ভিজিটে
কোনো স্যাম্পেল নিতেন না । তবে, মাসে বা দুমাসে একবার করে ক্যাম্প করতেন নুলিয়া এবং
রিক্সাওয়ালাদের বস্তিতে । আমরাও সোৎসাহে অংশ গ্রহণ করতাম ।
সেবার এক জার্মান
কোম্পানির ছেলে এলো পুরীতে । পাক্কা দর্জিপাড়ার নতুন দা । ফ্রম টপ টু টো – পুরো ক্যালকেসিয়ান
।
ধরা যাক, তার নাম
অনুপ । অনুপ আমাকে জিজ্ঞেস করলো – দাদা আপনার কোলকাতায় বাড়ী কোথায় ?
গম্ভীর হয়ে বলেছিলাম
– মেদিনীপুরের কাছেই । অনুপ উত্তর দিয়েছিল – আমি নর্থ কোলকাতার তো । সাউথটা আমার তেমন
ঘোরা নেই । মেদিনীপুর, ভবানীপুরের কাছে বোধহয়, তাই না ?
এহেন অনুপ কে আমরা
পইপই করে বলে দিয়েছিলাম – ডঃ মহাদেব মিশ্রের সাথে ইংরেজিতে কথা না বলতে । বাংলাতেই
কাজ সারা যাবে । তোর যে কোনো দুটো প্রডাক্টের কথা বলে দিবি – ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে দেবেন
।
কিন্তু, ধর্ম কাহিনী
কে কবে শুনেছে ?
চেম্বারে ঢুকেই বাও
করে বলল – ডক্টর, আই অ্যাম ফ্রম -----
হউ
বেচারা অনুপ – ভাবল
ওটা হাউ
উত্তরে বলল – কম্পানি
হ্যাজ সেন্ট মি ওভার হিয়ার
হউ
বিকজ আই হ্যাভ বিন
সিলেক্টেড টু ডু সো
হউ
এরকম “হউ” কাণ্ড খানিক
চলার পর ডঃ মিশ্র রেগে মেগে অনুপকে বেরিয়ে যেতে বললেন চেম্বার থেকে ।
তারপরের এপিসোড অনেক
কষ্টে ম্যানেজ করেছিলাম আমরা ।
এর পরে অনুপকে কিছু
জিজ্ঞেস করলেই বলতো :- হউ ।
-----------------------
ইতি পুরী কাণ্ডে
“হউ” পর্বঃ সমাপ্তম
